• ঢাকা
  • সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৪:৫২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৪:৫২ পিএম

মেঘনায় ইলিশ নেই, জেলেদের ঈদ আনন্দ মাটি

রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা
মেঘনায় ইলিশ নেই, জেলেদের ঈদ আনন্দ মাটি
রায়পুরের কাঁটাখালী মেঘনা নদীর পাড় ও জেলেরা নৌকা থেকে জাল নামাচ্ছে - ছবি : জাগরণ

প্রায় ২ লাখ টিয়া চালান খাটাইয়ে নতুন নৌকা বানাইছি। নতুন করে নদীত যামু, বড় বড় ইলিশ ধরয়ুম (ধরবো), কপাল হিরব (ফিরবে), হোলাহাইন (পোলাপান) নিয়া ঈদ করয়ুম (করবো); কিন্তু হিডা (ওইটা) অইলো না। ৯ জন জাইল্লা লই নদীত গেছি। বেগ্গুনরে (সবাইকে) আগেই টিয়া (টাকা) দি আইনতে অইছে। কিন্তু যেরুম (যে রকম) চালান খাটাইছি, হেরুম (সে রকম) ইলিশ হাই নাই (পাইনি)। অন আঙ্গ (এখন আমাদের) পকেট খালি, কেমতে ঈদ করয়ুম (করবো)?

ইলিশের অভয়াশ্রম রক্ষায় ইলিশ শিকার বন্ধ থাকার পর গত দুই মাস পার হলেও নদীতে কাঙ্খিত পরিমাণ ইলিশের আশা পূরণ না হওয়ায় এভাবেই হতাশা ব্যক্ত করেন লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর জেলে আবুল খায়ের মাঝি। বয়সটা চল্লিশে গিয়ে ঠেকেছে। লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা চরবংশী গ্রামে মেঘনার পাড়ে তার বাড়ি। মেঘনায় ইলিশ ধরেন তিনি। চরবংশীর ফাঁড়ি থানা সংলগ্ন ইলিশ ঘাটের পাশে মেঘনার কূলে বসেই কথা হচ্ছিলো তার সঙ্গে।

তিনি আরো বলেন, ‘বড় আশায় বুক বেঁধে নদীতে গিয়েছি। কিন্তু যেমন আশা করেছি, তার ধারে-কাছে যাওয়ার চিন্তাও করতে পারিনি। দুই দিনের খরচ ৫ হাজার টাকা। ইলিশ পাইছি ৩ হালি। বিক্রি করেছি ৯ হাজার টাকা। যদি একদম স্বাভাবিকভাবে ইলিশ থাকতো তাহলে নিচে হলেও ৩০ হাজার টাকা রোজগার হইতো। অভিযানের সময় (নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়) নদীতে নামি নাই। আমার জেলে কার্ড আছে। অভিযানের সময় চাল পাইছি। কিন্তু ৪০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও এবার চাল পাইছি ৩০ কেজি। এ চাল দিয়ে কী ২ মাসের সংসার চলে?

একই চিত্র লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও হাইমচরের মেঘনায়। নদীতে মিলছে না ইলিশের দেখা। দ্বীপ হাইমচর ও চর ভৈরবী মেঘনা তীর ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে, ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। কিন্তু এখানে মেঘনার এপার-ওপার ঘুরে ইলিশের খোঁজ মেলেনি। ইলিশের আকাল চিত্রের দেখা মেলে হাইমচরের ভৈরবী মাছঘাটে গিয়ে। আড়ৎ ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন, অভিযানের সময়েও চুপচাপ ইলিশ শিকার হয়েছে। তাই নদীতে ইলিশ নেই। একজনের দেখাদেখি অন্যরাও ইলিশ শিকারে উৎসাহ পেয়েছে।

