• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৫, ২০১৯, ১২:০৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ২৫, ২০১৯, ০১:০২ পিএম

নিম্নমানের পেঁয়াজে সয়লাব, ঠকছে ক্রেতা

হালিম মোহাম্মদ
নিম্নমানের পেঁয়াজে সয়লাব, ঠকছে ক্রেতা
বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের পেঁয়াজ- ছবি : সংগৃহীত

বেশি লাভের আশায় পেঁয়াজ মজুদ রেখে বিপাকে পড়েছেন সিংহভাগ ব্যবসায়ীরা। পেঁয়াজ আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। অপরদিকে মজুদকৃত পেঁয়াজে পচন ধরায় তা ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন ডাস্টবিন অথবা নদীতে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভালো মানের পেঁয়াজ নেই। যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো নিম্নমানের, পচা-গলা। ভালো পেঁয়াজ না পাওয়ায় বেশি দাম দিয়ে এসব কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতা। তাতে করে  দামের সাথেও  পণ্যেও ঠকছেন।

পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থা। তারা পেঁয়াজ আমদানি ক্লিয়ারেন্স রেকর্ড দেখে সংশ্লিষ্ট ৪৬ প্রতিষ্ঠান ও ওই সকল প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করেছে। পেঁয়াজ আমদানি সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ওইসব ব্যবসায়ীদের তলব করছে কাস্টমস গোয়েন্দারা।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার মহাপরিচালক সহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের পর্যায়ক্রমে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করবো। পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে কীভাবে আনা হয়েছে, তাছাড়া মূল্য পরিশোধ ও ক্লিয়ারেন্সের ক্ষেত্রে আমাদের দফতরের জমা দেয়া সকল দলিলাদি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ রকম প্রায় ৪৬টি ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। মূলত পেঁয়াজ কারসাজির বিষয়ে এ সকল ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হচ্ছে। প্রথম দফায় ১৩ জন ব্যবসায়ীকে ডাকা হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান (এনবিআর) মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দৈনিক জাগরণকে বলেছেন, পেঁয়াজসহ যেসব পণ্য আমদানি হয়েছে, সেগুলোর তথ্য সংগ্রহ চলছে। কোন পণ্য কতটুকু আমদানি হয়েছে সেটা কখন, কীভাবে বিক্রি হয়েছে, সেই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তপূর্বক জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
 
ক্রেতাদের অভিযোগ, পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া হলেও ভালো মানের পেঁয়াজ বাজার নেই। ভেজা পেঁয়াজ মজুদ করায় দ্রুত পেঁয়াজে পচন ধরছে। একদিকে পেঁয়াজে পচন ধরা অন্যদিকে বেশি মুনাফার আশায় পেঁয়াজ মজুদ রাখার তথ্য ফাঁস হলে জেল নিশ্চিত- এই দুই বিষয় নিয়ে উভয় সংকটে সিংহভাগ পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা।

এর আগে রাজধানীর একাধিক পাইকারি বাজার ও চট্টগ্রামের নতুন চাকতাই এলাকায় মজুদ রাখা পেঁয়াজে পচন ধরে। পরে সেই পচা পেঁয়াজ রাতে অন্ধকারে রাজধানীর একাধিক এলাকার ডাস্টবিন এবং চট্টগ্রামের চাকতাই শহরের পাশে নদীতে ফেলে পালিয়ে যায় অসাধু ব্যবসায়ীরা।

শুধু তাই নয়, পেঁয়াজ কিনে বাজারে সরবরাহ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন পাইকাররাও। কারণ প্রচুর পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে এমন খবরে ক্রেতারা কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

জানা গেছে, পাইকারি বাজার এখন প্রায় পেঁয়াজ শূন্য হয়ে পড়ে। এক সপ্তাহ আগে, পেঁয়াজ এনে বেপারিরা লোকসানে পড়েন। অবশ্য কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ এনে সেই লোকসানের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করেন।

শ্যামবাজারের আড়তদারদের বক্তব্য, বাজারে ভালো মানের পেঁয়াজ নেই বললে চলে। তারা দেশি নিম্নমানের পুরান পেঁয়াজ ২১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। নতুন দেশি পেঁয়াজ (মুড়িকাটা) পাইকারি বিক্রি করেছেন ১৪০ টাকা কেজি দরে। খুচরা বাজারে এই নতুন পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা দরে।

আড়তদাররা জানান, বেপারিরা পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ আনছেন না। এর আগে, তারা আমদানি করা পেঁয়াজ দেশের অন্যান্য স্থান থেকে ২১০ টাকা কেজিতে এনে লোকসানে ১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন। বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ পেঁয়াজ আসার খবরে দাম কমে যায়। তখন তাদের লোকসান হয়েছে। আবারও আমদানি করা পেঁয়াজ এনে লোকসান গুণতে চান না বেপারিরা। বেশি দামে বিক্রি করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানাও গুনতে চান না তারা। ফলে তারা বহুমুখী সংকটে রয়েছেন তারা।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মশিউর রহমান দৈনিক জাগরণকে জানান, প্রশাসন বাজার মনিটরিং করছে। কিন্তু তারা মূল্য বেশির কারণে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের কঠোরভাবে জরিমানা করেননি। বেশি দামে কিনলে তারা তো লোকসান দেবেন না। লাভ রেখেই পেঁয়াজ বিক্রি করবেন।

তিনি আরও বলেন, পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সরকার পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক।

রোববার (২৪ নভেম্বর) মতিঝিলে এফবিসিসিআই সম্মেলন কক্ষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ সময় তিনি বলেন, পেঁয়াজের দাম এরই মধ্যে কমে গেছে এবং খুব তাড়াতাড়ি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। 

তিনি বলেন, যেদিন ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়, তার পরদিনই পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু যে পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে ছিল, তা দিয়ে ব্যবসায়ীরা আগের দামেই আরও কয়েকদিন বিক্রি করতে পারতেন। যদি তা করতেন, তাহলে বুঝতাম তারা নীতি-নৈতিকতা সঙ্গে ব্যবসা করছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, মিসর ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আনা হচ্ছে বিমানে করে। পাশের দেশ মিয়ানমার থেকেও পেঁয়াজ আনা হচ্ছে। জাহাজে করে আনা পেঁয়াজও শিগগিরই চলে আসবে। পাশাপাশি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করবে। আর তখনই পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হবে। 

আমদানিকারকদের জিজ্ঞাসাবাদ

কারসাজি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগে পেঁয়াজ আমদানিকারকদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এরই মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও হিলির ১৩ জন পেঁয়াজ আমদানিকারকের ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। সোম ও মঙ্গলবার- সবমিলিয়ে ৪৭ জন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলবেন গোয়েন্দারা।

বেশি মুনাফার অভিযোগে মোট ৩৪১ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। তারাও নজরদারিতে আছে। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।

গেলো আগস্ট থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে এক লাখ ৬৭ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এতে খরচ হয় ৬৬০ কোটি টাকা। প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব আমদানিকারক এক হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ এনেছে তাদেরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৩০-২৪০ টাকা দরে। চীন ও মিসরের পেঁয়াজের কেজি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা।

এইচএম/একেএস

আরও পড়ুন