• ঢাকা
  • সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: মে ১৫, ২০১৯, ০২:৪৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ১৫, ২০১৯, ০২:৪৫ পিএম

ফলের মাস শুরু

ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ...

এসএম মুন্না
ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ...
বাজারে মিলছে লিচু, তবে দাম বেশি -ছবি : কাশেম হারুন

‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ/ পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ...’ এ রকম বহু কবিতার পঙক্তিতে রয়েছে বাংলার ফল-ফলারির রসালো বিবরণ। গ্রীষ্মের প্রখর তাপদাহে প্রকৃতি যেখানে ক্লান্তিতে খরায় ধুঁকছে, সেই সময়ই আবার রসালো ফল-ফলারির উপহার। 

সদ্য বিদায় নিয়েছে বৈশাখ। 

আজ বুধবার (১৫ মে) জ্যৈষ্ঠের প্রথম দিন। শুরু হলো ফলের মাস। এই ফলের মাসের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন ভোজনরসিক বাঙালি। এরইমধ্যে বাজারে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন রসে টইটুম্বুর লিচু, আম, জাম, ফুটি, করমচা। বাইরে সবুজ, ভেতরে লাল টুকটুকে মিষ্টি মজার রসে ভরপুর তরমুজ তো আগে থেকেই আছে। কিছুদিন আগেও বাজারে মিলতো কাঁচা কাঁঠাল। যাকে সবজি হিসেবে ‘এঁচোড়’ বলা হয়। কচি কাঁঠালকে দেশের কোনো কোনো জায়গায় মুচিও বলা হয়। 

গরম জাঁকিয়ে পড়েছে অনেক দিন ধরেই। কাঁঠালও পাকতে শুরু করেছে। পাকা গাব, জামরুল, অসময়ের পেয়ারাসহ রকমারি দেশি ফলের সরবরাহ বেশ ভালো। কিন্তু কেনার সামর্থ খুব কমসংখ্যক মানুষেরই আছে। 

নিত্যদিনের চাল-ডাল কিনতেই ত্রাহি অবস্থা দিন আনে দিন খাই মানুষের। ফল খাওয়া সেখানে এক ধরনের বিলাসিতারই নামান্তর বৈকি। তারপরও ফল-ফলারি বলে কথা। মা-বাবা-অভিভাবকরা সবাই চান তাদের ছেলে-মেয়েদের মৌসুমি ফল খাওয়াতে। ছেলে-মেয়েরাও উন্মুখ থাকে কখন ঘরে আসবে পাকা আম অথবা লিচু। কিন্তু অতিরিক্ত দামের কারণে ফল কিনতে না পারা কষ্ট মা-বাবাকে পীড়া দেয়। এসব কষ্ট-পীড়া যেমন আছে, তেমনি রসালো ফলের প্রাচুর্য এবং ঐতিহ্যও সত্যি।

সাধারণ মানুষ আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকছেন দেশি ফলের দিকে। বাড়ছে স্বাস্থ্য সচেতনতাও। সেটাও ভালো লক্ষণ নিঃসন্দেহে। 

খুব বেশিদিন স্থায়ী হয় না বাঙালির রসনাতৃপ্তি মিষ্টি ফল আম-কাঁঠালের এই মাস। মূলত গ্রীষ্ম ঋতুর খরতপ্ত বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ দুই মাসই মিষ্টি ফলের মাস। তবে তা জমে ওঠে জ্যৈষ্ঠেই। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুতে ভরে ওঠে সারাদেশের ফলের দোকানগুলো। 

জ্যৈষ্ঠ মাস- বাংলার গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্যেরও অনিবার্য অংশ। গ্রামের মানুষ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আম-কাঁঠালের উপহার পাঠিয়ে থাকে এই জ্যৈষ্ঠেই। 

