• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৯, ২০১৯, ১১:৫২ এএম
সর্বশেষ আপডেট : ডিসেম্বর ৯, ২০১৯, ১২:২৮ পিএম

রাজধানীতে হর্ন বিড়ম্বনায় শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে মানুষ

হালিম মোহাম্মদ
রাজধানীতে হর্ন বিড়ম্বনায় শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে মানুষ

রাজধানীতে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে সবসময় বাস-মিনিবাসসহ সকল যানবাহনের হর্ন বাজানো হয়। মনে হয় যেন রাস্তায় যানবাহনগুলো হর্ন বাজানোর মহোৎসবে মেঠে ওঠে। হাসপাতাল ও স্কুলের সামনে হর্ন বাজানো নিষেধ সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকলেও তা মানছে না কেউ। এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত শব্দ দূষণে চিকিৎসাধীন হৃদরোগীদের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়াও শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে শত শত মানুষ।

রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকাগুলোর একটি শাহবাগ। চারদিকের যেদিকে দৃষ্টি যায় সেদিকই গাড়ির দীর্ঘ সারি। একটি আরেকটিকে অতিক্রমের চেষ্টায় ক্রমাগত হর্ন বাজিয়েই চলেছে। অথচ মোড়ের দু’পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সনামধন্য দুটি বড় হাসপাতাল। একটি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, অপরটি বারডেম হাসপাতাল। অবশ্য বারডেমের সামনে ট্রাফিক পুলিশের দক্ষিণ পাশে হর্ন বাজানো নিষেধ একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। কিন্তু কারো সেদিকে দৃষ্টিপাত করার সময় কোথায়। 

একইচিত্র রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায়ও। সেখানে রয়েছে ল্যাবএইড কার্ডিওলজি, স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং পপুলার হাসপাতাল। হর্নের আওয়াজে ওই এলাকার মানুষ অতিষ্ট। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় কথা হয় ব্যবসায়ী সোহেলের হোসেনের সঙ্গে। তিনি ওই এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট একটি মুদির দোকান চালান।

তিনি বলেন, শব্দ দূষণের মধ্যে থাকায় এখন কানে খুব কম শুনি। ডাক্তার বলেছে বেশি শব্দের ভেতরে থাকায় এই অবস্থা। কানে মেশিন লাগাতে বলেছে। সাধারণ কথা শুনতে কষ্ট হলেও এই সড়কের তীব্র শব্দে মাথা ব্যথা শুরু হয়। তার মত এই বিড়ম্বনা রাজধানীতে কমবেশি সবার। অকারণে হর্নের ব্যবহারই এর জন্য দায়ী। রাজধানীর নিরাপদ শব্দসীমা অতিক্রম করে গেছে আগেই। অথচ বিষয়টি নিয়ে এখনও নীরব ভূমিকায় রয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।

বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, হর্ন বাজানোর প্রবণতা মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে বেশি লক্ষণীয়। পরের তালিকায় রয়েছে প্রাইভেটকার চালকরা। অনেকে আবার হর্নের পাশাপাশি উচ্চ শব্দ করে এমন যন্ত্রও লাগায় তাদের যানবাহনে। ফলে গাড়িগুলো কোনো এলাকা দিয়েগেলে বহু দূর থেকেও এর শব্দ পাওয়া যায়। রাজধানীতে গাড়ি চালকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যানজটে আটকে থেকে সামনের গাড়ি চলানোর তাগিদ দিতেই হর্ন বাজায়। চালকদের একটি বড় অংশই সামনের গাড়িকে সংকেত দিতে বিশেষ ধরনের বাতি থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার করেন না।

এদিকে  ১৭ ডিসেম্বর থেকে সচিবালয়ের চারপাশের এলাকাকে নো হর্ন জোন বা নীরব জোন ঘোষণা করেছে সরকার। সচিবালয়ের আশেপাশে ঘোষিত নীরব এলাকায় হর্ন বাজালেই হবে জেল-জরিমানা। ওই এলাকায় হর্ন বাজালে ১ মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নীরব জোন জিরো পয়েন্ট, পল্টন মোড়, সচিবালয় লিংক রোড হয়ে জিরো পয়েন্ট এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে শাহবাগ থেকে সোনারগাঁও ফোয়ারা মোড়সহ ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুর রোড, গুলশান, ধানমণ্ডি এলাকাসহ বেশ কিছু সড়কে হর্ণ বাজানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই আদেশ ঘোষণার পর কয়েকদিন অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু এখন সেই অভিযান বন্ধ হয়ে গেছে।

শব্দদূষণ নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৫৫ ডেসিবেল। নীরব এলাকার জন্য এই শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকার জন্য সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট করতে পারে। আর ১০০ ডেসিবেল শব্দ চিরতরে মানুষের শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দিতে পারে। এই হিসাবে রাজধানীতে শব্দদূষণ মানুষকে বধিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জরিপে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে ১০২ ডেসিবেল। একইভাবে মতিঝিলে ৯৩, বাংলামোটরে ৯২, সদরঘাটে ৮৮, ফার্মগেটে ৯৩, শাহবাগে ৮৬, মহাখালীতে ৯৪, ধানমণ্ডিতে ১০১, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে ৯৫ ডেসিবল। পরিবশে বাঁচাও আন্দোলনের মতে, ৩০টি কঠিন রোগের মধ্যে ১২টি পরিবেশ দূষণের ফলেই হয়।

ডিএমপির ট্রাফিক (দক্ষিণ) বিভাগের ডিসি মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যেসব এলাকায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ সেসব এলাকায় হর্ন বাজানোর বিষয়ে প্রতিনিয়তই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গত ১ বছরে এক হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। বর্তমানে ট্রাফিক অভিযানেও এ সংক্রান্ত মামলা হচ্ছে। তবে গতকাল শাহবাগ ও সায়েন্সল্যাব এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হর্ন বাজানোর বিষয়ে কোন যানবাহনকে মামলা বা জরিমানা করতে দেখা যায়নি ট্রাফিক পুলিশকে।

এইচএম/একেএস

আরও পড়ুন