• ঢাকা
  • সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯, ৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৬:১৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৬:১৫ পিএম

ঈদ আনন্দে ঘুরে আসুন নাটোর

বর্ষার অপরূপ সাজে সেজেছে চলনবিল

গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা
বর্ষার অপরূপ সাজে সেজেছে চলনবিল
এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিল চলনবিল  -  ছবি : জাগরণ

এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী। ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনি। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের এই বিখ্যাত গানই মনে করিয়ে করে দেয় গ্রাম-বাংলার এই চিরায়ত অপরূপের কথা।

এশিয়ার সর্ব বৃহৎ বিল চলনবিল। পানি চলমান থাকায় এই বিলের নামকরণ হয়েছে চলনবিল। এখন বর্ষাকাল হওয়ায় বিলটি ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা রূপ। প্রয়োজনের তাগিদেই ভাসমান মানুষ গুলো ডিঙি নৌকায় ছুটে চলেছে দিগ্বিদিক। দ্বীপের মত গ্রামগুলো যেন একেকটা ভাসমান বাজার। বর্ষায় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়া, গ্রাম থেকে শহর, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজারসহ যোগাযোগের সব জায়গায় ভাসমান মানুষগুলোর নিত্য সাথীই যেন ঐতিহ্যবাহী ডিঙি নৌকা। বর্ষা এলেই চারদিক অথৈই জলে ডুবে যায় মাঠ-ঘাট রাস্তাসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা। আর তখনই দেখা যায় চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী বাহারী সব ডিঙি নৌকা। কোনোটা চলছে পাল উড়িয়ে, কোনোটা ঠেলা নৌকা, আবার কোনোটা স্টিলের তৈরি ইঞ্জিনচালিত। কারণ চলনবিল এলাকার অধিকাংশ রাস্তা ঘাট (সাবমার্চেবল) বর্ষা এলেই পানির নিচে ডুবে যায়। তখন ডিঙি নৌকাই হয় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।

ঈদ উপলক্ষে চলনবিলের বিলশাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভীড় লক্ষ করা যায়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষগুলো ঈদ আনন্দ একটু বাড়িয়ে নিতে চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। নানা শ্রেণীপেশার মানুষ এখানে এসে ভীড় করে একটু বিনোদনের জন্য।

চলনবিলের মাঝ দিয়ে বয়েচলা রাস্তার দু’পাশে বিশাল জলরাশি, যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ নৌকা, বাস, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে ছুটে আসেন চলনবিলকে এক নজর দেখতে।

চলনবিলের বুক চিরে নির্মিত হয়েছে মা জননী সেতু। পাশেই রয়েছে স্বর্ণদ্বীপ ও গ্রিনল্যান্ড নামের দুটি বিনোদনকেন্দ্র  -  ছবি : জাগরণ

নাটোরের গুরুদাসপুর চলনবিল যাদুঘরে গিয়ে দেখা যাবে বিলুপ্তপ্রায় সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর প্রতিচ্ছবি। এখনো দেখা যায় গহনার নৌকা, তালের ডোঙ্গা, কলাগাছের ভেলা (ভুরা), পানসী নৌকা, গরু ও মহিষের গাড়ি, পালকি ও ডুলি, ঘোড়া, সেঁউতি, যাঁতা, বাথান, খরম, হুকা, পাতকুয়া, তফিল এবং গাইজা, বাদ্যযত্র, কলের গান, পলো বিভিন্ন দেশের টাকা মুদ্রা, তীর-ধনুকসহ বাহারী সব প্রাচীন তৈজসপত্র। এছাড়া চলনবিলের বুকচিরে নির্মিত হয়েছে মা জননী সেতু। পাশেই রয়েছে স্বর্ণদীপ ও গ্রীনল্যান্ড নামে দুইটি বিনোদন কেন্দ্র। যা চলনবিলকে করেছে আকর্ষণীয়।

এছাড়া সিংড়া উপজেলায় রয়েছে বেদে পল্লী, ঘাঁসি দেওয়ানের মাজার, কবিরগঞ্জ পর্যটন কেন্দ্র (সিংড়া পয়েন্ট)। তাড়াশ উজেলায় রয়েছে গোবিন্দ নাট মন্দির, বিলসারা বেহুলা লক্ষিন্দরের কূপ, শাহ শরিফ জিন্দানী (র.) মাজার শরীফ। এছাড়া নাটোরের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা, রাণী ভবানীর বাড়ি, উত্তরা গণভবনসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থাপনা। চলন বিলের সৌন্দর্যকে আরো আকর্ষণীয় করে বালিহাঁস, তিরমূল, বাটুলে, মুরগীহাঁস, খয়রা, মানিক জোড়, ডুটরা, চা-পাখি, লোহাড়াং, মেমারচ, বোতক, নলকাক, সাদা বক, কানা বক, ফেফী, ডাহুক, চখা, বকধেনু, ইচাবক, করা, কাছিচোরা, রাতচোরা, ভুবনচিলা, মাছরাঙা, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাখি।

ছোট্ট ছোট্ট ভূখণ্ড। প্রান্তজুড়ে বিশাল জলরাশি। বর্ষায় উন্মুক্ত মাছ, ডিঙ্গি-পালতোলা নৌকার বাহারী সব ব্যবহার। আর শুকনো মৌসুমে বছুরজুড়েই নানা রকম শস্যে সজ্জিত থাকে এই ভূ-খণ্ডের গ্রামগুলো। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎসহ ষড়ঋতুতেই দেখা মেলে অপরূপ বৈচিত্র্যের নানা নিদর্শন। মানুষে মানুষেও রয়েছে সম্প্রীতি। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। সকল ধর্ম-বর্ণ ও নানা পেশাজীবী মানুষের সহাবস্থান। 

চলনবিল নাটোর জেলার সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই, সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া, এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চল মিলে চলনবিলের অবস্থান। মোট ৮ টি উপজেলার ৬২ টি ইউনিয়ন এবং ৮ টি পৌরসভা নিয়ে বর্তমানে চলনবিল গঠিত। যার গ্রাম সংখ্যা ১৬শ টি, লোকসংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষাধিক।

চলনবিল অঞ্চলে রয়েছে ২১টি নদী ও ৯৩টি ছোট-বড় বিল। এখানে রয়েছে নানা শ্রেণীর সুপেয় পানির মৎস্য সম্পদ কৈ, মাগুর, বাচা, ইলশ, রুই, কাতলা, বাটা, মৃগেল, কালবাউস, আইড়গুজাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন এর মধ্যে অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে।

চলনবিল অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে বিরাট অংশ হচ্ছে আদিবাসী, জেলে, মুচি পরিবারসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। তাড়াশ উপজেলায় আদিবাসীদের বসবাসই বেশি। এদের মধ্যে মাধাইনগর, দেশীগ্রাম, তালম, বারুহাস, মাগুরা বিনোদ, নওগাঁ, তাড়াশ ও সগুনা ইউনিয়নে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠী হচ্ছে- উরাও, মাহাতো, তুরি, লোহারা, বসাক, রায়, পাচান, ঋষি, রবিদাস, কোচ এবং সিং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ আছে।

এমএইউ/এনআই

আরও পড়ুন