• ঢাকা
  • রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০২০, ০৮:২৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৯, ২০২০, ০৮:২৪ পিএম

ডিএনসিসি ৫৪ নং ওয়ার্ড

করোনা প্রতিরোধে নজিরবিহীন তারুণ্যের বর্ম

এস এম সাব্বির খান
করোনা প্রতিরোধে নজিরবিহীন তারুণ্যের বর্ম

শেষ পর্যন্ত শঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করেই হু হু করে বেড়ে চলছে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগির সংখ্যা। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলই চলে এসেছে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের গ্রাসে। যার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। ঢাকার প্রায় ৫৩টির মত এলাকা এরইমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেগুলোতে শনাক্ত হয়েছে করোনা আক্রান্ত একাধিক রোগিও। লকডাউনে পড়ছে করোনা সংক্রমিত নতুন নতুন এলাকা। এক কথায় বলতে গেলে প্রায় পুরো রাজধানীতেই নিজের কালো ছায়া বিস্তার করে দিয়েছে মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপ।

তবে তাতে দমে না গিয়ে বিপর্যস্ত এই ঢাকারই একটি এলাকার স্থানীয় তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা, কর্তব্যরত পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন করোনার বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলার দুঃসাহসি যুদ্ধে। সংক্রমণ প্রতিরোধে তারা নিজেদের এলাকাকে লকডাউন করে দিয়েছেন সুপরিকল্পিতভাবে, ঘিরে দিয়েছেন তারুণ্যের বর্মে। স্থানীয় জনসাধারণের সামান্য বিরক্তি বা বিপত্তি সৃষ্টি না করে নজিরবিহীন এই লকডাউনের কৌশল অবলম্বনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাহাঙ্গীর হোসেন যুবরাজ নামের এক তরুণ কাউন্সিলর। 

দৈনিক জাগরণের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে আলাপকালে, টানা দু'বার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তুরাগ থানাধীন ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত এই কাউন্সিলর জানান, আমাদের এলাকার অধিকাংশ স্থানীয়রাই ব্যবসায়ি ও খেটে খাওয়া মানুষ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ির সংখ্যাই বেশি। সেক্ষেত্রে লকডাউন কার্যকরের পাশাপাশি তাদের দু'মুঠো ভাতের চিন্তাও করতে হয়েছে আমাদের। তবে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা নির্দিষ্ট কিছু ধাপ অনুসরণের মাধ্যমে লকডাউন কার্যকর শুরু করি।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতার নিবেদিত হয়েছে এলাকার তরুণ সমাজ। যেখানে প্রায় শ'খানেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার স্থল, প্রবেশ ও বহির্গমন পথসহ প্রতিটি পয়েন্টে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন শুরু করছেন। আর এক্ষেত্রে আমরা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ডিজিটাল কমিউনিকেশন ব্যবস্থাকে কাজে লাগাচ্ছি। এছাড়া বিধিবদ্ধভাবে আইনের আওতায় থেকে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিজ উদ্যোগে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুল মুত্তাকিন, যা ছিল বেশ ইতিবাচক। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ব্যাপকা সাড়া পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমি আমার এলাকার মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ যে তারা এই উদ্যোগ পরিচালনায় সহযোগিতা করছেন।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাউন্সিলরের অন্যতম সহযোগি হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় পর্যায়ে, অত্র এলাকার মানুষের মাঝে ডিজিটাল এডুকেশন সিস্টেমের চর্চা সূচনাকারী জনাব আব্দুর রব। মূলত এই দুই থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সমন্বিত পরিকল্পনাই এমন বিশাল একটি কার্যক্রমের শুভ সূচনা নিশ্চিত করেছে ওয়ার্ডটিতে।

