• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: মে ২৮, ২০২০, ০২:৫৭ এএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ২৮, ২০২০, ০৩:১৮ এএম

বাড়ছে অসন্তোষ আর অভিযোগ

তুরাগে একের পর এক ধর্ষন, মীম...৬ বছরের শিশু, এরপর?

এস এম সাব্বির খান
তুরাগে একের পর এক ধর্ষন, মীম...৬ বছরের শিশু, এরপর?

• বিশেষ প্রতিবেদন

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকার নাম তুরাগ। যথেষ্ট সম্ভাবনাময় একটি এলাকা হলেও সুদীর্ঘ সময় অবহেলিত থাকা নগরীর সর্ব উত্তরের এই এলাকাটি 'বিশেষ' কিছু কারণে বঞ্চিত থাকে নগরায়নের আশীর্বাদ থেকে। যার কথা এর আগেও বহুবার আলোচনায় এসেছে। শেষ পর্যন্ত বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সুনজর প্রাপ্তির মধ্যদিয়ে রাজধানীর গর্বিত সদস্যে পরিণত হয় তুরাগ। যেখানে রয়েছে তিন তিনটি সিটি ওয়ার্ড। এই স্বাভাবিক বিষয়গুলো বিবেচনা করলেই বোঝা যায় এলাকাটির গুরুত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক বর্বর ধর্ষনের ঘটনা ও প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মনে এখন প্রশ্ন, সরকারের মূল্যায়ণ প্রাপ্ত হয়েও কি তবে সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের চোখে অবহেলিতই রয়ে গেছে তুরাগ?

ধর্ষনের বিরুদ্ধে সোচ্চার তুরাগ

স্থানীয় পরিস্থিতি, ঘটনার প্রেক্ষাপট, প্রশাসন ও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং সর্বপোরী স্থানীয় জনগণের কাছে পাওয়া প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তুরাগের আলোচিত মীম ধর্ষন মামলা প্রসঙ্গ ও পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধানে নামে দৈনিক জাগরণের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক দল। যার একটি বিশেষ অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। অনুসন্ধানী কাজ চলমান থাকায় অনেক তথ্য এ মুহূর্তে আলোচনার বাইরে রাখা হলেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে সেগুলোও সময়ে আলোচনায় আনা হবে। 

সিটিভুক্ত হওয়ার পর পরই তুরাগবাসীর প্রত্যাশিত বিষয়গুলো একে একে বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। যা নিয়ে বেশ সন্তুষ্টির মধ্যেই দিন কাটছিলো তাদের। কিন্তু তুরাগবাসীর প্রাপ্তির এই আনন্দের মাঝে হঠাৎ বিচ্ছেদ ঘটায় সাম্প্রতিক সময়ের একটি আলোচিত ধর্ষনের ঘটনা এবং তার পরবর্তী কিছু বিশেষ বিষয়। 

গত ১৬ই মে, মীম নামের পিতৃহীন ১২ বছর বয়সী এক অসহায় কিশোরীকে ঈদের জামা-কাপড় ও খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার নাম করে নিজ বাসার ৪র্থ তলার একটি ঘরে, ধারালো অস্ত্রের মুখে ধর্ষন করে তুরাগ থানাধীন নয়ানীচালা এলাকার স্থানীয় যুবক তওহীদ (২৭)। অভিযুক্তের প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, এটাই তার লিপ্সার প্রথম ঘটনা নয়। দীর্ঘ দিন ধরেই এমন একের পর এক ধর্ষনকাণ্ড ঘটিয়ে আসছিলো তওহীদ। যার একটি ঘটনায় একবার জেলেও যেতে হয়েছিল তাকে। তথ্য মতে, কখনো 'সিন্ডিকেট' কখনো বা অপয়া কোনো পন্থায় মিলছিলো মুক্তি। আর বিরতিহীন চলছিলো তার শিকারের কাজ। এছাড়া অনেকেরই অভিযোগ, তওহীদের এমন সব অপকর্ম অবলীলায় প্রশ্রয় দিয়ে আসছিল তার পরিবার, বিশেষ করে ধর্ষক তওহীদের মা। স্থানীয়দের এই দাবি যে সত্য সেটি অবশ্য ঘটনার দিন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী এবং প্রশাসনের উপস্থিতে ঔদ্ধত্য মন্তব্যে জানান দিয়েছেন তিনি নিজেও। এদিন একজন স্থানীয় নারী গণমাধ্যমকর্মীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেটি মীমাংসা করা হয়।

