• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯, ০২:১৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯, ০২:১৬ পিএম

৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মুহূর্তে কোন পথে বিএনপি

তারেক সালমান
৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মুহূর্তে কোন পথে বিএনপি

প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ৪১ বছর পার করছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিকূল পরিবেশ পেরিয়ে এলেও বর্তমান সময়টাকেই চরম কঠিন মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। জন্মের পর বেশ কয়েকবার দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিএনপি একটানা প্রায় ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে। রাজনীতিতেও কার্যত কোণঠাসা। এছাড়া চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় একযুগ লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন। লাখ লাখ নেতাকর্মী হামলা-মামলায় জর্জরিত অবস্থায়। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক হতাশা। দলের জন্মদিনে তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- কোন পথে যাচ্ছে বিএনপি? 

বিএনপি সঠিক পথেই আছে দাবি করে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৈনিক জাগরণকে বলেন, এই সরকার দেশের সকল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তছনছ করে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক সকল ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে একদলীয় শাসন অঘোষিত বাকশাল প্রতিষ্ঠার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে। তিনি বলেন, আজকে আমাদের নেত্রী কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাসনে। এ ধরনের একটি জটিল, সংকটময় মুহূর্তের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে আমরা আমাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এ সংকটময় মুহূর্তে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। নিঃসন্দেহে আমরা সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় সেই কাজটিই করছি। 

তিনি বলেন, বিএনপির এখন একমাত্র লক্ষ্য নির্বাসিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও খালেদা জিয়ার মুক্তি। আগামীতে এই আন্দোলন আরও বেগবান হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, বিএনপিকে শহীদ জিয়াউর রহমানের কাছে ফিরে যেতে হবে। তার আদর্শ ও সততার কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি বলেন, আজকে অনেকেই অন্য রকম কথা বলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের অসম্ভব সততার কথা সবাই বলেন। উনি যখন বঙ্গভবনে থাকতেন, তখন সেখানে তার ভাইদের, আত্মীয়-স্বজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। উনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন আমরা তার ভাইদের কথা জানতাম না। 

ড. আসিফ আরও বলেন, খালেদা জিয়ার কথাও আমাদের বলতে হবে। তিনি অনেক নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাকে অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। তাকে সবাই আপসহীন নেত্রী বলেন। মানে তিনি আপস করেন না। তাকে তার কথা থেকে একচুলও নড়ানো যায় না। কিন্তু দেশের প্রয়োজনে, দেশের গণতন্ত্রের প্রয়োজনে তিনি কিন্তু আপস করেছেন। বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতো না। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন, দেশের প্রয়োজনে মানুষ সংসদীয় গণতন্ত্র চেয়েছে, কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়েছে, তখন কিন্তু তিনি তা মেনে নিয়েছেন। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, তখন কিন্তু তিনি চরম ত্যাগ তিতিক্ষার পরও তা মেনে নেননি। এসব বিবেচনায় নিয়ে বিএনপিকে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শের দিকে ফেরাতে হবে। তাহলেই বিএনপি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। 

দেশের ক্ষমতার ইতিহাসে অনেক বছর পার করলেও টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে থাকায় বর্তমানে দলটি পড়েছে নাজুক অবস্থায়।  গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি দলটি ও দলের নেতাকর্মীদের আরও হতাশার মধ্যে ফেলে দেয়। সেই হতাশা থেকে বর্তমানে বের হওয়ার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, হতাশার কিছু নেই। শহীদ জিয়াউর রহমান যে রাজনীতি এখানে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের যে রাজনীতি, মানুষের যে রাজনীতি, গণমানুষের যে রাজনীতি এবং যে রাজনীতির পতাকা বেগম খালেদা জিয়া তুলে নিয়ে বেড়িয়েছেন দীর্ঘকাল এবং তিনি কারাগারে রয়েছেন এই রাজনীতির জন্যে। সেই রাজনীতি হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। আমরা আমাদের এই রাজনীতিকে যদি সঠিক পথে নিতে পারি, যদি নিয়ে যেতে সক্ষম হই, আমরা যদি আরও বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টি করতে পারি, সব দেশপ্রেমিক দলগুলোকে যদি এক করতে পারি তাহলে অবশ্যই বিজয় আমাদের আসবেই আসবে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের একজন অন্যতম মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়া রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সখ্য ভাল ফল দিতে পারেনি দলটিকে। জামায়াত সখ্য দলটিকে প্রাপ্তির চেয়ে বরং বিসর্জনই বেশি দিতে হয়েছে। শুভাকাঙ্ক্ষীদের অভিমত, বিএনপির উচিত সবার আগে জামায়াত ঘনিষ্ঠতাকে ত্যাগ করা।

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও গণস্বাস্থ্যর প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দৈনিক জাগরণকে বলেন, বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি শেষ হয়ে যাবে, না শক্তিশালী হয়ে জীবিত থাকবে। যেহেতু তাদের দুই নেতার একজন জেলে আর একজন দেশের বাইরে। তাদের এখন জিয়াউর রহমানের কাছে ফিরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের যে সাহসের চিত্র ছিল সেটা মনে রাখতে হবে। 

তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে জামায়াতকে বের করে দেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিএনপিকে জামায়াত-সঙ্গ ত্যাগ করতেই হবে। স্বাধীনতা প্রশ্নে জামায়াত ক্ষমা না চাইলে তাদের সঙ্গে রাখার কোনো দরকার নেই বিএনপির। জামায়াতকে বাদ দিয়ে তাদের জোট আর ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে সত্যিকারের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। জামায়াতকে বের করে দিলে বিএনপির মাঠে নামার চাপ বাড়বে. তাই দলটি জামায়াতকে ছাড়ছে না বলে নানা অজুহাত দিয়ে দিয়ে বেড়াচ্ছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এ সংগঠক। এছাড়া জামায়াত না ছাড়ার আর কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির শরিক দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, দল পরিচালনায় একক কর্তৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি একাধিক প্রতিবেশী দেশসহ পশ্চিমা ও ইউরোপের বন্ধুদের পরামর্শ নিচ্ছেন।

সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মানুষের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি করবে সেরকম কোনো আবহ তৈরি করতে পারেনি বিএনপি। বিএনপির নেতৃত্বের যে সংকট, তাদের নেতৃত্বের ওপর মানুষের যে আস্থা সৃষ্টি হওয়া দরকার, সেটা তারা অর্জন করতে পারেনি।

সুশীল সমাজের অন্যতম এই প্রতিনিধি বলেন, বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি দেশের রাজনীতিতে তার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। আমাদের দেশের নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, বাড়াবাড়ি আছে, দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তা সত্ত্বেও তারা যে বিকল্প, বিএনপি তা প্রমাণ করতে পারেনি।

টিএস/ এফসি

আরও পড়ুন