• ঢাকা
  • সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০, ১২:২৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০, ১২:৩৬ পিএম

উপ সচিবের হঠকারী সিদ্ধান্তে বিপাকে ১৬ প্রতিষ্ঠান

জামাল উদ্দিন বাবলু, লক্ষ্মীপুর সংবাদদাতা 
উপ সচিবের হঠকারী সিদ্ধান্তে বিপাকে ১৬ প্রতিষ্ঠান
প্রতীকী ছবি

এক উপ-সচিবের হঠকারী সিদ্ধান্তে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসতে যাচ্ছেন ১৬টি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, ওই উপ-সচিবের কারণে নতুন করে আর কোনও পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশন স্থাপন না করার জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন(বিপিসি)-কে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।  এই নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বিপাকে মধ্যে রয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৬টি প্রতিষ্ঠান। এ খাতে নেয়া ‘ব্যাংক ঋণ’ এখন তাকে কাছে বোঝায় পরিণত হয়েছে। দ্রুত অনুমোদন না মিললে গলার কাঁটায় পরিণত হবে পাম্প-ফিলিং স্টেশন স্থাপনের জমি ও সরঞ্জামাদি। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেছে। 

অভিযোগ রয়েছে, পাম্প মালিকদের একটি সিন্ডিকেট তাদের ভেজাল তেল বিক্রি অব্যাহত রাখতে জ্বালানি বিভাগের একটি চক্রকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে আসছে। তাদের এই আধিপত্য ধরে রাখা ছাড়াও নতুন পাম্পের অনুমোদন না দিতেও মাসোহারা দিচ্ছে ওই সিন্ডিকেট। আর এর ভাগ চলে যাচ্ছে জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির বড় বড় কর্মকর্তারাও পকেটে। সে কারণেই কূট-কৌশলে নতুন ও আধুনিক পাম্প স্টেশন স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু ১৬টি প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় করা ৫০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন মালিকরা। 

সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ২৪ জুন (সোমবার) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক উপ-সচিব নতুন পাম্প ও ফিলিং স্টেশন স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ নিয়ে বিপিসিকে চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়।

চিঠিতে বলা হয়, চলমান ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভেজাল রোধ, সঠিক পরিমাপে তেল সরবরাহের জন্য বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কর্তৃক সঠিকভাবে তদারকি প্রয়োজন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও কার্যকরভাবে তেলে ভেজাল রোধ করা সম্ভব নয়। নতুন করে ফিলিং স্টেশন গড়ে উঠলে এটি আরও দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। ভেজাল রোধ ও সঠিক পরিমাপে জ্বালানি সরবরাহে কার্যকরী ব্যবস্থা গড়ে তোলা না পর্যন্ত নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপন আপাতত বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রেক্ষিতে নতুন স্টেশন স্থাপনের অনুমতি প্রদান করা যেতে পারে।’ 

যমুনা অয়েল কোম্পানি সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশন স্থাপনের জন্য তাদের কাছে ৫’শর বেশি আবেদন জমা পড়েছে। গত বছর কোম্পানির ৪৫৬ তম বোর্ড সভায় যাচাই-বাছাই করে তারা ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন করা দেয়া হয়। অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ভোলার নূরনবী সিকদার ফিলিং স্টেশন, রাজশাহীর তামান্না ফিলিং স্টেশন, পাবনার নর্থ বেঙ্গল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অপু ফিলিং অ্যান্ড এলপিজি, ফরিদপুরের আশিক ফিলিং স্টেশন, চাঁদপুরের শারমিন ফিলিং স্টেশন, ঝালকাঠির ফরিদা ফিলিং স্টেশন, চট্টগ্রামের বিএম আটোগ্যাস, নোয়াখালীর হাতিয়াবাজার ফিলিং স্টেশন, নীলফামারীর শিরিন ফিলিং স্টেশন, সীতাকুণ্ডের ডিএবি ফিলিং স্টেশন, ময়মনসিংহের এমএ খালেক ফিলিং স্টেশন, খুলনার শেখ শওকত আলী ফিলিং স্টেশন, লক্ষ্মীপুর এলপিজি অটো স্টেশন, ভোলার মেসার্স এন মোহাম্মদ ফিলিং স্টেশন ও ঢাকার মেসার্স কাশফি ফিলিং স্টেশন।

লক্ষ্মীপুর এলপিজি অটো স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুট ঢাকা-চট্টগ্রাম-বরিশালসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সহজ যোগাযোগ মাধ্যম। এই রুটে বালু বিক্রির জমজমাট ব্যবসাও রয়েছে। হাজার হাজার যানবাহন এই রুটে চলাচল করে। সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর-ভোলা সড়কটি সম্প্রসারিত করার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের আশেপাশে কোনও পেট্টোল পাম্প বা ফিলিং স্টেশন নেই। এ মুহূর্তে লক্ষ্মীপুর এলপিজি অটো স্টেশনটিতে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিপণন অনুমোদন জরুরি হয়ে পড়েছে। 

