• ঢাকা
  • বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১১, ২০১৯, ০৮:৫৯ এএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১১, ২০১৯, ০৯:০১ এএম

বিভাগীয় ও জেলা শহরে আজ থেকে নতুন সড়ক আইন

হালিম মোহাম্মদ
বিভাগীয় ও জেলা শহরে আজ থেকে নতুন সড়ক আইন
সড়কে শৃঙ্খলা আনতে ১ নভেম্বর চালু হয় নতুন আইন-ফাইল ছবি

সড়ক আইন ২০১৮

..........

আজ সোমবার (১১ নভেম্বর) থেকে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভাগীয় এবং জেলা শহরে সড়ক নিরাপত্তার নতুন সড়ক আইন কার্যকর হতে যাচ্ছে। এই সড়ক নিরাপত্তার নতুন আইন কার্যকরে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভাগীয় এবং জেলা শহরে চালানো হচ্ছে ব্যাপক প্রচার প্রচারনা। তারপরও জটিলতা কাটছেন না। সিংহভাগ চালক এখনও বলছেন, এ আইন সম্পর্কে তারা পুরোপুরি জানেন না। শুধু তাই নয়, চালকরা এই নতুন আইন সম্পর্কে অবগত হতে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। অথচ ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ রাজধানীসহ প্রতিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে নতুন সড়ক আইনের ব্যাখ্যা সম্মিলিত ফেস্টুন ব্যানার টানিয়ে মাইকে সচেতনমূলক নির্দেশনা প্রচার কর যাচ্ছেন। 

নতুন সড়ক আইনের জরিমানা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর চালকদের ভেতরে আতঙ্ক কাজ করছে। জেল-জরিমানার পরিমাণ এত বেশি, যা অনেক চালকের সামর্থের বাইরে। এমনই মন্তব্য করছে একাধিক চালক। তারা বলেন, এত জরিমানা গুনতে পারব না বরং এ পেশা ছেড়ে অন্য কিছু করতে হবে।

চিটাগাং রোডের নীলাচল বাস চালক ফয়সাল আহমেদ বলেন, নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন হলে একটি সুফল পাবো আমরা। সেটি হচ্ছে নকল লাইসেন্স, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালকের সংখ্যা কমে যাবে। আর মালিকরা সচেতন হয়ে লাইসেন্সবিহীন বা জাল লাইসেন্স থাকা চালকদের গাড়ি চালাতে দেবেন না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

জানা গেছে, নতুন সড়ক আইন হওয়া ও জেল জরিমানা বাড়ানোর কারণে লাইসেন্সবিহীন ও জাল লাইসেন্সধারী চালকরা ভয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে। এদের সংখ্যাও কম নয়। প্রায় ৬৫ হাজারের মত। তারা গাড়ি না চালানোর ফলে রাস্তায় চালক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। যার কারণে রাস্তায় গাড়ি চলাচলের সংখ্যা কিছুটা কমে গেছে। গাড়ির কাগজপত্র সমস্যা থাকায় ও গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছেন না বহু মালিক। রাস্তা গাড়ি চলাচল কমে যাওয়ার এটিও একটি কারণ বলে জানায় পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। এসকল গাড়ির মধ্যে সিংহভাগই হচ্ছে লেগুনা, হিউম্যান হলার, মিনিবাসসহ গণপরিবহন। 

ট্রাফিক বিভাগ ও বিআরটিএ সূত্র জানায়, নতুন আইনের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের সফটওয়্যার এখনও আপডেট সম্পন্ন হয় নি। রিসিট বইসহ তৈরি হয় নি আইনের প্রয়োজনীয় বিধিমালাও। এসব কারণে গত সপ্তাহে নতুন হারে জরিমানা আদায় করা যায় নি। এমন অবস্থায় নতুন আইনে জরিমানা আদায় হবে না বলে জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তার কথায় ট্রাফিক পুলিশ এই আইনটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে গত দেড় সপ্তাহ ধরে। তারপর জরিমানা আদায়সহ অন্যান্য বিধান কার্যকর হবে। ওবায়দুল কাদের দাবি করে বলেন, আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হলে সড়ক শৃঙ্খলা আসবে। 