স্থানীয় সূত্রের তথ্য, সাম্প্রতিক এই ধর্ষনের ঘটনায় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে স্থানীয় এলাকাবাসী সরব হয়ে ওঠে। ধর্ষক তওহীদ ও তার 'প্রতিরক্ষা সিন্ডিকেটের' বিরুদ্ধে বিচার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন তারা। বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়। এদিকে স্থানীয় একদল সচেতন যুবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবারের ঘটনায় অভিযুক্তের মদদ দাতা এই সিন্ডিকেটের পরিচিতি প্রকাশ করে দেয়ার হুমকি দিলে মূলত বদলে যায় পরিস্থিতি। স্থানীয় পর্যায় থেকে পরিচালিত এলাকাভিত্তিক একটি বিশেষ ফেসবুক গ্রুপের তথ্য অনুসন্ধানেও এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য বলছে, স্থানীয় নেটিজেনদের এই ঘোষণায় তওহীদকে রক্ষাকারী পর্দার আড়ালের সেই হাতগুলো একে একে গুটিয়ে গেলে, অবস্থা বেগতিক দেখে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় সে।

এই ঘটনার পর এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৫ দিনের বেশি সময়। স্থানীয়দের অভিযোগ- আইনি তৎপরতা, সামাজিক প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসন্তোষের ঝড়, স্থানীয় প্রভাবশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সজাগ দৃষ্টি, তুরাগের সচেতন যুব সমাজের বিচারের দাবি- এমন সব কিছুই চলছে কিন্তু সে সবই যেন ব্যর্থ করে দিয়ে এখনও আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে অভিযুক্ত ধর্ষক। যা কিনা অত্র এলাকায় বিকৃত এই সামাজিক ব্যাধির বিস্তার সৃষ্টিকে উস্কে দিচ্ছে। এরইমধ্যে এলাকার প্রতিটি পরিবার উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে তারা যারা এই ধর্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার কাজে মূল ভূমিকা রাখছেন।

আলোচিত মীম ধর্ষনের পলাতক আসামী তওহীদ

আলোচিত এই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মীম ধর্ষন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওয়াজিউর রহমান জানান, ঘটনার পর পরই মীমকে হেফাজতে নিয়ে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। থানায় অভিযুক্ত তওহীদকে আসামী করে একটি ধর্ষন মামলা দায়ের করেছেন মীমের ভাই আল আমিন। ঢামেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় মীমের শরীরে নির্যাতিত হবার আলামত পাওয়া গেছে। এরইমধ্যে আদালতে তাকে হাজির করে নিবন্ধিত হয়েছে জবানবন্দী। আসামী এখনও পলাতক রয়েছে। তবে তাকে গ্রেফতারে সর্বাত্মক তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ। এ ব্যাপারে একাধিকবার তার পরিবারকে তওহীদের আত্মসমর্পণের বিষয়ে তাড়নাও দেয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে খুব দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। এ সময় নির্যাতনের শিকার মীম বা তার পরিবারের কারো সঙ্গে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম আছে কিনা জানতে চাইলে জানা যায়, পরিবারটির কোনো সদস্য মোবাইল ব্যবহার করেন না।

