• ঢাকা
  • সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯, ১০:১০ এএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯, ১০:১০ এএম

দৃষ্টিনন্দন মহেড়া জমিদার বাড়ি

মো. রায়হান সরকার রবিন, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা 
দৃষ্টিনন্দন মহেড়া জমিদার বাড়ি

ব্রিটিশ শাসন নেই, নেই জমিদারের দূর দমনীয় প্রতাপ, শুধু আছে তাদের স্মৃতি বিচরিত কীর্তি। তেমনি একটি স্থাপত্য নিদর্শন হলো মির্জাপুর মহেড়া জমিদার বাড়ি। টাঙ্গাইল সদর থেকে প্রায় ১৮ মাইল পূর্ব দক্ষিণে এবং মির্জাপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত মহেড়া জমিদার বাড়ি। মহেড়া জমিদার বাড়ি কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়েছে জমিদারদের শাসন ও শোষণের ইতিহাস নিয়ে।

এই জমিদার বাড়িতে রয়েছে সু-বিশাল ৩টি প্রধান ভবন। সঙ্গে রয়েছে কাচারি ঘর, নায়েব সাহেবের ঘর, গোস্থাদের ঘর, প্রার্থনার জন্য মন্দির এবং জমিদারদের দাস-দাসিদের থাকার জন্য কয়েকটি ঘর। ভবনগুলোতে রয়েছে সু-উচ্চ প্রাচীর। বাড়িতে প্রবেশের জন্য রয়েছে ২টি প্রবেশ দ্বার। সামনে রয়েছে গোছল করার জন্য বিশাল দীঘি। প্রত্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞের মতে ভবনগুলোর নির্মাণ শৈলী রোমান, মোঘল, সিন্দু খেকুদের সাথে মিল রয়েছে। চুন শূরকী আর ইটের সমন্বয়ে ভবনগুলোর কারু কাজ যে কোন দর্শনার্থীর মন কেড়ে নেয়।

হাজারো ফুলের মেলা দেখতে চলুন ঘুরে আসি মহেড়া জমিদার বাড়ি। অপরূপ সাজে সাজানো এই জমিদার বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই চলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পিকনিক এবং বিভিন্ন নাটক বা ছবির শুটিং। ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এখানে প্রবেশের শুভেচ্ছা মূল্য মাত্র ৮০ টাকা। পিকনিক বা শুটিং স্পট ভাড়া দেওয়া হয় আলোচনা সাপেক্ষে। আর খাবার ও পানীয়ের জন্য আছে স্বল্প মূল্যের ক্যান্টিন সুবিধা। আগেই অর্ডার দিলে আপনার পছন্দের মেনু অনুযায়ী যে কোন খাবার সরবরাহ করা হবে। তাহলে আর দেরি নয় চলুন আজই ঘুরে আসি। ও আপনি যদি জমিদার বাড়িতে পূর্ণিমা স্নান বা রাত্রী যাপন করতে চান তার জন্য এসি/নন এসি ডাক বাংলোর সুব্যবস্থা আছে। খুব সকালে এবং বিকেলে দেখতে পাবেন পুরুষ এবং মহিলা পুলিশের মাঠ প্রশিক্ষণ কসরত। বিশাখা সাগর সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে বিশাল আম্র কানন। ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগসহ দেশি বিভিন্ন প্রজাতির আম্র বৃক্ষ শোভা পাচ্ছে। আম্র কানন ব্যতীত বর্তমান পিটিসি’র প্রায় ৪৪ একর জমিতে সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা বৈচিত্র্যময় ফলের সমারোহ। এর মধ্যে আম, কাঁঠাল, নারিকেল, ছবেদা, জলপাই, হরিতক ইত্যাদি ফল ও ঔষধি গাছ অন্যতম। সুবিশাল ফলজ বৃক্ষের সমারোহ ফুলে-ফলে, পত্র-পল্লবে মাতিয়ে রাখে এ প্রাঙ্গণ সারাটি বছর। নানা প্রজাতির ফুলের সমারোহ এবং সুগন্ধে দর্শকদের আকুল করে সারা বছর। শীতকালে এখানে হাজারো চেনা অচেনা ফুলে ফুলে প্রজাপতির মেলা বসে রোজ। সৌখিন ফটোগ্রাফারদের জন্য চমৎকার এক লোকেশন। দর্শনার্থীদের জন্য আছে কয়েকটি আকর্ষণীয় দোলনা এবং মাছ, পাখী, জীব-জন্তুর কৃত্তিম চিড়িয়াখানা। এছাড়াও বিশাখা সাগরে আছে নৌভ্রমনের জন্য অন্যতম আকর্ষণ সোনার তরী এবং সপ্তডিঙ্গা। অপরুপ স্থাপত্য আধুনিক শহীদ মিনার আপনাকে সামান্য সময়ের জন্য হলেও স্তম্ভিত করে দিবে। 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৯০ দশকের পূর্বে জমিদার বাড়িটির পত্তন ঘটে। কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা নামে দুই ভাই কলকাতায় লবণ ও ডালের ব্যবসা করে প্রচুর টাকা পয়সা রোজগার করে চলে আসেন মহেড়া গ্রামে। মহেড়া গ্রামে তারা ১ হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর এ সুবিশাল বাড়িটি নির্মাণ করেন।

দৃষ্টিনন্দন এই জমিদার বাড়ির রয়েছে এক কলঙ্কিত স্মৃতি। ১৯৭১ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাকবাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়িতে হামলা করে এবং জমিদার বাড়ির কূলবধূ যোগমায়া রায় চৌধুরীসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে চৌধুরী লজের মন্দিরের পেছনে একত্রে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। তন্মধ্যে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পন্ডিত বিমল কুমার সরকার, মনিন্দ্র কুমার চক্রবর্তী, অতুল চন্দ্র সাহা এবং নোয়াই বণিক ছিলেন। ইতিহাস কলঙ্কিত সেই রক্তের দাগ এখনো লেগে আছে মহেড়া জমিদার বাড়িতে। যে দেশের জন্য, যে দেশের মানুষের জন্য মহেড়া জমিদার পরিবার নিজেদের শত প্রাচুর্য ভুলে এলাকার উন্নয়নে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন, সেই এলাকার রাজাকার আল-বদরদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনীর এই চরম হত্যাযজ্ঞে জমিদার পরিবার শুধু হতাশ হননি, শত বছরের সাজানো জমিদার বাড়ি আর কোটি টাকার সম্পদ ফেলে চরম ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে লৌহজং নদীর নৌপথে নৌকা যোগে চলে যান বাংলাদেশ ছেড়ে। অতঃপর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বায়েজীদ সাহেবের নেতৃত্বে এক প্লাটুন মুক্তিবাহিনী জমিদার বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করে।


স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই অপরুপ নির্মাণ শৈলী পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

যেভাবে যেতে হবে- ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে অপেক্ষমাণ সিএনজি বেবিরিকশা যোগে (ভাড়া ৭৫ টাকা, শেয়ারে জন প্রতি ১৫ টাকা) ০৩ কি.মি. পূর্ব দিকে মহেড়া জমিদার বাড়ি। মহাসড়কে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, মহেড়া, টাঙ্গাইল নামে দিক নির্দেশনা ফলক (বিশাল সাইনবোর্ড) রয়েছে। আর যারা উত্তরবঙ্গ থেকে আসবেন তারা যে কোন ঢাকাগামী বাসে টাঙ্গাইল পার হয়ে ১৭ কি.মি. পর নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে একইভাবে যেতে পারেন।

কেএসটি

আরও পড়ুন

Islami Bank