• ঢাকা
  • সোমবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০১৯, ০৩:৪৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৩, ২০১৯, ০৮:৪৬ পিএম

ওড়াকান্দির মহাবারুনীর  মেলা 

দীপংকর গৌতম
ওড়াকান্দির মহাবারুনীর  মেলা 

বাংলাদেশের মফস্বল অঞ্চলে বেশ আগে থেকেই চোখে পড়তো নমশুদ্র সম্প্রদায়ের নারী পুরুষ সমন্বয়ে অনেক বড় দল । লাল নিশান হাতে জয়ঢাক ঢোল কাশি  বাজাতে বাজাতে খর রৌদ্রের ভেতর দিয়ে ‘হরিবোল’ ধ্বনি দিতে দিতে ছুটে চলতো তারা বারুনীর মেলার উদ্দেশে। পথে ওড়াকান্দি ভক্তদের বাড়িতে ডাকলে তারা উঠে বিশ্রাম নিতো আবার ছুটতো। রাতে অন্য কোন ভক্তের বাড়িতে তাদের আমন্ত্রন জানালে রাত্রি যাপন করতো। গান বাদ্য, হরিনাম সংকীর্তন চলতো, চলতো খাওয়া দাওয়া। আবার ভোরে খালি পায়ে হেঁটে চলতে যাত্রা। এখন পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির কারনে পথ পরিক্রমায় ভিন্নতা আসলেও বিশ্বাস তেমনি রয়ে গেছে। এই বিশ্বাসী মানুষেরাই  ‘মতুয়া’ মতাদর্শের লোক। মতুয়া সম্প্রদায়ের মূল সাধুপুরুষ হরিচাঁদ ঠাকুর। তার মূল কথা ছিলো, হাতে ধরো কাম(কাজ), মুখে হরিনাম।

মূলত হিন্দু ধর্মের অনুসারি হলেও ব্রাক্ষন্যবাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হরিচাঁদ ঠাকুর নমশুদ্র সম্প্রদায়কে নতুন পথ দেখাতে ‘মতুয়া’ আন্দোলনের জন্ম দেন। নমশুদ্র সম্প্রদায়কে আগে চণ্ডাল বলে ডাকা হতো। এসব বিষয়কে বদলাতে তিনি নমশুদ্র সম্প্রদায়কে শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেন। এজন্য তিনি স্কুল গড়তে শুরু করেন। মতূয়াভক্তদের মতে- ২শ’ ৭ বছর আগে ১২১৮ সালের  মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে ব্রহ্মমুহূর্তে মহাবারুণীর দিনে কাশিয়ানী উপজেলার সাফলীডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পূর্ণব্রহ্মা হরিচাঁদ ঠাকুর। পিতা যশোবন্ত ঠাকুরের পাঁচ পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাল্যনাম হরি হলেও ভক্তরা হরিচাঁদ নামেই তাকে ডাকতেন। ছোটবেলা থেকেই তার অলৌকিকত্ব ও লীলার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে পার্শবর্তী গ্রাম ওড়াকান্দি। ক্রমেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ওড়াকান্দির নাম এবং সারা দেশের হিন্দু-সম্প্রদায়ের কাছে এটি পরিণত হয় তীর্থস্থানে। ৬৬ বছর বয়সে ১২৮৪ বঙ্গাব্দে জন্ম দিবসের একই তিথিতেই তিনি দেহত্যাগ  করেন।
সাধক পুরুষ শ্রী হরিচাদ ঠাকুর মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন।আর্য হিন্দুদের শোষনের বিরুদ্ধে তিনি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্ঘবদ্ধ করে ধর্মপালনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।তিনি সংসার বিবাগী নয়, সংসারী সেজেই ঈশ্বর প্রেমের বানী প্রচার করেছেন,তার বাবা যশমন্ত বৈরাগী মৈথালী ব্রাহ্মন ছিলেন।