মেঘনায় ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরার সঙ্গে মেঘনাপারের বহু মানুষের জীবন-জীবিকা চলে। এ ধারাবাহিকতার বিবর্ণ রূপ দেখা দেয় নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে বা ইলিশের দেখা না মিললে। মেঘনার জেলে ও মেঘনাপারের মৎস্য ব্যবসায়ী, বরফ কারখানার মালিক-শ্রমিক, স্থানীয় দোকানপাটের ব্যবসায়ীদের জীবিকা কেবল ওই মেঘনা নদীর ওপরই নির্ভর। 

মোঃ ছৈয়দ মিয়া। বয়স ৩২ বছর। স্ত্রী ও ২ ছেলে নিয়ে তার সংসার। মেঘনাপারেই চায়ের দোকান। এতেই জীবন বাঁচে। তিনি বলছিলেন, ‘নদীর জেলেদের আয় থাকলে আমাদের আয়। কারণ নদীতে গিয়ে তারা যদি মাছ না পান, তাহলে দোকানের বেচাকেনাও বন্ধ। আর বেচাকেনা না হলে আমাদের আয়-রোজগারও হবে না। এতে আমরাও ইচ্ছে করলে ঈদে আনন্দ-ফুর্তি করতে পারি না। এজন্য আমরাও বলতে গেলে নদীতে মাছ পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া জেলেদের বাকিতে সদাই (পণ্য) দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও সম্ভব নয়।’

পূর্ব চর রমণী মোহনের আরেক জেলে হাফিজ উদ্দিন। তার বয়স এখন ৩৮ বছর। কার্ড থাকলেও চাল বিতরণ নিয়ে অভিযোগের তীর ছোড়েন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘৪০ কেজি চাইলের জায়গায় আমাকে ২৮ কেজি চাল দিয়েছে। যারা নদী চিনে না, কখনো নদীতে মাছ ধরতে যায় নাই, তারা জেলের কার্ড পেয়েছে।’ 

লক্ষ্মীপুর জেলার মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মোস্তফা বেপারী বলেন, ‘১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস নদীতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইলিশ ব্যবসা তেমন লাভজনক হয়ে ওঠেনি। তবে জেলেরা আশা করেছিল, অভিযান শেষ হলে হয়তো ইলিশ পাওয়া যাবে। কিন্তু অভিযান শেষ হয়ে দুই মাস পার হতে চললেও নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় সবার মাঝে হতাশার কালো ছায়া নেমে এসেছে। তাছাড়া অভিযান চলাকালীন জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত কার্ডের সংখ্যা এ অঞ্চলে কম। যার জন্য এখানের বহু জেলেই অভিযানের সময় মানবেতর জীবন পার করেন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ঈদ উপলক্ষে জেলে ও নদীতে জীবিকানির্ভর মানুষের জন্য কোনো বরাদ্দও নেই। নদীতে গিয়ে ইলিশ না পেলে ঈদের আনন্দ মাটিতে মিশে যায়।’

এ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম মুহিবুল্লাহ বলেন, ‘এ সময়ে নদীতে একটু ইলিশ কম থাকে। যা ইলিশ তা চাঁদপুর হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম চলে যায়। ছোট মাছগুলো গ্রামের বাজারগুলোতে পাওয়া যায়। জেলেদের কাঙ্ক্ষিত আশা পূরণ হয় নি।’ ঈদকেন্দ্রিক জেলে সম্প্রদায়ের জন্য কোনো বাজেট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযান চলাকালে কিছু বরাদ্দ আসে। তবে সেটা অতটা না, যে সব জেলে পাবে। আর ঈদ উপলক্ষে জেলেদের জন্য কোনো বাজেট নেই।’

উল্লেখ্য, লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রায় ৫০ হাজার ২’শ ৫২ জেলে পরিবার রয়েছে। তার মধ্যে লক্ষ্মীপুর সদরে- ৭ হাজার ৫১৮, রায়পুরে ৭ হাজার ৫৫০, রামগতিতে ২০ হাজার ৩৬০ ও কমলনগর উপজেলায় ১৪ হাজার ১০০ কার্ডধারী জেলে পরিবার রয়েছে।

এমএইউ/এনআই

আরও পড়ুন

Islami Bank
ASUS GLOBAL BRAND