• ঢাকা
  • রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮
প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২১, ০৪:২৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ৩, ২০২১, ১০:২৮ এএম

জীবন বাচাঁতে দিন-রাত ছুটছে ওরা!

জীবন বাচাঁতে দিন-রাত ছুটছে ওরা!

মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা

মাদার তেরেসার ভাষায়, 'যদি তুমি দৃশ্যমান মানুষকে ভালোবাসতে না পারো', তবে অদৃশ্য ঈশ্বরকে কি করে ভালোবাসবে?- আবার ভুপেন হাজারিকা তার গানের ভাষায় বলেছেন, 'মানুষ মানুষের জন্য'; 'জীবন জীবনের জন্য'; একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? আর মানুষের মাঝে থেকে হারিয়ে যাওয়া এই অচীন (ভালবাসা) শব্দটির খোঁজ মিলেছে গাইবান্ধার কিছু দুঃসাহসী, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, উদ্যমী ও উচ্চ শিক্ষিত যুবকের মাঝে। নিজ জেলাকে ভালবেসে আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যে গড়ে তোলা সংগঠনটির নাম দেওয়া হয়েছে 'আমাদের গাইবান্ধা'।

করোনার শুরু থেকেই গাইবান্ধা জেলা হটস্পট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তখন থেকেই শুরু ওদের মানবিক যাত্রা। বর্তমানে সারা দেশের মতো গাইবান্ধাতেও করোনা ভয়ংকর রুপ ধারণ করেছে। করোনা রোগীর সংখ্যা হু হু করে যখন বাড়তে শুরু করলো; কোনভাবেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছিলোনা, তখন গাইবান্ধায় যে জিনিসটার ভীষণ সংকট দেখা দিল, সেটা হলো অক্সিজেন। প্রথম দিকে শ্বাসকষ্টে ছটফট করা রোগীরা সদর হাসপাতালে অক্সিজেন সেবা পেলেও রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দেখা দেয় চরম অক্সিজেন সংকট। ঠিক তখন গাইবান্ধায় বেশ কয়েকটি সংগঠন এই পরিস্থিতিকে সামাল দিতে অক্সিজেন সেবা নিয়ে কাজ শুরু করে। যারমধ্যে 'আমাদের গাইবান্ধা" সংগঠনটি অন্যতম।

মাঝরাতে আপনার বাড়িতে রোগীর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটতে হবে? করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভীষণ উৎকন্ঠায় আছেন, চিকিৎসক এবং অ্যাম্বুলেন্স লাগবে? করোনায় মারা গেছে আপনার স্বজন, পরিবার মরদেহকে ছুতে ভয় পাচ্ছে? আবার দাফন-কাফনও করতে হবে, এইতো? কোন চিন্তা নেই'। ফোন করলেই করোনা সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান এখন ওদের হাতেই। ওদের হাতেই গড়ে ওঠা 'আমাদের গাইবান্ধা' এখন গাইবান্ধাবাসির কাছে এক বিরাট স্বস্তি এবং ভালবাসার নাম।

অক্সিজেন সেবা দিতে গত ১১ই জুলাই ওরা চালু করে 'আমাদের গাইবান্ধা অক্সিজেন হাব" নামে একটি আলাদা সেবা কার্যক্রম। যারা এই দলটির সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তারা সবাই মেডিকেল শিক্ষার্থী। মাঠ পর্যায়েও অক্সিজেন হাবের সাথে সরাসরি জড়িত থেকে কাজ করছে ওই মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। দিন-রাত অক্সিজেন সিলিন্ডার সেট-আপ করা, অক্সিজেন লেভেল পরিমাপ করা সহ ২৪ ঘন্টাই রোগীর স্বাস্থ্য পর্যালোচনা করে বিরামবিহীনভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে তারা।

বর্তমানে ওরা বেশ কয়েকজন ডাক্তারকে নিয়ে "আমাদের গাইবান্ধা টেলিমিডিসিন টিম" নামে একটি টিম গঠন করেছে, যাতে করে শ্বাসকষ্ট দূর করে রোগীর জীবন বাচাঁনোর পাশাপাশি রোগী বা রোগীর স্বজনরা সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসককে পেয়ে যান। এ জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক হটলাইন নাম্বার। হটলাইন নাম্বারে ফোন করলেই ২৪ ঘন্টা জরুরি সেবা পাচ্ছে চরম উৎকন্ঠায় থাকা গাইবান্ধার করোনা আক্রান্ত রোগী ও তাদের পরিবার।

সম্প্রতি ওরা 'টেলিমেডিন টিম' গঠন করেছে, যাতে করে ঘরে বসেও মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পায়। সেই সাথে 'গাইবান্ধা এমবুলেন্স মালিক সমিতি'র মাধ্যমে গাইবান্ধার ভিতরে ফ্রি-এমবুলেন্স সেবা চালু করেছে ওরা। অক্সিজেন হাব, চিকিৎসা, বিনামূল্যে চিকিৎসা উপকরণ দেওয়ার পাশাপাশি বিনামূল্যে করোনায় মৃত্যবরণকারী ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে দাফন- কাফনের ব্যবস্থাও করছে ওরা।

করোনায় প্রত্যেক মানুষের জীবন যেখানে বিপন্ন, সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবতার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে ব্যাপক প্রশংসায় ভাসছে দুঃসাহসী মায়ের ওই দুরন্ত সন্তানেরা। মানুষের জীবন বাচাঁতে দিন-রাত, ঝর-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছুটে চলছে স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনের একঝাঁক মানবতার সৈনিক। খাদ্য উপহার দেওয়া, স্বাস্থ্য সচেতনা সৃষ্টিসহ বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজেদের জীবন বাজি রাখা ওদের এমন মানবিক কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে গাইবান্ধার সর্ব মহলে। প্রশংসা সূচক মন্তব্যের ঝড় বইছে ওই যুবকদের ভেরিফাই ফেসবুক পেজ 'আমাদের গাইবান্ধা'য়।

দেশ বাচাঁতে ৩০ লাখ শহিদ আত্মত্যাগ করেছেন, অসংখ্য মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন, কিন্তু করোনায় মানুষ বাচাঁনোর যুদ্ধে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা! এটা নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন মানবিক অবক্ষয়ের উদাহরণ। সেইসাথে সমাজ ও দেশের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা মনোনিবেশ করেছি, কিন্তু একটি সুন্দর মানুষিকতার মানুষের দেশ, সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারিনি।

মনুষ্যত্বহীন এই মানুষগুলোর প্রাণে মনুষ্যত্ব সঞ্চার করবে, আর সামনের দিনে মরিচাধরা এই সমাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে ওরাই।