• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০১৯, ০৭:১৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৩, ২০১৯, ০৮:৪৫ পিএম

হাজংদের বৈশাখি আয়োজন ‘চোরা মেলা’

দীপংকর গৌতম
হাজংদের বৈশাখি আয়োজন ‘চোরা মেলা’
হাজং ও চাকমাদের যৌথ পরিবেশনা- ছবি: সংগ্রহ

হাজং সম্প্রদায়ের বাস সুসং-দুর্গাপুর এলাকায়। শিলং পাহাড়ের পাদদেশে কংস ও সোমেশ্বরী নদী সাপের মতো পেচিয়ে রেখেছে সুসং দুর্গাপুরকে। নেত্রকোনার এ উপজেলা পুরোপুরি পাহাড় ঘেরা পরিবেশ। সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজং আদিবাসীদের উৎসবগুলোও অন্যান্য আদিবাসীদের মতোই ফসল কেন্দ্রিক। ফসল উঠলে হাজং সম্প্রদায় মেতে ওঠে উৎসবে- পার্বনে।  চৈত্রসংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখে তারাও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো মেতে ওঠে বৈশাখী উৎসবে।
 
 এ এলাকায় হাজং সম্প্রদায় ও গারোরা গা ঘেঁষে বসত করা দু’টি সম্প্রদায়ের অনেক উৎসবই প্রায় এক। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে হাজং সম্প্রদায়ের লোকেরা অন্যান্য অনুষ্ঠানের মতো আয়োজন করে ‘চোরা মেলা’ নামে একটি মেলার। এই চোরা মেলার মাধ্যমে বাঙালি হাজং গারো সবাই এ মেলায় অংশ গ্রহন করে। গারো আদিবাসী ও বাঙালি সম্প্রদায়ের সব শ্রেণী ও পেশার মানুষকেও একাত্মবোধে অনুপ্রানিত করে মেলাটি। চোরা মেলার আয়োজনে উৎসব মুখর হয়ে ওঠে পাহাড়ি এ জনপদ। জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায় নির্বিশেষে উৎসবমূখর হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের মানুষ।  মেলাটি অন্যান্য লোক মেলার মতো আয়োজিত হলেও এইা শেলার পেটছনে রয়েছে এক বিশাল ও সমৃদ্ধ  ইতিহাস।

চোরা নামকরণের প্রেক্ষাপট
জানা যায়, মেলার উৎপত্তি ব্রিটিশ আমলে।গ্রামের না্ম রাজাবাড়ি । রাজাবাড়ি গ্রামে এই মেলা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।এই গ্রামের নাম কেন রাজাবাড়ি হয়েছে  তা এই এলাকার কেউ জানে না । তবে বৃটিশ আমলে  খাজনা আদায়কারী  রাজা উপেন্দ্র খাজনা আদায়ের জন্য সুসং দূর্গাপুর থেকে হাতিতে করে নিয়মিত রাজাবাড়ি গ্রামে আসা যাওয়া করতো।
 
এ গ্রামে তাবু ফেলে তিনি বসবাসও করেছেন।রাজা উপেন্দ্র  খুব লিাসী ছিলেন বর্তমান রংছাতি গ্রামে রাজার রংমহল ছিল। বর্তমান সতেরহাতি গ্রামে ছিল হাতির খামার। সেই সময় বর্তমান মাহাদেও নদীর গতিপথ বটতলা গ্রামের পাশে ছিল। তাই রাজাবাড়ি গ্রামে ৭টি বড় বড় পুকুর এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও অনেকগুলো কূপ ও পুকুর অনেক গভীর করে খনন করার পরও পানির উৎসের সন্ধান মেলেনি। তাই এই গ্রামে অবস্থান করা তাঁর পক্ষে কষ্টকর হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি এ এলাকায় স্থায়ীভাবে আসা যাওয়া বন্ধ করে দেন। এই গ্রামে অস্থায়ী অবস্থাকালীন সময়ে তিনিই সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজা ও ছোট খাট মেলা শুরু করেছিলেন।

