• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: জুন ৯, ২০১৯, ০২:১০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ৯, ২০১৯, ০২:১২ পিএম

বিমানবন্দরে ‘বার্ডহিট’ ঝুঁকিতে উড্ডয়ন অবতরণ

হালিম মোহাম্মদ
বিমানবন্দরে ‘বার্ডহিট’ ঝুঁকিতে উড্ডয়ন অবতরণ


বিমানের জরুরি অবতরণ খবরের কাগজে এখন নিত্য ঘটনা। যা পূর্বে খুব কমই দেখা যেতো। এর প্রকৃত কারণ দেশের বিমানবন্দরগুলোতে পাখির আনাগোনা। ফলে বেড়েছে ‘বার্ডহিট’ বা পাখির আঘাতে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার ঝুঁকি। 

সম্প্রতি শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামার সময় বার্ডহিটের কারণে বেশ ক’টি বিমানের জরুরি অবতরণের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ৩ জুন সকালে বার্ডহিটের কারণে শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি ফ্লাইট জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছু সময় পরই জরুরি অবতরণ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট। বিজি-১৪৩৩ বিমানটির ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা ছিল।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ জানান, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সকাল ৮টায় চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেয় বিমানটি। টেক অফের পর ককপিট ক্রু লক্ষ করেন, বিমানটিতে বার্ডহিট (পাখির আঘাত) হয়েছে। ফলে পাইলট চট্টগ্রামের দিকে না গিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে পুনঃ অবতরণ করেন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আবার গন্তব্যের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায় বিমানটি। ফ্লাইটটিতে ৭০ জনের মতো যাত্রী ছিলো। তবে এই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি বলে জানান শাকিল মেরাজ।

বিমান বন্দরে কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাড়ছে বার্ড হিটের ঝুঁকি। দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে পাখি তাড়ানোর যন্ত্র দুটি অকেজো থাকায় প্রতিদিনই এখানে পাখি বাড়ছে। বিমান বন্দরে পাখি তাড়ানোর জন্য বার্ড শ্যুটার থাকলেও তাদের কাজ কখনোই দৃশ্যমান হয়নি বলে জানান ওই সদস্য। তিনি বলেন, বিমানবন্দরের চারপাশে থাকা জলাশয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে অতিথি পাখি। বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় কম উচ্চতায় নেমে আসার কারণে বার্ড স্ট্রাইকের আশঙ্কা আছে। এ কারণে বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনারও ঝুঁকি রয়েছে।

জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ের চারপাশে দলিপাড়া, বাউনিয়া এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি জলাশয়। এসব জলাশয়ের মাছ, কীটপতঙ্গ, জলজ উদ্ভিদ পাখিদের আকষর্ণীয় খাবার। তা ছাড়া বিমানবন্দরের পশ্চিমে বাউনিয়া এলাকাটি মূলত গ্রামীণ পরিবেশ। রানওয়ের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে ঘাস ও ঝোপঝাড়। এছাড়া বিমানবন্দরের চারপাশে জনমানুষের সমাগম কম থাকায় এসব এলাকায় চলে পাখিদের অবাধ বিচরণ।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বিমানবন্দরের রানওয়ের চারপাশ থেকে পাখি সরানোর জন্য শাহজালাল বিমানবন্দরে রয়েছে বার্ড শুটার। তবে স্বল্প জনবলের কারণে এ কার্যক্রম দিন দিন ব্যাহত হচ্ছে। পাখি সরাতে একসময় শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র থাকলেও বর্তমানে তা অকার্যকর। শুধু বার্ড শুটাররা বন্দুক দিয়ে পাখি তাড়ানোর কাজ করছেন, যদিও বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে লেজার লাইট, আলট্রা সাউন্ডের মাধ্যমে পাখি তাড়ানো হয়।

এয়ারলাইন্সের একাধিক কর্মকর্তা জানান, উড়ন্ত বিমানের ইঞ্জিনে পাখি ঢুকলে বেশি ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। ইঞ্জিনের ফ্যান-বেল্ড ও স্পিনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইঞ্জিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বার্ড হিটের ঝুঁকি থাকলে পাইলটদেরও মানসিক চাপে থাকতে হয়।

অপরদিকে, বিমানবন্দরগুলোয় ‘বার্ড হিট’ বা পাখির আঘাতে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়লেও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে পাখির খামার গড়ে তোলা হয়েছে। খোদ বাংলাদেশ বিমানের কয়েকজন কর্মচারী মিলে বিমানের নিজস্ব ভবন এয়ারপোর্ট কমপ্লেক্সে এই খামার গড়ে তুলেছেন। বিশেষজ্ঞ ও পাইলটরা বলেছেন, এই পাখি প্রতিনিয়ত তাদের বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে চরম ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। পাইলটদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) আইন অনুযায়ী এটি একটি বড় ধরনের অপরাধ। বিমানবন্দরকে ঝুঁকিমুক্ত করতে তারা অবিলম্বে এই পাখি পোষা বন্ধ করার আহ্বান জানান। অন্যথায় ছোট একটি পাখির কারণেও যেকোনো সময় হাজার কোটি টাকা দামের এয়ারক্রাফট দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারির ২য় সপ্তাহে পার্শ্ববর্তী দেশের একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বার্ডহিটে বিধ্বস্ত হয়। খোদ চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বার্ডহিটে ইঞ্জিন বিকল হয়ে উড়োজাহাজের জরুরি অবতরণের রেকর্ড রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় বিমানবন্দর সুষ্ঠু পরিচালনায় আকাশ পাখিমুক্ত রাখতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে উন্নতমানের ফাঁদ ও লেজারের সাহায্যে বিমানবন্দর পাখিমুক্ত রাখার ব্যবস্থাও সেখানে রয়েছে। শুধু একটি পাখি যেকোনো উড়োজাহাজের সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পাখি তাড়াতে বার্ড শুটারের বিকল্প নেই। সাউন্ড দিয়ে পাখি সরানোর যন্ত্র আমাদের ছিল, এগুলো এখন নেই। এসব যন্ত্রে খুব বেশি একটা কাজও হয় না। তবে আমরা সর্বক্ষণ সতর্ক থাকি, যেন কোনো ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি না হয়।

এ বিষয়ে বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, বিমানবন্দরগুলোয় যাতে পাখি আসতে না পারে, সেজন্য সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এজন্য অনেক টাকা খরচ করা হচ্ছে। ঢাকার শাহজালাল ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ রকম পাখির উপদ্রব বা পাশে খামার থাকলে অবশ্যই তা নির্মূল করা হবে। একই সঙ্গে যারা এই খামার তৈরি ও পাখি পালনের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

এইচ এম/আরআই