এদিকে মীম ধর্ষন মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ যাবত জাগরণের অনুসন্ধানী দলের হাতে আসা তথ্যগুলো স্বাভাবিকভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে ঘটনা সংক্রান্ত কিছু তথ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। যার অনেকগুলোই অনুসন্ধানকালে তুলে ধরেছেন তুরাগের সুশীল সমাজের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গও। তাদের ভাষ্য, হয়তো সকল কার্যক্রমই চলছে যথাযথভাবে তবে তথ্য সমন্বয়ের কিছু অসামঞ্জস্যতা সেই প্রশ্নগুলো সৃষ্টি করছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিবেচনায় না নিয়ে এখনই এ প্রসঙ্গে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াও ঠিক হবে না বলেও মনে করেন তারা।

বিভিন্ন সময় তদন্ত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এ ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহয়তা করেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং তুরাগ থানা পুলিশ। এ সকল তথ্যের আলোকে জানা যায়, ঢাকায় শুধু মায়ের সঙ্গে থাকতো মীম। তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কেউ তাদের সঙ্গে থাকতো না। ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে কাটতো জীবন। গত ১৬ মে'র ঘটনার প্রেক্ষিতে তওহীদকে আসামী করে থানায় যে ধর্ষন মামলাটি দায়ের করা হয়েছে, তার বাদী মীমের বড় ভাই আল আমিন। ঢামেক থেকে মীমকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ঘটনার অন্তত ৪ দিন পর। সেদিন থানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, মীমের ভাই অর্থাৎ মামলার বাদী গ্রাম থেকে ঢাকা আসছেন, তার সঙ্গেই আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে মীমকে। একই দিন রাতে পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জানানো হয়, আদালতে মীমকে উপস্থিত করে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে। শারীরিক অবস্থা ভাল থাকায় তাকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সময়ে সময়ে খোঁজ রাখা হচ্ছে।

বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্যগুলোর সমন্বয়ের ক্ষেত্রটি অনেকটা এমন, মা সঙ্গে থাকলেও মীমের ঘটনায় তাকে বাদী করা হয়নি, বাদী করা হয়েছে তার ভাইকে। অথচ তথ্য বলছে তিনি ঢাকায় আসছেন ঘটনার চারদিন পর। তাহলে ঘটনার দিনই যে মামলা করা হয়েছে সে মামলার বাদী কে? অথবা সশরীরে উপস্থিত না থেকে কি করে মামলার বাদী হলেন ভাই আল আমিন? কারণ মামলা না হলে তো মীমের শারীরিক পরীক্ষা করানো এবং আদালতে জবানবন্দী গ্রহণ প্রক্রিয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না! ধরে নেয়া যাক, বাদী আল আমিন মামলা দায়েরের পর হয়তো বাড়ি গিয়েছিলেন। চারদিন পর সেখান থেকেই ঢাকার ফিরতি পথে ছিলেন তিনি। তাহলে মামলার বাদী ছাড়া সেদিন আদালতে নাবালিকা কিশোরী মীমের জবানবন্দী রেকর্ড করা হলো কিসের ভিত্তিতে? বাদীর অনুপস্থিতিতে মামলা আমলে নেয়ার কোনো এখতিয়ার কি আদলতের রয়েছে কিনা এক্ষেত্রে অবশ্য এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া সেদিনই মীমকে ঢামেক থেকে আদালতে নেয়ার পরে সেখানে কাজ শেষে তাকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন সে সময় মীমের সঙ্গে থাকা তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেই। তাহলে কি এই অবস্থায় হাসপাতালে মীমের সঙ্গে ছিলেন না তার মা? থাকলে তো তারও আদালতে মেয়ের সঙ্গে উপস্থিত থাকার কথা। মামলার বাদী এবং অভিভাবকের উপস্থিতি ছাড়া কি জবানবন্দী দিল ১২ বছরের নাবালিকা এই কিশোরী? সেটার গ্রহণযোগ্যতাই বা কতদূর? 