রাজার চলে যাওয়ার পর বগাডুবি গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজং আদিবাসীরা নিয়মিত এই দেবীর পুজা উপাসনা করেন। গ্রাম থেকে পুজা মন্ডপটি খানিকটা দূরে হওয়ায় পরবর্তীতে শালিকাবাম ও নোয়াগাও গ্রামের হাজংদের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর থেকেই প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তির সময় সন্ধ্যা থেকে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর নামে পুজা ও  সারারাত ধরে কীর্তন গাওয়া হয় কালের সাক্ষী হয়ে থাকা  মাহাদেও গ্রামের বটবৃক্ষের ছায়াতলে। পরের দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের সকাল প্রায় ১০টা পর্যন্ত পুজা হয়। পরে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। হাজং ছাড়াও সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ মানত করে । মানতের জন্য সবাই  কবুতর, কেউবা পাঁঠা এনে থাকেন থাকেন। সকাল থেকে মানুষের সমাগম ঘটলেও মেলা জমে উঠে বিকেলের দিকে।

সিদ্ধেশ্বরী মূলত শক্তির দেবী কালির আরেক নাম। কালি এ অঞ্চলের আদি দেবী তাই পুজাও হয় ঘুব ঘটা করে। 

পুজার নামকরণ
সিদ্ধেশ্বরী দেবীর নামে যদি পুজা হলেও এর নাম চোরা মেলা কেন হলো এ নিয়ে একাধিক গল্প চালু আছে।  এ অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেছে মাহাদেও নদী। তার চরায় গড়ে উঠেছে এ পুজার স্থান। চরার উপর পুজা হয় বলেই এর নাম চরা থেকে চোরায় রূপান্তরিত হয়েছে।  আবার অনেকের মতে এ অঞ্চল ছিলো নদী পাড়ের শ্বাপদ শংকুল এলাকা। রাজা যখোন এখানে এপুজার প্রচলন করেন তখন এই স্থানে প্রচুর জঙ্গল ছিল। পুজার যেসব উপাচারের সমাগম হতো্ তা ছিলো বিশাল অংকের। এসব জঙ্গল থেকে আসা লোকেরা চুরি করে নিয়ে যেত। মেলার দোকানের জিনিসপত্রও চুরি করতো চোরেরা সে থেকেও চোরা মেলার নাম করন হতে পারে। তবে সামন্তদের সময থেকে যে এ মেলার ভিত্তি শুরু হয়েছিলো তা অনেকেই জানেন। লোকমুখে এ নাম চোরা মেলা হয়েছে  এবং সবার কাছে এ নামেই পরিচিতি লাভ করেছে। 

চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধরন
চৈত্র সংক্রান্তির দিনের আগে থেকেই  হাজং আদিবাসীরা অন্যান্য আদিবাসীদের মতো শুদ্ধি অভিযান চালাত। চারদিক ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করতোসামাজিকভাবে সংগঠিত হয়ে পুজার স্থান পরিস্কার করে এবং সামর্থ্য অনুসারে সাজাতো । তার আগে  নারীরা নিজ নিজ বাড়ির  ঘর লেপেন, বাড়ির চারপাশ পরিস্কার করেন, ঘরের আসবাবপত্র সব ধুয়ে মুছে সাফ করতেন। পাখা, শিলপাটা, দাঁড়িপাল্লা পর্যন্ত ধুয়ে ফেলা হয়। গোয়াল ঘরও পরিস্কার করেন এবং গোয়াল ঘরের মাঝখানে অনেকটা প্রাচীত ঐতিহ্য ও রীতি মেনেই এক খাঁচা মাটি দেন গবাদি পশুর মঙ্গলার্থে। প্রতিঘর থেকে  টাকা  চাঁদা তুলে পুজা ও মেলার জন্য তৈরী হয় সবাই।