জানা গেছে, প্রতিবছর পেট্রোল বিক্রি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বাড়ে। একইভাবে অকটেন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ, ডিজেল ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, লুবঅয়েল ৫ থেকে ১০ শতাংশ বিক্রি বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে অকটেন বিক্রি হয়েছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৫৭ টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিক্রি বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩০ টন। একইভাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পেট্রোল বিক্রি হয়েছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ২২৪ টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সেটি বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৩৫৯ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডিজেল বিক্রি হয়েছিল ৩৫ লাখ ৭৩ হাজার ২৩২ টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সেটি বেড়ে হয়েছে ৩৯ লাখ ৪২ হাজার ৭০৯ টন। কিন্তু এই দুই অর্থবছরে মেঘনা, যমুনা ও পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে একটি নতুন পাম্প ও ফিলিং স্টেশন যোগ হয়নি। উল্টো কমেছে।

বিপিসি সূত্র জানায়, দেশব্যাপী শত শত কিলোমিটার বাইপাস সড়ক নির্মিত হয়েছে। এগুলোর কোথাও পাম্প ও ফিলিং স্টেশন নেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের মধ্যখানে উঁচু সড়ক ডিভাইডার করে দেয়ায় এক পাশের চলমান যানবাহন বিপরীত পাশে অবস্থিত ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিতে পারছে না।

বেশিরভাগ হাইওয়ের মধ্যখানে ডিভাইডার হয়ে যাওয়ায় পাম্প স্টেশনের দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এক পাশের তেলবাহী গাড়ি অন্যপাশে যেতে পারছে না। বিদ্যমান পাম্পগুলোর অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল কোম্পানিগুলো জ্বালানি তেল বিক্রিতে বড় ধরনের বিপাকে পড়েছে বলে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

গেলো বছর যমুনা অয়েল কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সভায় সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে ১৬টি নতুন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনও সেগুলো স্থাপনে কোনও ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বিপিসি। একইভাবে পদ্মা ও মেঘনা অয়েল কোম্পানিও মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে ফিলিং স্টেশন স্থাপন করতে পারছে না। অথচ তেলের চাহিদার কারণে সারা দেশে এরই মধ্যে হাজার হাজার অবৈধ জ্বালানি তেলের দোকান গড়ে উঠেছে। চিঠির মাধ্যমে বিপিসিকে যমুন অয়েল কোম্পানি তাদের অসহায়ত্বের কথাও জানিয়েছে।

বিপিসিকে এক চিঠিতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড জানায়, সারাদেশে তাদের ৭৬৩টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি ছাড়া সবই ব্যক্তিমালিকানাধীন। সম্ভাবনা না থাকায় অনেক ডিলার স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে। এই অবস্থায় দ্রুত পাম্প স্টেশন স্থাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে তেল বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

গত বছরের ১ আগস্ট ফিলিং স্টেশন স্থাপন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে পাবনার নর্থ বেঙ্গল ফিলিং ষ্টেশন ও লক্ষ্মীপুর এলপিজি অটো স্টেশনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট রিট পিটি দায়ের করেন আইনজীবি কামাল হোসেন।

দৈনিক জাগরণকে কামাল হোসেন জানান, গত ২ বছর যাবৎ কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার অয়েল কোম্পানির বিভাগীয় পর্যায়ের যাবতীয় অনাপত্তি নিয়ে, যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের চাহিদা মোতাবেক পাম্প স্থাপনের জন্য জমিসহ সকল সরঞ্জমাদি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রয় করেছে। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ ছাড়পত্রসহ ১০-১২টি ছাড়পত্র, সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ শেষ করেন। কোম্পানির ৪৫৬তম বোর্ড সভায় পাম্প অনুমোদনও হয়। শুধু বিপিসির চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি। 

ওই আইনজীবি জানান, গেজেট অনুসারে পেট্রোল পাম্প অনুমোদন অথবা বন্ধ করতে পারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন(বিপিসি), কিন্তু রাষ্ট্রপতি সই করা গেজেট অগ্রাহ্য করে একজন উপ সচিব কি উদ্দেশ্যে দেশের স্বার্থ বিরোধী উন্নয়ন বিরোধী স্থগিতাদেশ দেন, তা বোধগম্য নয়। নতুন পেট্রোল পাম্প অনুমোদন সংশোধিত নীতিমালা-২০১৪ অনুসারে মন্ত্রণালয় নতুন পেট্রোল পাম্পগুলোকে ডিজিটাল স্কেল ও সফটওয়্যার ভিত্তিক পেট্রোল পাম্প তৈরির শর্তে অনুমোদন দেয়ার পরামর্শ দিতে পারতেন।

কামাল আরও জানান, নতুন পেট্রোল পাম্প বন্ধ করার অর্থ হলো পুরানোদের আরও দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া, যা ‘উদোর পিণ্ডি বুধো ঘাঁড়ে’র সামিল।  

এসএমএম