• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২১, ০৩:২৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ২৭, ২০২১, ০৯:২৪ এএম

কার্গো বিমান তৈরি করল অষ্টম শ্রেণি পাস সোহান

কার্গো বিমান তৈরি করল অষ্টম শ্রেণি পাস সোহান
সোহানুর রহমান সোহান। ছবি- জাগরণ।

অষ্টম শেণী পাশ সোহানুর রহমান সোহান। কাজ করে একটি মুরগীর খামারে। দিনে মুরগীর খামারে কাজ করে, রাতে ঘুমের পরিবর্তে মগ্ন বিমান তৈরিতে। এভাবে প্রায় এক বছর চেষ্টার ফলে একদিন তৈরী করে ফেলে একটি কার্গো বিমান। আকাশে উড়িয়েও দেখালো। আর এতে এলাকাবাসীও হতভাগ। সোহানের আশা প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা আর সহায়তা পেলে এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। 

নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের চৈতন্যা গ্রামের ছেলে সোহানুর রহমান সোহান। তিন ভাইয়ের মধ্যে সোহান সবার বড়। বাবা মোক্তার হোসেন পেশায় একজন দিন মজুর। বাবার সামান্য আয় দিয়ে তিন ছেলে ও স্বামী স্ত্রীর পরিবার চলাতে কষ্টকর হয়ে পড়ে। যার ফলে সোহান ছোট বেলা থেকেই ফুফুর বাড়ি জয়নগড়ে চলে আসে। এখানে ফুফাতো ভাইদের মুরগির খামার দেখাশোনার পাশাপাশি লেখাপড়াও করে। এভাবে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে অর্থাভাবে শেষ হয়ে যায় সোহানের লেখাপড়া। এরপর তাদের মুরগীর খামারের কাজেই জড়িয়ে পড়ে সোহান। দিনের বেলা কাজ করে আর রাতে না ঘুমিয়ে গোপনে গোপনে তৈরি করে একটি কার্গো বিমান।

বিমান তৈরীর সরঞ্জাম ক্রয়ে ভাইদের কাছ থেকে সহায়তা নেয় সোহান। এরই মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কার্গো বিমান তৈরি করে একদিন পাশের খেলার মাঠে উড়াতে গেলে শত শত মানুষের ভীড় জেমে যায়। এখন তার তৈরি বিমান দেখতে আশপাশের এলাকা থেকে ছুটে আসেন ছোট বড় হাজারো মানুষ। সোহানের কার্গো বিমান তৈরিতে সফল হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্প হিসেবে বুইং ৭৮৭-৯ মডেলের আরেকটি বিমান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। 

উদ্যেক্তা সোহানুর রহমান সোহান জানায়, পরিবারের অর্থাভাবে ৮ম শ্রেণীর পর আর পড়া হয়নি। তাই ফুফাদের বাড়িতে থেকেই তাদের মুরগীর খামার দেখাশোনা করতে হয়। কিন্তু ছোটবেলা থেকে একটি স্বপ্ন মনের মধ্যে বাসা বাধে। তা হলো পাখি বা বিমান কিভাবে আকাশে ওড়ে। সেই থেকে বিমান তৈরির স্বপ্ন। এভাবে সারাদিন মুরগীর খামারে কাজ করে রাতে না ঘুমিয়ে বিমান তৈরীর জন্য কাজ করতে হয়। আর এই কাজের অর্থসহায়তা করে থাকে তার ফুফাতো ভাই। সোহান আরো জানায়, তাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সুবিধা দিলে সে দেশের বড় বড় বিমান তৈরীতে অবদান রাখতে পারবে। আর এটাই এখন তার স্বপ্ন।

সোহানের ফুফা মো: ফজলুর রহমান জানান, সোহানের পরিবারের অর্থাভাবের কারণে ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে থাকতো, কাজ টাজ করতো। সে দিনে কাজ করে আর রাতে কি এসব তৈরি করে। আমরা প্রথমে তাকে ছেলে মানুষি বলে উড়িয়ে দিতাম। একদিন যখন দেখলাম বাড়ির উপড়ে বিমান উড়তেছে আর তা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে পাশের স্কুলের খেলার মাঠ থেকে, তখই তার প্রতি বিশ্বাস সৃষ্টি হতে থাকে। তার জন্য সরকারের সহায়তা কামনা করেন তিনি। 

স্থানীয় জয়নগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো: ছানা উল্লাহ বলেন, স্কুলের খেলার মাঠে সোহান প্রায়ই বিমান উড়াতে আসে। আর তা দেখার জন্য ছুটে আসে হাজার হাজার মানুষ। এই বিমান উড়ানো দেখে তার প্রতি বিশ্বাস জন্মেছে যে, তার মধ্যে মেধা আছে। সে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা পেলে ভালো কিছু করতে পারবে। অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও সে বিমান তৈরি করেছে এটা এলাকায় এক আশ্চর্য্যজনক সাড়া ফেলে দিয়েছে। 

স্থানীয় প্রবাসী মো: হারুন অর রশিদ জানান, সোহান সকল প্রকার খেলাধুলায় খুবই পারদর্শী। কিন্তু পরিবারের অর্থাভাবে যেখানে সে লেখাপড়াই করতে পারেনি, সেখানে মাত্র অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ে একটি বিমান তৈরি করে ফেলেছে। এটা আমাদের জন্য আশ্চর্য লাগে। তার তৈরি বিমান দেখে এলাকার অনেকইে প্রশংসা করে তার প্রতি সরকারের দৃষ্টি দানের দাবী জানান। 

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মো: দেলোয়ার হোসেন জানান, সোনান অনেক মেধাবী। কিন্তু পরিবারের অর্থাভাবে সে বেশী লেখাপড়া করতে পারেনি। এই লেখাপড়া দিয়েও যে সে বিমান তৈরীর মতো কাজে সফল হয়েছে তার জন্য আমরা এলাকাবাসী গর্বিত। তার এই মেধাকে কাজে লাগাতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।

সোহানের এই উদ্ভাবনের বিষয়ে নরসিংদী জেলা স্কুল কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও নরসিংদী ইন্ডিপেনডেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা জানান, সোহানের এই উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে সোহান দেশের সম্পদ হয়ে দাড়াবে এবং তাকে সরকার বা কোনো পৃষ্ঠপোষকতা দিলে তাকে লেখাপড়া করিয়ে তার পেছনে শ্রম দিলে সে এই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। শুধু সোহান নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে লুকিয়ে আছে এমন অনেক মেধাবী সন্তান। তাদেরও কাজে লাগিয়ে উপযুক্ত শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দিতে পারলে তারা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। 

সোহানের এই মেধাশক্তিকে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কাজে লাগিয়ে দেশের সম্পদে তৈরি হবে এমন প্রত্যাশা সকলের।

 

জাগরণ/এসকেএইচ