• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০১৯, ১০:২২ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ২৬, ২০১৯, ১০:২২ এএম

শহীদ জননী ও কিছু স্মৃতি 

তৌহীদ রেজা নূর
শহীদ জননী ও কিছু স্মৃতি 


আমাদের ওরা আজ দাঁড়াতে দেবে না – এমন নির্দেশ তামিল করতেই যেন রায়ট পুলিশ ঘিরে ছিল পুরো তাহের মিলনায়তনের সামনের রাস্তা। বক্তৃতা করার মাইক এর মধ্যেই কেড়ে নিয়ে গেছে পুলিশের দল। দুদিন আগে স্বাধীনতা দিবসে আমাদের মিছিল ছত্রভংগ করতে ওরা লাঠি চার্জ করেছে, টিয়ার গ্যাসের মুহুর্মুহু আক্রমণ করেছে – আমাদের মিছিল থেকে অনেককেই গ্রেপ্তার করেছে।

যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে আমাদের মিছিলের উপর এই আক্রমণ হবার প্রতিবাদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমন্বয়ক শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ডাক দিয়েছেন আমাদের সবাইকে তাহের মিলনায়তনের সামনে জড়ো হতে। এটি প্রতিবাদ সমাবেশ।

পৌঁছেই দেখি ইউনিফর্ম পরা রায়ট পুলিশ যুদ্ধ করার সব প্রস্তুতি নিয়ে ঘিরে রয়েছে এলাকা। পুলিশের ফাঁক-ফোকর গলে দেখার চেষ্টা করছি জাহানারা ইমাম আসতে পেরেছেন কিনা। দেখে আশ্বস্ত হলাম যে তিনি ভেতরেই আছেন – পাশে রয়েছেন শাহরিয়ার কবীর, কাজী আরেফ আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, সৈয়দ হাসান ইমাম, আব্দুল মান্নান চৌধুরী, ব্যারিস্টার শওকত আলী, শফিক আহমেদ, সহ আরও অনেকে। তরুণদের মধ্যে কামাল পাশা চৌধুরী, সাগর লোহানী, আফজাল হোসেন, সাদেকুর রহমান পরাগ এবং আরও অনেকেই আছেন।

সার্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে আজ আরও অনেক ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এরমধ্যে শ্লোগান শুরু হয়েছে। প্রতিবাদ সভায় দাঙ্গা পুলিশের অতর্কিত আক্রমণ শুরু হলো। এই ধস্তাধস্তির মধ্যেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কমবেশি সকলেই আঘাত পেল কিন্তু এর মধ্যে জানতে পারলাম শহীদ জননীর ওপরে লাঠিচার্জ হয়েছে। আমরা তখন প্রথমে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় এবং পরক্ষণেই ক্ষোভে ফুঁসছি।

দেখলাম সৈয়দ হাসান ইমাম পাজাকোলা করে নিয়ে আসছেন সংজ্ঞাহীন জাহানারা ইমামকে। তাঁকে এভাবে নিয়েই মিছিল এগুলো পল্টনের দিকে। রিক্সা খোঁজা হচ্ছে – সেখানে শহীদ জননীকে তোলা হবে কিন্তু পুলিশ কোন রিক্সাকে কাছে ভিড়তে দিচ্ছে না, সরিয়ে দিচ্ছে। পরে এক সাহসী রিক্সাওয়ালা মিছিলের সাহসী তরুণদের আহ্বানে এগিয়ে এলো – সেখানে বেবী মওদুদ তাঁর কাধে জাহানারা ইমামের মাথা রেখে বসলেন। এগিয়ে চলেছে রিক্সা, আর আমরা সবাই সেই রিক্সাকে ঘিরে এগিয়ে যাচ্ছি – শ্লোগান দিচ্ছি। রটে গেল যে শহীদ জননীকে পথের মধ্য থেকেই সংগাহীন অবস্থায় গ্রেপ্তার করতে পারে। তাই আমরা সকলেই চোখ কান খোলা রেখে এগিয়ে চলেছি। মিছিল এসে শেষ হলো পিজি হাসপাতাল (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল হাসপাতাল)-এর সামনে। এই আন্দোলনের সাথে জড়িত চিকিৎসকেরা শহীদ জননীর দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এলেন। পরে বঙ্গবন্ধু কন্যা – তখনকার সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এলেন হাসপাতালে। শহীদ জননীর পাশে থেকে এই আন্দোলন এগিয়ে নেবার সাহস জোগালেন। তারিখটি ছিল ২৮ মার্চ, ১৯৯৩। তিনি যখন হাসপাতাল থেকে ফিরে গেলেন বাসায় – তখন শোবার ঘরে তাঁর সাথে দেখা হোল আমাদের। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্বনকারী খালেদা জিয়ার সরকারের এই সব অত্যাচার, অনাচার দেখে আমরা আরও যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছি, হচ্ছি, সেই বার্তাটি তাঁর কাছে আমরা পৌঁছে দেই আমাদের মত করে। তিনিও পাল্টা নানা কথা বলে আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। ভয়ংকর প্রতিকূলতার মাঝে এই দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধের আন্দোলন এগিয়েছে – তার একটি ব্যথাতুর অথচ উজ্জ্বল স্মৃতি শেয়ার করলাম আজ শহীদ জননীর তিরোধান দিবসে।

বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে।।

লেখক
তৌহীদ রেজা নূর, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক প্রজন্ম ‘৭১, গবেষক ও শিক্ষক