করপোরেট জগতেও ফলের ঝুড়ি পাঠিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয় এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। এ মাসেই জামাই-মেয়েসহ প্রিয় স্বজনদের আম-কাঁঠালের ভূরিভোজ দেয়াও সচ্ছল গৃহস্থ পরিবারের ঐতিহ্য। বহুকালের সে ঐতিহ্য আগের মতো ব্যাপকভাবে না হলেও এখনও টিকে আছে। 

এ তো গেল গ্রামবাংলার কথা। শহরেও ফলের উৎসব এখন। ঢাকার ফুটপাতে এবং ফলের দোকানগুলোয় নজর কাড়ছে গ্রীষ্মের মৌসুমি ফল। সাম্প্রতিককালে ফল বেচা-বিক্রির ধরনও পাল্টে গেছে। ভ্যানে করে নানা রূপ-বৈচিত্র্যের রসালো ফলের পসরা সাজিয়ে একশ্রেণির ভাসমান হকার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান রাজধানীর অগি-গলি, মহল্লা-পাড়ায়। আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুল, গাব, লটকন, পেয়ারা, আতা, আনারস, বেতফল, পেলা গোটা, ওড়বড়ই, করমচা আরও নানারকম দেশি ফল পাওয়া যায় এ সময় ঢাকায়। তবে দাম কিন্তু চড়া। কেনার সাধ্য নেই যাদের তারা ফল-ফলারির গন্ধ শুঁকেই নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। 

কথা হয় নতুন বাজারে এক দিনমজুর শেখারুলের সঙ্গে। জানালেন, ‘‘গত বছর যা হোক পরিবার নিয়ে কিছু গ্রীষ্মের ফল খেতে পেরেছিলাম, এবার মনে হয় পারবো না। এখনই লিচুর দর শ’প্রতি ৬০০টা। ৫-১০ টা করে বিক্রি অয় না। এক সঙ্গে ৫০টা কিংবা ১০০টা কিনতে হয়। লিচু কিনতে এত টাকা পামু কোত্থেকে। এমনিতেই দু’ বেলা ডাল-ভাত খাইতে গিয়ে হিমশিম খাইতে হচ্ছে।’’

এরইমধ্যে নগরীর বাজারে নানা জাতের আম উঠেছে। তবে দাম অত্যন্ত চড়া। বিচিত্র স্বাদের ল্যাংড়া, হিমসাগর, গোপালভোগ- এসব সেরা জাতের আমের দাম সীমিত আয়ের মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। কোনো কোনো জাতের পাকা আম বিক্রি হচ্ছে কমপক্ষে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে। আর লিচু? সে তো সাধারণ ক্রেতা ভাবতেই পারছেন না। ৬৫০ টাকার নিচে লিচুর শ’ কেনা অসম্ভব। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে উত্তর গেইট সংলগ্ন (আজাদ প্রোডাক্টাসের গলি) একশ লিচুর দাম হাঁকা হয়েছে ৯০০ টাকা। লিচুর আকাশচুম্বির দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার উষ্ণ বাক-বিতণ্ডা হতে দেখা গেছে। আবার অদূরে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের ফুটপাতে অপেক্ষাকৃত ছোট, বিবর্ণ ও টক স্বাদের লিচু বিক্রি হচ্ছে শ’ প্রতি ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা। এই লিচু কেনার জন্য দরিদ্র লোকরা ভিড় করছেন। তারপরেও তাদের নাগালের মধ্য নয়।

জাতীয় ফল কাঁঠালের বাজারও বেশ চড়া। এখনও কাঁঠাল সরবরাহ তেমন বাড়েনি। বাজারে যাও মিলছে, তার দাম অত্যাধিক। বড় সাইজের একটা কাঁঠাল (আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কেজি ওজন) ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা। মাঝারি সাইজ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। অবশ্য স্থান এবং বিক্রেতা বিশেষে এর দামের হের-ফের আছে। যেমন- গুলশান ২ নম্বরে একটি ফলের দোকানে বড় সাইজের একটি কাঁঠালের দাম হাঁকা হয়েছে ২২০০ টাকা। আবার একই সাইজের কাঁঠাল শান্তিনগরে বাজারে বিক্রির দাম হাঁকা হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। একাধিক বিক্রেতা জানালেন, ‘ভালোমানের কাঁঠাল আসতে এখনও ১৫ থেকে দিন অপেক্ষা করতে হবে।’ 

