• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০১৯, ০৯:০৩ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ৮, ২০১৯, ০৯:০৩ এএম

জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি দল

ভাস্কর সেনগুপ্ত, কলকাতা
জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি দল
জ্যোতি বসু

বারবার তিনবার। ১৯৯০, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬। এক বঙ্গ সন্তানের কাছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু দল তাকে হতে দেয়নি। সেই বঙ্গ সন্তান এখন বেঁচে থাকলে বয়স হত ১০৫ বছর।

জ্যোতি বসু। আজ, সোমবার তার জন্মদিন। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর ৯৬ বছরের জীবনে রাজনীতির ভরকেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ। অথচ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসবাসকারী ভারতীয় তাঁকে চেনেন এক ডাকে। চেনেন কারণ, একটানা সাড়ে ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রিত্বের রেকর্ড, আঞ্চলিক স্তরে রাজনীতি করেও দেশের সংসদীয় রাজনীতির ময়দানে নিজেকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাওয়া, সর্বোপরি প্রকৃত রাজনৈতিক স্টেটসম্যান হওয়া— ভারতীয় রাজনীতিতে হাতে গোনাদের একজন।

কলকাতায় জন্মালেও তাঁর আদি বাড়ি ছিল ঢাকার বারদিতে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশুনা শেষ করে বিলেত যান ব্যারিস্টারি পড়তে। সেখানেই কমিউনিস্ট পার্টিতে হাতে খড়ি। ১৯৪০-এ দেশে ফিরে ব্রিফকেস হাতে নিতে আদালতে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু হলেন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। তাঁর বাগ্মিতা, ব্যক্তিত্ব- এমনই ছিল যে স্বাধীনতার আগে, ১৯৪৬ সালেই ভোট জিতে বিধানসভায় যান তিনি। ১৯৪৬-২০০১, এর মধ্যে ’৭২-’৭৭ বাদ দিলে ৫০ বছর রাজ্য বিধানসভায় তিনিই ছিলেন মুখ্য চরিত্র। বিধানচন্দ্র রায় থেকে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়— বিরোধী হয়েও জ্যোতি বসুতে মুগ্ধ, মোহিত ছিলেন।

বর্তমান দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার সময় তিনি আজও প্রাসঙ্গিক। ইতিহাস বলছে, ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙলো কর সেবকরা। তারপরে কলকাতার একটি অংশে দাঙ্গা হলেও তা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি জ্যোতি বসুর নেতৃত্বের জন্য। প্রয়াত অটলবিহারী বাজপেয়িকে তিনিই বলতে পেরেছেন, বিজেপি একটা অসভ্য, বর্বরের দল।
   
এমন এক কিংবদন্তিকে কেন তাঁর দল প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি, জ্যোতি বসুর মৃত্যুর এত বছর পরেও সেই প্রশ্ন খোঁচা দেয় বঙ্গবাসীকে। ভারতীয় রাজনীতিতে জ্যোতি বসুর মতো ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব বিরোধীরা বুঝতে পারলেও কেন তাঁর দল বুঝতে পারল না, এত বছর পরে সেই প্রশ্ন উঠেছে তাঁর দলের মধ্যেই। বিশেষত সিপিএম যখন জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে সরে এসেছে বহুকাল আগেই। দলের একাংশের ব্যাখ্যা, জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হলে গোটা দেশে সিপিএমের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেত। পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও ত্রিপুরার বাইরে, বিশেষত হিন্দি বলয়ের কয়েকটি রাজ্যে সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরী হত। কিন্তু সেই সুযোগ বিবেচনা না করে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দল। যার পরিণতিতে এখন প্রায় দুরবিন দিয়ে সিপিএমকে খুঁজতে হচ্ছে।

সময়টা ১৯৯০। গত দেশে অস্থির অবস্থা। এমন এক সময়ে জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আহ্বান জানান প্রয়াত রাজীব গান্ধী। পরের বছর একই অনুরোধ আসে সেই রাজীবের থেকেও। এবারেও ‘না’ বলে দেয় দল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইয়ের প্রাক্তন প্রধান, কেন্দ্রের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাক্তন বিশেষ সচিব অরুণ প্রসাদ মুখার্জির আত্মজীবনীতে এই তথ্য মিলেছে। পরে প্রয়াত সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এই ঘটনার কথা স্বীকার করেন। শেষের অনুরোধটা ছিল ১৯৯৬ সালে। কেন্দ্রে তখন বাজপেয়ীর ১৩ দিনের সরকার পড়ে গেছে। বিরোধী ইউনাইটেড ফ্রন্ট জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আর্জি জানান। কংগ্রেস সমর্থন করে। এবারেও ‘না’ বলে দেয় দল। রাজনীতিতে বরাবর ভদ্রলোক বলে পরিচিত জ্যোতি বসু সেই একবারই দলের শৃঙ্খলা ভেঙে বলেছিলেন, এটা ঐতিহাসিক ভুল। 

কোনো বাঙালির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন যেন ওখানেই শেষ হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের আর এক বঙ্গ সন্তান, প্রণব মুখোপাধ্যায় বরাবর দিল্লিতে রাজনীতি করেছেন। একসময় সরকারের দ্বিতীয় ছিলেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময় চর্চা হয়েছে। বাঙালির একটা অংশ এমন স্বপ্নও দেখতেন। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি, হয়েছেন রাষ্ট্রপতি।

সদ্য পেরিয়ে যাওয়া লোকসভা ভোটের ফল ঘোষণার আগেও এমন একটা প্রচার ভোটের ময়দানে ঘোরাফেরা করেছে। অঙ্কটা ছিল এইরকম- বিজেপি হারবে, ক্ষমতায় আসবে বিরোধী জোট। কংগ্রেস একা বেশি আসন পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তৃণমূলের মত আঞ্চলিক দোল বেশি আসন পাবে। এই অঙ্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হবেন, এমন একটা প্রচার ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল তৃণমূলের তরফে। কিন্তু সাত মন তেলও পোড়েনি, রাধাও নাচেনি।

জন্মদিনে আজ জ্যোতি বসুকে নিয়ে চর্চা হবে, ফটোতে ফুল, মালা দেয়া হবে, বক্তৃতা হবে, আরও কত কিছু... কিন্তু বাঙালি কি সিপিএমকে ক্ষমা করতে পারবে, প্রশ্নটা থেকেই গেছে।

এফসি 
 

Islami Bank
ASUS GLOBAL BRAND