• ঢাকা
  • বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০১৯, ১২:৩৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২২, ২০১৯, ০৯:১৭ পিএম

‘ওইসব পুলিশ আমরা পালি, মাসে মাসে টেকা কি হাদে দেই?’

রিকু আমির
‘ওইসব পুলিশ আমরা পালি, মাসে মাসে টেকা কি হাদে দেই?’
রাস্তাটি অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে- ছবি: জাগরণ

‘... পাকায়া ফেলাইছি এইখানে, আর আপনে আইছেন ছবি তুইল্লা পেপারে দিতে? যান কী করবেন করেন, ওইসব পুলিশ আমরা পালি, মাসে মাসে টেকা কি হাদে দেই?’

অশালীন শব্দ যোগ করে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রিকশা গ্যারেজ মালিক মানিক। তার গ্যারেজসহ বেশকিছু অবৈধ রিকশা গ্যারেজ, ভ্যানগাড়ির পার্কিং প্লেস, অস্থায়ী রেস্তোরাঁ, চা দোকান গড়ে উঠেছে ঢাকার পরিবাগস্থ নালীরপাড় সড়কের ফুটপাথ ও রাস্তায়। 

পরিবাগ মডিউল হাসপাতাল থেকে নালীরপাড় সড়কটি সরাসরি শাহবাগ মোড়ে যাওয়ার প্রধান সড়কে মিশেছে। মডিউল হাসপাতালের গোড়া থেকে এ রাস্তার সীমানা শুরু। রাস্তার আরও দুই প্রান্ত দিয়ে মোতালেব প্লাজা, বাংলামটরে যাওয়া যায়। রাস্তাটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। এর কমিশনার এমএ হামিদুল হক।  

সরেজমিনে দেখা গেল- মডিউল হাসপাতালের খুব কাছে ও বিপরীত লেনে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এর বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সীমানা প্রাচীর। এ প্রাচীর ঘেঁষা ফুটপাথ দখল করে রাখা হয়েছে অন্তত ৫০টি ভ্যানগাড়ি। এসব ভ্যানগাড়ির পাশে ফুটপাথেই বড় আকৃতির বাঁশ রাখা আছে। ভ্যানগাড়ির বিপরীতেও বড় বেশ কিছু বাঁশ রাখা আছে।  

ভ্যানগাড়ির সারিতে দেখা যায়, দুটি অস্থায়ী হোটেল। এসবও ফুটপাথের ওপরে। এসব অবৈধ হোটেলের কাছের যে সড়ক বিভাজক আছে, তা হোটেল বর্জ্যে নোংরা হয়ে আছে।  

দেখা যায়, ডিপিডিসির বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বিপরীত লেনের ফুটপাথও পুরো দখল করে রেখেছে অবৈধ রিকশা গ্যারেজ। এ সড়কের মাঝ বরাবর (ডিপিডিসির বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের লেন) থেকে শাহবাগের প্রান্ত পর্যন্ত ফুটপাথ রিকশা, ভ্যানে ভরপুর দখল। আছে গ্যারেজ থেকে উৎপন্ন হওয়া বর্জ্যের ছড়াছড়ি।  

নালিরপাড় সড়কটি দুই লেনের এবং বেশ প্রশস্থ। সড়ক বিভাজকে দেবদারু, বকুল ও বটবৃক্ষ রোপণ করা।  কিন্তু এসব বৃক্ষের বেশকিছু কেটে ফেলেছে অবৈধ দখলদাররা। মডিউল হাসপাতালের খুব কাছে সড়ক বিভাজকের দিকে তাকালে এমন ঘটনা বোঝা যাবে।  

খোঁজ নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেল, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার ও স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা খাজা হাবিবুল্লাহ হাবিব অনুসারীরা, শাহবাগ থানা পুলিশ অর্থের বিনিময়ে এসব অবৈধ দখলের সুযোগ দিয়েছে। শাহবাগ থানার যে অফিসার এই এলাকায় যখন কর্তব্য পালন করতে আসেন, সেই অফিসার এবং তার সঙ্গে থাকা কনস্টেবল, আনসারদের কেউ কেউ এসব গ্যারেজ, হোটেল, দোকান থেকে কমপক্ষে ১০০ ও সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা নেন। এ ছাড়াও আছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা পরিচয়দানকারীদের চাঁদাবাজিও।  

ডিপিডিসির বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সীমানা প্রাচীরে একটি ডিজিটাল ব্যানার লাগানো আছে। তাতে লেখা জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ, রেজিঃ নং ২০০২, ওয়ার্ড নম্বর ২১, শাহবাগ, ঢাকা ১০০০।  

এই সংগঠনের দায়িত্বে কে বা কারা আছেন, তা জানা যায়নি। তবে জানা গেল- এই সংগঠন ছাড়াও যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ পরিচয়ধারী স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও আর্থিক যোগাযোগ রক্ষা করেন অবৈধ দখলকারীরা। প্রশাসন থেকে যদি কোনো সমস্যা হয়ও, সেই সমস্যা এসব নেতা পরিচয়ধারীদের মাধ্যমে সুরাহা হয়।  

একটি চা দোকান মালিকের কর্মচারী ইমরান বলেন, গত বছর পুলিশ তুইলা দিসিলো, কয়দিন পরে আবার বইছে।  

একটি রিকশা গ্যারেজের কর্মচারী সুলতান একটি প্রশ্নে দৈনিক জাগরণকে বলেন, হ, পুলিশরে তো দেই-ই। ডেলি দেওন লাগে। ১শ, ২শ, ৫শ- এরকম দেয় মালিকে।  

এ পথে নিয়মিত প্রাইভেট কার চালান জসিম উদ্দিন।  তিনি বলেন, রাস্তাটা খুব শর্টকাট ও সুন্দর রাস্তা। কিন্তু এসব অবৈধ দখলের জন্য গাড়ি চালানো মুশকিল। জ্যামও সৃষ্টি হয়।  

রাস্তাটিতে যানবাহন চলাচল কম দেখা গেল। এমন তথ্যও পাওয়া গেছে যে- অবৈধ দখলদারেরা রাস্তায় এমন এমন জিনিস ফেলে রাখেন যেন কেউ না আসে। সন্ধ্যার পর এ পথে নেমে আসে ভুতুড়ে নীরবতা, যা কাজে লাগিয়ে চলে গাঁজা-ইয়াবার খুচরা কারবার। অবৈধ রিকশা গ্যারেজের মালিক-কর্মচারীরাই এসব করেন।  

এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হোসেনের সাথে। সোমবার (২২ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনবার ফোন দিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।  

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান দৈনিক জাগরণকে বলেন, এ সড়ক থেকে কয়েকবার উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু সমস্যা হলো দখলদাররা আবার চলে আসে। আমরা তো সব সময় থাকি না। পুলিশ তো থাকে। তারা যদি কঠোর হয়, আইন প্রয়োগ করে, তাহলে এসব দখল মুক্ত রাখা সম্ভব।  

রাস্তাটি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে তিনি আবারও উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।  


আরএম/টিএফ