কার্যক্রম প্রসঙ্গে জনাব রব জাগরণকে বলেন, আসলে কাজটা অবশ্যই কঠিন। আমরা শুরু করেছি। আশা করছি সামনেও এভাবেই এগিয়ে যাবো। প্রতিদিনের কাজ শেষে কমতিগুলো নিজেরা ঝালিয়ে নিয়ে পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা করবো আমরা। এমনটাই চাচ্ছেন কাউন্সিলর মহোদয়। ডে টু ডে ওয়ার্ক আউট প্ল্যান যাকে বলে। দিনব্যাপী কাজ, রাতে যাচাই ও পুনর্বিন্যাস। এরপর পরের দিনের পরিকল্পনা।  

স্থানীয় এই এলাকাটির ক্ষেত্রে চোখে পড়েছে বেশ ব্যতিক্রম একটি পদক্ষেপ। এখানে এলাকার ভেতরে কেবল পুলিশের ভ্যানই টহল দিচ্ছে না। সেই সঙ্গে পালা করে টহলরত রয়েছে দুইটি অ্যাম্বুলেন্সও। যার প্রতিটিতে একজন করে পেশাদার ডাক্তার ও দুইজন নার্সও রয়েছেন। বিশেষ প্রয়োজনের সাপেক্ষেই এই ব্যবস্থা বলে জানান কাউন্সিলর যুবরাজ।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, এই কার্যক্রম বাস্তবায়ণে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কাউন্সিলরের পক্ষ থেকে প্রথমেই ঘোষণা করা হয় বিশেষ নির্দেশনা। এরপর বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) শুরু হয় ধাপে ধাপে লকডাউন বাস্তবায়ন। স্বেচ্ছাসেবকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সজাগ দৃষ্টি রেখে শুরু হয় কাজ। পুলিশের মনিটরিং টিম টহলরত অবস্থায় প্রতিটি পয়েন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মোবাইল সেন্টারের মত তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে প্রয়োজন সাপেক্ষে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণে গতি আসায়, বেড়েছে লকডাউনের কার্যকারিতা।

এছাড়া নিয়মিত টহলে থাকা সেনাবাহিনীর মনিটরিং ইউনিটও সজাগ নজরদারি অব্যাহত রাখায় স্বেচ্ছাসেবকদের গৃহিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে বিনাবাক্য ব্যয়ে সাড়া দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

বেশ কয়েকটি পয়েন্টের স্বেছাসেবকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রতিটি সেন্টারের নিবেদিত এই তরুণ যোদ্ধারা একে অন্যের সঙ্গে রীতিমত পাল্লা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে। আর তাদের এমন মানসিকতার বিশেষ একটি কারন জানা গেল স্থানীয় স্কুল মোড়ে কর্তব্যরত বেলায়েত হোসেন বিপ্লব নামক এক স্বেচ্ছাসেবক কর্মীর কথায়। নির্লিপ্ত হাসিমুখে সরল বাক্যে তিনি জানালেন, 'যুব ভাই খুশি হইলে ভাল্লাগে। উনিও সবাইরে খুশি রাখার চেষ্টা করেন। আমরাও সুযোগ পাইলে সেটাই করি। এমনেই চইলা আসতেছে।' 

দেশের এই সংকটের মাঝে, লকডাউনের আওতায় স্থানীয় একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার মত কঠিন কাজটি বাস্তবায়নে, নিজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন যুবরাজ ও ৫৪ নং ওয়ার্ডের এই নিবেদিত প্রাণ তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা। তাদের সাফল্য হয়তো পথ দেখাবে অন্যদের, এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর। আর প্রতিটি স্থানীয় পর্যায় থেকে এমন প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রয়াসই কিন্তু সমন্বিতভাবে রুখে দিতে পারে সারা দেশব্যাপী করোনা বিস্তারের লাগামহীন আগ্রাসন। সেক্ষেত্রে এমন এক একটি '৫৪ নং ওয়ার্ড' হয়ে ওঠতে পারে করোনা প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের এক একটি সবল বাহু। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ঠিক যেমনটা প্রত্যাশা দেশের মানুষের।