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার এনায়েতউল্লাহ    দৈনিক জাগরণকে বলেন, এই আইন ঠিক মতো কার্যকর হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে আশা করি। কিন্তু এর জন্য ব্যাপক প্রচার দরকার। আর আইনের বিধিমালা করাও প্রয়োজন। বিধিমালা না করে আইনের প্রয়োগে নানা সমস্যা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, চালকদের শাস্তি বাড়ানো ও কিছু নিয়ম কঠিন করায় সঙ্কট হতে পারে। কারণ দেশে প্রয়োজনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালক অনেক কম। এতে চালক সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী দৈনিক জাগরণকে বলেন, এই আইনের অনেক ভাল দিক আছে। তবে ১২৫টি ধারার ৫২টি চালক-শ্রমিকের শাস্তি নিয়ে। খারাপ রাস্তা-ঘাট, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন আর প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না করে চালক-শ্রমিকদের শাস্তির এই বিধান ন্যায্য নয়।

তিনি বলেন, একই সড়কে দ্রুতগামী যানবাহন আর নসিমন করিমন রেখে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো কতটা সম্ভব? এই আইনটি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক জাগরণকে বলেন, গাড়ি ফিটনেস না থাকলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, না দিতে পারলে জেল। এখন পকেটে ২৫ হাজার টাকাতো থাকতে হবে। ১৪ মাস আগে করা এই আইন নিয়ে ব্যাপক প্রচারের দরকার ছিল। যা করা হয় নি। ফলে নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে বাড়ছে জটিলতা। '

তিনি বলেন, আগের আইনটিই ঠিকমত বাস্তবায়ন হয় নি। তাই নতুন আইনটি বাস্তবায়নের আগে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরিয়ে দেয়া দরকার ছিল। আর যারা এই আইন প্রয়োগ করবেন তাদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা দরকার ছিল।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার ট্রাফিক বিভাগ জসিম উদ্দিন আহমেদ দৈনিক জাগরণকে বলেন, ১ নভেম্বর (শুক্রবার) সড়ক নতুন আইন কার্যকর হয়। এরপরই বাংলাদেশ পুলিশ ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তা ও বিআরটিএ কর্মকর্তা এবং ডিএমপি কমিশনার সমন্বয়ে সারাদেশের ৮০০ ট্রাফিক অফিসারকে নতুন সড়ক আইন ও তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাদের নতুন সড়ক আইন ও জেল জরিমানা সম্পর্কে বিষদ আলোচনা ও প্রয়োগের কৌশল জানানো হয়েছে। ট্রাফিক সার্জেন্টগণ রাস্তায় নতুন সড়ক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনও সমস্যা দেখা দেবে না।

নতুন আইনে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য জরিমানার পরিমাণ পাঁচ থেকে ৫০ গুণ বাড়ানো হয়েছে৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগের আইনে যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজালে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। এখন তা করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। এই আইনে শুধু চালক ও পরিবহন মালিক নয়, এবার পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। চালককে সঙ্কেত মানতে হবে। পথচারীকেও সড়ক, মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস ব্যবহার করতে হবে। যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও চালক যদি দুর্ঘটনার মাধ্যমে কোনও ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটান তাহলে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায়ই মামলা হবে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর জন্য চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর এবং এই অপরাধ জামিন অযোগ্য।

এর আগে এই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছরের কারাদণ্ড এবং জামিনযোগ্য। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ যানবাহন চালালে তার শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। নিবন্ধনহীন যানবাহনের জন্য শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এর জন্য পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা। উল্টোপথে গাড়ি চালালেও জরিমানা গুনতে হবে। ফিটনেস, রেজিষ্ট্রেশন এসব বিষয়েও জরিমানা অনেক বাড়ানো হয়েছে। গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বললে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে এক মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনায় আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ। চালকদের সর্বনিম্ন বয়স হতে হবে ১৮ বছর। মোটরবাইক থেকে শুরু করে সব ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য প্রযোজ্য হবে আইনটি। 

এইচএম/এসএমএম

আরও পড়ুন