যখন তালের পাখা ছিলো গরম থেকে বাঁচার একমাত্র পথ  তখনও আদিবাসী হাজংরা ব্যবহারিক হাত পাখাকে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে না ধোয়া পর্যন্ত পর্যন্ত  সেই হাত পাখা ব্যবহার করত না। পহেলা বৈশাখের দিনে আদিবসী হাজংরা সকাল হতেই ঘিলা (ঘিলা একধরনের জংলী গাছ) বীজ গুড়ো করে সাথে খাটি সরিষা তৈল, পানি ও আবির একসাথে মিশ্রণ করে বসতভিটের চারপাশ, ঘরবাড়ী, আসবাপত্র, গোয়াল ঘর সব জায়গায় ছিটিয়ে দিতেন। তাছাড়া ডায়নিউকা (লতানো জংলী গাছ) বেত পাতা, ইকরের আগা, গোড়াপাংখা  এক সাথে বসতঘরের দরজার সামনে চালের উপর রেখে দিতেন । এগুলো ছিলো বাড়ির মাঙ্গলিক আয়োজনবাড়ির সারাবছরের মঙ্গলার্থে।  এখনও সনাতনী প্রক্রিয়ায় চলে আদিবাসী হাজংদের উৎসব পালন।

পহেলা বৈশাখে ১০৮টি জাতের শাক মিশ্রণ করে তরকারি রান্না করতো আদিবাসী হাজংরা । এর মধ্যে আম, জাম, কাঁঠাল, বাঁশ প্রভৃতির কচি পাতা পর্যন্ত তালিকার অন্তর্ভূক্ত ছিল। তার মধ্যে টিটা জাতীয় শাকের পরিমাণ বেশি থাকতো। আর অবশ্যই নিম পাতা, অচাষকৃত গিমা টিটা শাক থাকতো। আর সব উপকরণই সংগ্রহ করা হতো বন জঙ্গল থেকে। এর আনন্দই ছিল ভিন্ন রকম। তাদের বিশ্বাস ছিল বছরের শুরুতে তিতা্ জাতীয় শাক খেলে সারাবছর শরীর সুস্থ থাকবে। বর্তমানে আর এত শাক সংকুলান সম্ভব হয় না। তবুও চেষ্টার ত্রুটি নেই কোন। তবে তরকারিতে অবশ্যই এক টুকরা হলেও আমকুড়া (কচি আম) দিতে হয় এবং এদিনের পর থেকে আম খাওয়া শুরু করে আদিবাসী হাজং সম্প্রদায়। 

তবে পয়লা বৈশাখে তদাদে;র খাবার তালিকা বাঙালিদের মতোই । হাজং বাড়িতে নিজেদের হাতে তৈরি করা বিন্নি ধানের খই চিরা মুড়ি,  দই, গুড়জাতের পিঠা তৈরি করেন। পিঠা, দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। শুধুমাত্র এদিনে খই, পিঠা তৈরি করতে হবে এবং অতিথি আপ্যায়ন করতে হবে বলে অনেক পরিবার বিগত বছরের আমন মৌসুমের বিন্নি ধান
অতি যত্নে সংরক্ষণ করে রাখেন। সব সময়ের চিরচেনা সকালের নিরবতা এদিন কোলাহলপূর্ণ সকালে পরিণত হয় শিশু কিশোরদের রঙ উৎসবের জন্য। বাদ যায় না গবাদি পশুগুলোও। সকালে গরু, ছাগলগুলোকে স্নান করিয়ে সাথে কুকুর, বিড়াল, হাঁস, মুরগি, কবুতর প্রভৃতি প্রাণীদের কলকে দিয়ে রঙ মাখিয়ে রঙিন করে তোলেন এবং নতুন বছরের মঙ্গল কামনায় তাদেরকেও সম্পৃক্ত করেন।

অধিকাংশ হাজং জনগোষ্ঠীর অভিমত, তারা যতগুলো পুজা পালন করেন তার থেকে এটি ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সম্পৃক্ততায় পুজা ও মেলা দুটোই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শত বছরেরও বেশী সময়ে সারাদেশে কত রকম বদল হলেও ঐতিহ্যবাহী এই পুজা ও মেলার স্থানটিতে এখন পর্যন্ত তেমন কোন পরিবর্তন নেই। পবিত্র পুজা মন্ডপের পবিত্রতা সব সময়ের জন্য বজায় রাখার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। এটার সংস্কার করা হলে মানিুষের জন্য সুবিধা হতো। কারণ চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখে এটি উদ্যাপন করায় এলাকা ছাড়াও এলাকার বাইরের অনেক দূর দূরান্তের মানুষ এখানে আসেন  সনাতন ধর্মাবলম্বী আদিবসী হাজংদের আত্মিক সান্নিধ্য পেতে।

ডিজি