এদিকে এলাকার একাধিক সূত্র জোর দাবি তুলছে, অসহায় মীম পরিবারের সঙ্গে সমঝোতা করে মামলা তুলে নেয়ার ব্যাপারে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আর সেজন্য ব্যবহার করা হতে পারে তার ভাইকে। কারণ, গ্রাম থেকে এসে অপশক্তির চাপ সামলে লড়াই করে যাওয়ার মানসিক শক্তি হয়তো তাদের থাকবে না। সূত্রের দাবি, স্থানীয় থানার তৎপরতা থাকায় এবং মামলাটি আদালতে চলে যাওয়ায় প্রশাসনিক পর্যায়ে দুর্নীতির প্রচেষ্টা করবে না কোনো চক্র। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতির মাঝে বাদীপক্ষের অনুপস্থিতি এবং অতিরিক্ত নিরবতায় শংকিত এলাকার মানুষ। অনুমান কঠিন হয়ে যাচ্ছে আসলে কি হচ্ছে। এদিকে পরিস্থিতি কিছুটা অনুমান করা যায় অভিযুক্তের পরিবারের সাবলীল চালচলনে। যা অনেকাংশেই প্রমাণ করে আসামী তওহীদ নিরাপদ আশ্রয়েই রয়েছে এবং এ যাত্রায়ও তার কোনো বিপদের সম্ভাবনা নেই।

এক্ষেত্রে এই প্রশ্ন ও সংশ্লিষ্ট তথ্যগুলোই শেষ কথা বা এগুলোই প্রতিষ্ঠিত সত্য, এমনটা দাবি করার অবকাশ নেই। অনেক তথ্যই অজানা রয়েছে যা তদন্তের নিরাপত্তার খাতিরে প্রকাশ করবে না প্রশাসন। প্রাথমিক অনুসন্ধানকালে বিচ্ছিন্নভাবে প্রাপ্ত তথ্যগুলোর সমন্বয়ে সম্ভাব্য কিছুদিক যাচাইয়ের ক্ষেত্রেই বিষয়গুলো আলোচনায় আনা হয়েছে, যাতে করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন সেগুলো আমলে নিয়ে যথার্থ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত করতে পারেন। তাছাড়া অভিযুক্ত আসামীকে ধরতে বা তদন্তের খাতিরে এমন প্রশ্নগুলো থেকেও কোনো সূত্র হাতে আসতে পারে পুলিশের বিচক্ষনতায়। কারণ এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের একই লক্ষ্য, আর তা হলো, মামলার তদন্তে এবং হতভাগ্য মীমের বিচার প্রাপ্তিতে গতি সঞ্চার করা।

তুরাগের শিশু ধর্ষনের ঘটনায় গ্রেফতার মোস্তফা

এদিকে অপর একটি ঘটনা চলমান পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তুরাগের মানুষের মাঝে বাড়ছে ভীতি। প্রশ্ন তুলছে- সামাজিক-প্রশাসনিক সর্বক্ষেত্রে ধর্ষক তওহীদকে গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনার এই সরব প্রক্রিয়ার বিপরীতে প্রাপ্তি কি তুরাগবাসীর? চলমান ইস্যুতে এলাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে- প্রাপ্তি হচ্ছে, মীম ধর্ষনের রেশ না কাটতেই তুরাগের নলভোগ এলাকায় ৬ বছরের শিশু ধর্ষনের মত আরো একটি বিবেকবর্জিত বর্বর ঘটনা। এবারের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত ধর্ষক মোস্তফা- জামালপুরের সরিষাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। যে এ এলাকায় কসাইয়ের কাজ করতো। স্থানীয় সূত্রের তথ্য, ধর্ষক মোস্তফার হাতে আইনের হাতকড়া পড়েছে ধর্ষিত শিশুটির প্রতিবেশি এক স্থানীয় গৃহবধুর কৃতিত্বে। এই প্রতিবেশী নারীর তৎপরতায় স্থানীয় কয়েকজন মিলে সেই ধর্ষককে সুকৌশলে জব্দ করে পুলিশে হস্তান্তর করেছে। মীম ধর্ষন ঘটনার আলোকে বিবেচনা করলে প্রশ্ন আসে, সেই নারী না থাকলে কি তবে এই শিশুটির ধর্ষক মোস্তফাও কোনো অন্ধকারে গা ঢাকা দিতো? আর অপেক্ষা করতো পরিস্থিত শান্ত হয়ে এলে নিজের পরবর্তী শিকারের দিকে হাত বাড়ানোর?