হরিচাদ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র গুরুচাদ ঠাকুরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল মাদ্রাসায়।পিতার মৃত্যুর পরে তাকেই মতুয়া আন্দোলনের হাল ধরতে হয়।বর্ণহিন্দুদের সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে১৮৮০সালে ওড়াকান্দিতে তিনি প্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।অস্পৃর্শতা দুর করে শিক্ষাকে গণআন্দোলনে রূপদিতে ৯০বছরের জীবনে ১৮৮২টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।যা বাংলাদেশর এই অঞ্চলকে(যশোহর,খুলনা,ফরিদপুর) শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে। সেই সাথে চন্ডাল জাতিকে নমশূদ্র জাতিতে উত্তরনের নেতৃত্ব দেন তিনি।তার চেষ্টায় ১৯০৭সালে বাংলা-আসামের গভর্নর জেনারেলের কাছে প্রতিবেদন পেশ করা হয় এবং ১৯১১সাল চন্ডাল গালি মোচন ও নমশূদ্র সম্প্রদায় হিসাবে তারা চিহ্নিত হয়।তেভাগা আন্দোলনে তার অসামান্য অবদান রয়েছে।আধ্যাত্মিকর পাশাপাশি রাজনৈতিক,সামাজিক,শিক্ষার আন্দোলনের ভূমিকা তাকে অবিস্মরনীয় করে রেখেছে।কথিত আছে তার দর্শন পেতে এলে তিনি তাকে আগে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে আসতে বলতেন।তাকে দলিতদের বিদ্যাসাগর বলা হতো। শিক্ষা -দীক্ষায়  নমশুদ্র শ্রেনীর বর্তমান অবস্থান থারই আন্দোলনের ফসল। তার এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সমাজের একটি স্তরকে বদলে দিয়েছে।  সে বিবেচনায় এটি শুধু মেলা বা স্নানোৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটির সঙ্গে একটি দার্শনিক যোগও রয়েছে। যার সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি নমশুদ্র পরিবার।
   
 শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ২০৯-তম জন্ম তিথি উপলক্ষ্যে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দিতে মঙ্গলবার সকালে শুরু হয়েছে মহাবারুনী স্নানোৎসব ও তিন দিনের মেলা। মেলা তিন দিওনর হলেও সাত দিনেও এ মেলা শেষ হয় না। ঠাকুর বাড়িতেও রান্না শেষ হতে হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়।

গোপালগঞ্জ জেলাশহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে শ্রীধাম ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়ি। হরিচাঁদ ঠাকুরের উত্তরসূরী ও স্নানোৎসব কমিটির সভাপতি হিমাংশুপতি ঠাকুর স্নানোৎসবের উদ্ভোধন করেন। সঙ্গে ছিলেন শচিপতি ঠাকুর, অমিতাভ ঠাকুর, সুব্রত ঠাকুর ও সুপতি ঠাকুর শিবুসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ। বুধবার সকাল ১১টা ৩৫মিনিট পর্যন্ত চলবে স্নান উৎসব। পাপ মোচনে লাখ লাখ মতূয়াভক্ত ও হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের ভক্তরা এখানে স্নান করবেন। ঠাকুরবাড়ির দু’টি দীঘিতে চলছে এই পূণ্যস্নান।

এ স্নানোৎসব উপলক্ষে বসে মহাবারুনী মেলা। এ মেলা শেষ হবে আজ । আজ শেষ হবে মানে আজ নয়। এর রেশ থাকবে বহুদিন।

স্নানোৎসব চলাকালে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং স্নানোৎসব ও মেলা উদযাপন কমিটি। ঠাকুর বাড়ি এলাকায় উচ্চ পর্যবেক্ষণ চৌকি ও সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যের পাশাপাশি মতুয়া সংঘের ৩ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক সার্বিক দায়িত্ব পালন করছেন।


প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের এই দিনে ওড়াকান্দির মহাবারুনী মেলায় হরি মন্দিরের সামনে পুণ্যার্থীদের ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে ৪ নারীসহ ৭ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মতুয়া ভক্ত আহত হয়েছিলেন। সেই থেকেখুব সাবধানতা অবলম্বন করা হয়।