বাজার ঘুরে দেখা গেলো, এখন যে কাঁঠাল বিক্রি তা হচ্ছে অপরিপক্ক। এ জন্য কাঁঠাল  কিনতে গিয়ে সতর্ক থাকা খুবই জরুরি। লোহার শিক ঢুকিয়েও অপুষ্ট কাঁঠাল পাকানো হচ্ছে। এসব কাঁঠাল একদিকে যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি স্বাদহীন। আবারও টাকাও অপচয় হচ্ছে।

কালো জাম পাওয়া যাচ্ছে। তবে দাম মাত্রাতিরিক্ত। তেজগাঁও কলেজ সংলগ্ন ফলের দোকান, নিউ মার্কেট ১ ও ২ নং গেইট লাগোয়া কয়েক ফলের দোকান, শাহজাহানপুর, ফকিরাপুল, শান্তিনগরসহ বেশ কয়েক স্থায়ী ফলপট্টিতে কালো জামের দাম কেজিপ্রতি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা হাঁকতে দেখা গেছে। আরও বেশি দাম হাঁকা হচ্ছে মুখরোচক ফল লটকনের। নিউমার্কেটের ৩নং গেইটে বিক্রি হয়েছে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। স্বাদে টক ও আটালো কিন্তু মুখরোচক-ভিটামিন ‘সি’ এ ভরপুর করমচা মিলছে বাজারে। দাম মোটেও সস্তা নয়। শাহজাহানপুরে একটি ফলের কেজি প্রতি ৪০০ টাকা হাঁকতে দেখা গেছে দোকানিদের। 

গ্রীষ্মের ফল গাবও পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। দাম হালি প্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। মৌসুমি ফল হলেও বাজারে মিলছে আতা ফল। দাম নিয়ে সেই একই অভিযোগ মাত্রাতিরিক্ত দাম চাচ্ছেন বিক্রেতা। 

রসালো ফলের বাজারে কম দামে মিলছে জামরুল। তাও কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৪০ সাদা জামরুল মিললেও, লাল জামরুল মিলছে ১৫০টাকা। 

তালের শাঁস পাওয়া যাচ্ছে। এক তাল বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা করে।  

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটসহ এই এলাকায় রয়েছে বেশক’টি ফলের দোকান। এখানে থরে থরে সাজানো নানা জাতের মৌসুমি ফল। জিভে পানি আনা চকচকে বর্ণিল এসব ফল পথচারীদের সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। তবে এসব চকচকে সব ফলই কিন্তু নিরাপদ নয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ফলের বেশিরভাগই কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো। 

কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো বা কেমিক্যাল মেশানো ফল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুষ্টিবিদ রজত কুমার সেন দৈনিক জাগরণকে বলেন, ক্যালসিয়াম কার্বাইডযুক্ত বিষাক্ত ফল খেলে কিডনি, লিভার, ডায়রিয়া, জন্ডিস, বিশেষ করে শিশুদের ক্যান্সার ও ব্ল্যাড ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কাজেই ফল কেনার সময় কেমিক্যালের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। চকচকে রঙের টসটসে ফল হলেই তা নিরাপদ নয় কিন্তু। ফল কিনে আনার পর সমপরিমাণ পানির সঙ্গে ভিনেগার মিশিয়ে ১০ মিনিট ফল ডুবিয়ে রেখে, ভালো করে ধুয়ে নিয়ে তবে খেতে হবে। যদি তা সম্ভব না তাহলে পরিষ্কার পানি দিয়ে ফল ধুয়ে নিতে হবে এবং অবশ্যই খোসা ছাড়িয়ে খেতে হবে। 

ছবি  কাশেম হারুনসংগৃহীত

এসএমএম

Islami Bank
ASUS GLOBAL BRAND