মীমের পর ৬ বছরের শিশু ধর্ষনের ঘটনা স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের আবেগের কাছে মুখথুবড়ে পড়তে শুরু করেছে সংশ্লিষ্টদের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাস। এমন কি বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রচার না পাওয়াতেও অসন্তুষ্ট তারা।  স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দাবি, মূল ধারার গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকা পালনে সোনাগাজীর নুসরাত হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনার বিচার কাজ তরান্বিত করতে সরকার ও প্রশসানের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তৎপরতা চালানোর প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। কারণ গণমাধ্যমে আলোচিত বিষয়গুলোর গুরুত্ব অনুধাবন অনেক সময় প্রশাসনের জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রে। রাজধানীর বুকে থেকেও কেন সেই সহায়তা পাচ্ছে না তুরাগের মানুষ? একটি আলোচিত ঘটনার আসামী এখনও আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, থমকে আছে বিচার কাজ। যার ফলে এই অপরাধীরা সাহস পাচ্ছে নিজেদের লিপ্সার শিকার অব্যাহত রাখতে। তওহীদের অতীত ইতিহাস সে সত্যই প্রমাণ করছে।

নুসরাত ধর্ষন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের একাংশ 

ধর্ষনসহ যে কোনো নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তৎপরতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্রের প্রতি কঠোর নির্দেশনা রয়েছে বর্তমান সরকারের। যার একতি উদাহরণ হচ্ছে নুসরাত হত্যা মামলায় জড়িত এক নারী আসামী। বর্বর এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয় আর সেখানেই সন্তানপ্রসব করেন এই নারী। পরবর্তীতে বিচারের রায় ঘোষণাকালে শিশু সন্তানকে কোলে নিয়েই আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হন তিনি। কিন্তু আইনের সর্বোচ্চ দণ্ডে তাকে সাজা প্রদানে নুন্যতম দ্বিধা করেনি আদালত। এথেকেই সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, তওহীদ-মোস্তফার মত ধর্ষকদের বিচারে কতটা কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন ও আইন। 

তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। তা হলো, বিচার দাবিতে বাদীপক্ষের শক্ত অবস্থান এবং সামাজিকভাবে এ সকল অপরাধীদের প্রশ্রয় না দেয়া। শত বাধার মুখেও যেমন অবিচল ছিলেন নুসরাতের মা, রিফাতের বাবা। সেটা না হলে প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলেও বাধাগ্রস্ত হয় সাবলীল কার্যক্রম। যার এক পর্যায় অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে সমাজের স্থিতিশীলতাকে বিপর্যস্ত করে। সাধারণ মানুষের বিবেচনায় তখন সকল দোষের দোষী কেবলই সরকার, প্রশাসন আর রাষ্ট্রব্যবস্থা। অথচ পাপিষ্ঠ আর অন্ধকারে থাকা পাপের প্রতিপালকরা থেকে যায় নিরাপদ, ধরাছোঁয়ার বাইরে। অপরাধ নির্মূলে অপরাধী ও মদদ দাতাদের সমহারে আনতে হবে কঠোর বিচারের অধীনে। এই পুরো প্রক্রিয়াকে সফল করার ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিদান দিতে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে দুষ্টের দমনে নিবেদিত হতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্র। পাশাপাশি ঘটনার নির্জাসিত সত্য তুলে ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জাগরণ গড়ে তোলার ভূমিকাটি নিতে হবে 'জাতির বিবেক' খ্যাত গণমাধ্যমের সংবাদ সৈনিকদের।

আরও পড়ুন