• ঢাকা
  • সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯, ৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৭:০৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ১১, ২০১৯, ০৮:০৮ পিএম

ঈদের খুশি নেই রিফাতের পরিবারে

বরগুনা সংবাদদাতা
ঈদের খুশি নেই রিফাতের পরিবারে
রিফাতদের বাড়ি-ছবি : জাগরণ

‘বাবায় আমারে নিজের হাতে খাওয়াইতো, আমি অসুস্থ হইলে আমার পাশে বইস্যা কত্ত সেবা-যত্ন করতো’। আমার আব্বু কোরবানীতে রুটি খাইতো, কলিজা ভুনা খাইতো’। আহারে আমার বাবা! আমার বাবারে হারাইয়া আমি অসহায় অইয়া পড়ছি’। বার বার বিলাপ করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন নিহত রিফাতের মা ডেইজী বেগম। 

ঈদুল আজহা যখন আনন্দের বার্তা নিয়ে মানুষের দ্বারে কড়া নাড়ছে, শোকে নিভৃতে কাঁদছে তখন রিফাতের গোটা বাড়ি। আনন্দের পরিবর্তে চারদিকটায় যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষাদের সূর। যে ছেলেটি খুশিতে গোটা বাড়িটা মাতিয়ে রাখতেন, সেই ছেলে নেই। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর পর সেই যে বিছানায় পড়েছেন মা ডেইজী, আর উঠতেই পারছেন না। দেড় মাসের বেশি সময় কেটেছে, কিন্তু ছেলে হারানোর শোকটা তিনি কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।

কোরবানিতে ছেলের বিশেষ পছন্দ ছিল রুটি আর কলিজা ভুনা। রান্না করে নিজের হাতে খাওয়াতেন ছেলেকে। ছেলেও নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন মা’কে। মায়ের কাছে সেসব এখন কেবলই স্মৃতি। কিছুতেই মানতে পারছেন না, রিফাত নেই। তিনি বলেন, আমি অপেক্ষায় থাকি, রিফাতের মোটরসাইকেলের শব্দ এই বুঝি কানে ভেসে এলো, মনের অজান্তেই বলে ফেলি, ‘মৌ (নিহত রিফাতের ছোটো বোন), মা; দরজা খোল, রিফাত আসছে’।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেরে যারা কুপিয়ে মেরেছে, তাদের কেউ যেন রেহাই না পায়, প্রত্যেককে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক। ‘আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার দেখে মরতে চাই, খুনীদের ফাঁসি চাই’, বলতে বলতে ফের কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

রিফাতের বোন ইসরাত জাহান মৌ। তিনি বরগুনা সরকারি কলেজে এবছর উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। কলেজের সেই গেট মাড়িয়েই তাঁকে ক্লাসে যেতে হয়, যে গেটের সামনে দেড় মাস আগে তাঁর ভাই রিফাতকে কুপিয়ে জখম করেছিল একদল দুর্বৃত্ত। মৌ বলেন, প্রত্যেকবার কোরবানির দিন সকালে ভাইয়া আমার হাতের নুডুলস খেয়ে নামাজ পড়তে যেত, সকালে উঠেই বলত, ‘মৌ  নুডুলস রান্না কর, আমি রান্না করে দিতাম। নুডুলস খেয়ে নামাজ পড়তে যেত। নামাজ পড়া শেষে বাবা কাকাদের সাথে গরু জবাই করে মাংস নিয়ে ফিরে বলত, ‘মৌ কাবাব বানা, তোর হাতের রান্না করা নুডলস আর কাবাব আমার খুব পছন্দ। আমি জানতাম আমার ভাইয়া আমার হাতের নুডলস আর কাবাব পছন্দ করত। খুব যত্নে বানিয়ে যখন ওর সামনে দিতাম। ভাইয়া নিজের হাতে মা ও আমাকে খাইয়ে দিত। ভাইয়া মারা যাওয়ার পর আমি আম ও নুডলস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। কারণ, ভাইয়ার এ দুটো খাবার খুব পছন্দ ছিল। ভাইয়ার পছন্দের খাবার আমার সামনে এলে আমি খেতে পারি না। কথাগুলো বলতে বলতে কান্না ভেঙে পড়েন মৌ।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দুই ভাইবোন আর মা, এই চারজনের সংসারটা ছিল এক টুকরো সুখের ছবি। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, আমার মা অসুস্থ, তবুও প্রতিদিনই ভাইয়ার কবরের পাশে গিয়ে কমপক্ষে তিন-চার ঘণ্টা কান্না করেন। বিছানায় হঠাৎই কখনো ডুকরে, আবার কখনো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। তকে কী শান্তনা দেবো, কে শান্তনা দেবে বলুন। শান্তনা শুধু এতটুকুই ‘আমার ভাইকে যারা মেরেছে, আমি দ্রুত তাদের গলায় ফাঁসির দড়ি দেখতে চাই’।

রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ পুত্র শোকে অনেকটা পাথর হয়েই আছেন। একদিকে ছেলে হারানোর শোক বইছেন নিজে, অপরদিকে রিফাতের মৃত্যুতে শোকে বিহবল গোটা পরিবারকেও দেখতে হয় তাঁর। তাই চাইলেও কাঁদতে পারেন না তিনি। তবু চোখের জল কার কথা শোনে! রিফাতের প্রসঙ্গে জানতে চাইতেই তিনি কেঁদে ওঠেন। বলেন, ঈদে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করত রিফাত। আমি ওরে সেলামি দিতাম। ওর সখ ছিল পাঞ্জাবি ও এক জোড়া জুতো, এর বেশি কিছু কখনোই চাইতো না। বাবা-ছেলে মিলে একসঙ্গে ঈদের নামাজে যেতাম, ফিরে একসঙ্গে সবাই খেতে বসতাম। ও নেই, আমার তো আসলে অবশিষ্ট আর কিছুই নেই। কারণ রিফাত ছিল আমার একমাত্র ছেলে। দুচোখের পাতা ভারি হয়ে ওঠে দুলাল শরীফের। দু’ফোঁটা জল চোখের কোন গড়িয়ে মাটিতে পড়ে। কথা বলতে পারেন না তিনি। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। প্রাণপণ কান্না চাপিয়ে বলেন, ছেলেকে তো আর ফেরত পাবো না, হত্যাকারীদের বিচার দেখতে পারলে কেবল আত্মার শান্তি। 

সন্ধ্যা ঘনিয়ে তখন কেবল রাত নেমেছে। বরগুনার বড় লবণগোলা এলাকায় রিফাতের বাড়িতে প্রবেশপথে ঠিক বাঁ পাশের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে রিফাতের মরদেহ। পরিবারেরই কেউ একজন যত্ন করে আনারশের চারা রোপণ করেছে। চারাগুলো বাড়ছে প্রতিদিন, সতেজ হয়ে উঠছে একটু একটু। আর ঈদকে কেন্দ্র করে নিহত রিফাতের পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ফেরার পথেও কানে ভেসে আসে রিফাতের মায়ের আহাজারি, ‘আরে আমার বাবা, আমার বাবায় কই হারাইয়া গ্যালো, তোমরা আমার বাবারে আইন্যা দেও’। রিফাতের মা জানেন, তাঁর ছেলে কোনোদিনই আর ফিরবে না, কেননা, সে যেখানে চলে গেছে, সেখান থেকে আর কেউ ফেরেনি কোনোদিনই। তবুও তো ‘পরানের ব্যথা মরে না’ক সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে’।

এমএইউ

আরও পড়ুন