• ঢাকা
  • সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২০, ০৮:০৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ১৯, ২০২০, ০৮:০৪ পিএম

বরগুনায় চলছে দুর্নীতি ও অনিয়ম

বেতাগীতে প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিতরণকে কেন্দ্র করে অর্থবাণিজ্য 

নাহিদ এম হোসেন লিটু, বরগুনা
বেতাগীতে প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিতরণকে কেন্দ্র করে অর্থবাণিজ্য 
অভিযুক্ত মিজান মেম্বার- দৈনিক জাগরণ

ইউনিয়ন পরিষদের দুস্থদের তালিকায় নাম দিয়ে সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দ ও সুবিধা প্রাপ্তির কথা বলে ২'শ থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে- বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিজান বিভিন্ন সরকারি ভাতার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেয়ার কথা বলে প্রায়ই টাকা তুলছেন। তবে এ পর্যন্ত কোনো বরাদ্দ বা সুবিধা পাননি দুস্থরা। চলমান সংকটের মাঝে অনেকেই নানাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার করে এই সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে এখন বিপদে রয়েছেন।

কিন্তু এই মিজান হোসনাবাদ ইউনিয়নে এতটাই প্রভাব বিস্তার করে যে, কোন ভুক্তভোগী তার বিপক্ষে নাম প্রকাশে অনিহা প্রকাশ করে। অভিযোগ আছে যে, এমন কোন অপকর্ম নেই, যা মিজান করেনি। মিজানের ছত্রছায়ায় এলাকার বেশ কিছু বখাটে, কুখ্যাত অপরাধীরা রয়েছে। বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, মিজান এক সময়ে অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। মাদক, জুয়া, ঘুষ, দূর্নীতি, নারী কেলেংকারী ও মাস্তানি; অপরাধের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে তার বিচরণ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দিনমজুর যুবক অভিযোগ করে বলেন, আজ থেকে আরও ১ বছর আগে, তার বাবার নামে বয়স্ক ভাতার কার্ড দেয়ার কথা বলে ১০০০ টাকা নিয়েছে মিজান মেম্বার, যেই কার্ড আজও সে পায়নি।

একই এলাকার পঞ্চাশর্ধ এক বিধবা বলেন, আমি মিজান মেম্বারের নিকট বিধবা ভাতা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বললে, মিজান তালিকাভুক্ত করে দেয়ার কথা বলে ৩৫০০ টাকা দাবি করে। আমি টাকাও দিতে পারেনি এবং নামও তালিকাভুক্ত হয়নি। ওই মহিলার পাড়া প্রতিবেশীরা বলেন, অত্র এলাকা থেকে একজন মহিলার নাম যদি বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় তবে, তা এই মহিলার নাম তালিকাভুক্ত হওয়া উচিৎ।

এসময় এলাকাবাসী আরও অভিযোগ করে বলেন দিনের পর দিন বেপারোয়া হয়ে ওঠেছে ইউপি সদস্য মিজান। ঢাকা থেকে এক ব্যাক্তি প্রায় সময় মাদকের (ইয়াবা/গাজা) চালান নিয়ে এলাকায় আসে। যা অভিযুক্ত মেম্বাররের ক্যাডার বাহিনী দিয়ে হোসনাবাদ সহ বেতাগীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে করে স্থানীয় তরুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ হুমকির মুহে রয়েছে।

একই এলাকার এক রিক্সা শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, তিন বছর আগে তার মেয়ে পারিবারিক কলহের কারণে বাবার বাড়ি এলে, মেয়ের স্বামী সহ শশুড় বাড়ির লোকজন মিজান মেম্বারের কাছে আসলে, বিবাহ বিচ্ছেদের শালিসি ব্যবস্থার কথা বলে ছেলে পক্ষের নিকট হতে ৪০ হাজার টাকা জামানত রাখে ইউপি সদস্য মিজান। পরবর্তীতে দুই পরিবারের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলে, মিজানের কাছে জমা থাকা ৪০ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া হলে, ২০ হাজার টাকা দিয়ে অবশিষ্ট ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে সে।

বেতাগীর প্রভাবশালী এক নেতার ভাগ্নে হওয়ায় তার ভয়ে জনসন্মুখে কেউ মুখ খুলতে চায় না। সেই নেতার প্রভাব খাটিয়েই এলাকায় একের পর এক অপকর্ম করে বেড়ায় মিজান।

আরও জানা যায়, কিছুদিন আগে সরকার হতে প্রদেয় রেশন কার্ড দেবার কথা বলে হোসনাবাদের একটি গ্রাম থেকে ১৮ জনের কাছ হতে ২০০ টাকা করে মোট ৩৬০০ টাকা, মিজানের দালাল মঞ্জুর উঠায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়াল বাড়ি এলাকার আরও একজন জানায়, মিজান ওই এলাকার এক মেয়ের পারিবারিক কলহের জের শুনে পটুয়াখালীর গলাচিপা এলাকায় শালিসি করেন। ওই এলাকার চেয়ারম্যান ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান করে দেয়। তারপরও মিজান এলাকায় এসে মেয়ের পরিবারের কাছ থেকে ২৫০০০ টাকা আদায় করে।

কাটাখালির এক হিন্দু পরিবার জাগরণ প্রতিবেদককে বলেন- আমরা নিতান্ত অসহায় হতদরিদ্র। সরকার আমাদের মত দুস্থদের জন্য যেই খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দেয়, সেই সহায়তা তারা পায় যাদের এই সহায়তার প্রয়োজন নেই। তাদের পিপা ভরা চাল থাকার পরও তাদের ঘরে ত্রান যায়। আমি এ যাবৎ কালের মধ্যে, ২-৩ দিন আগে ১০ সের চাল পেয়েছি। সহায়তা কার্ডের জন্য যেই পরিমাণ অর্থ মেম্বারদের দেয়া লাগে, সেই পরিমাণ অর্থ আমরা দিতে পারিনা, তাই সহায়তাও পাইনা।

হোসনাবাদ গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, আমরা প্রকৃত জেলে হলেও মিজান মেম্বার তার কাছের লোকজন যারা তাদেরকে জেলেদের চাল দেয়। তার মাঝে অনেকেই এই জেলে পেশায় নয়।

এছাড়াও তার বিরুদ্ধে সরকারি ঘর দেবার নাম করে অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এলাকাবাসী আরো জানান, যারা যারা জাগরণ প্রতিবেদকের কাছে মিজানের অপকর্ম নিয়ে মুখ খুলেছে, মিজানের লালিত ক্যাডার বাহিনী আসাদ, রিন্টু ও শিপন অভিযোগকারীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভীতি প্রদর্শন করছে। 

মিজানের সহকর্মী একই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মন্টু মেম্বার বলেন, মিজানের ঢাকা শহরে ২টি বাস আছে। সে যথেষ্ট সাবলম্বী। জানিনা কেন সে এমন কাজ করলো? সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা হোক। আমাদের ইউনিয়নের মান সন্মানের প্রশ্নে কোন আপোষ নেই।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মিজানের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। 

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, যারা এমন দূর্নীতিতে জড়িত আমি তাদের ঘৃনা করি। দেশ এখন ক্রান্তিলগ্নের মাঝ দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এরকম গুটি কয়েক লোক সরকারের সমস্ত অর্জন ম্লান করে গরীবের ওপর শোষণ চালাচ্ছে। আপনাদের মাধ্যমে হোসনাবাদবাসীদের জানাতে চাই, যারা রেশন কার্ড, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতার প্রাপ্য তারাই এই সকল সুবিধা পাবে। কেউ যদি এধরণের অনৈতিক ভাবে আর্থিক সুবিধা লুফে নিতে চায় তাদের সহযোগিতা করবেন না। বরং এদেরকে আইনের হাতে তুলে দিন।

বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহসান বলেন- আমিও এরকম অভিযোগ শুনেছি, তবে কোন ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিতে অপারগ। আমি লিখিত অভিযোগ পেলেই,  তাৎক্ষনিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

হোসনাবাদ ইউনিয়নের সাবেক ৫ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও বর্তমান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান ফোরকান ঘটনা শুনেছেন বলে দৈনিক জাগরণকে জানান। সঠিক প্রমানের অভাবে তিনি কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তবে উপযুক্ত প্রমাণাদি হাতে পেলেই এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এলাকাবাসীর দাবি টাকা ফেরত দিলেই হবে না। মিজান যেই অন্যায় করেছে, তার এমন শাস্তি হওয়া উচিৎ যাতে আগামীতে কেউ এমন কাজ করার সুযোগ না পায়।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া আপদকালীন উপহার মানুষের মাঝে বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না বলে ঘোষণা দেয়ার পরেও এমন ধৃষ্টতা প্রদর্শনের অভযোগ পাওয়া গেছে অভিযুক্ত মিজান মেম্বারের বিরুদ্ধে। বেতাগীবসী এই সংকট নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছেন।

এসকে