• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০১৯, ০৮:৪৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ১৯, ২০১৯, ০৮:৪৯ পিএম

আমার বঙ্গবন্ধু

মাসুম খান
আমার বঙ্গবন্ধু

‘‘এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্ধু-মুসলমান।
তাঁরা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।’’ পল্লী কবি জসীম উদ্দীন’র ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতা থেকে। স্বাধীনতার আগে ও পর থেকে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে এবং অনুপস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার ও তাদের দালালেরা দেশের ভেতর এবং বাহিরে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নামে ধর্মীয় কুৎসা রটনা করছে এবং এখনও করে চলেছে। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে ব্যারাকি রাজাদের আমন্ত্রণে রাজাকার, আলবদর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ধর্মান্ধ ব্যবসায়ীরা দেশে ফিরে আসে এবং মহোৎসাহে বঙ্গবন্ধুর নামে ধর্মীয় অপপ্রচার শুরু করে। ধর্মান্ধ ব্যবসায়িরা টাকার পাহাড় গড়ে, যা এখনো বিদ্যমান।

 স্বাধীনতার পর দেশে  স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির পুনরুত্থানে সরল প্রাণ মুসলমানদের মনে বিষছড়াতে এবং তাদের অসৎ উদ্দেশ্যে সাধন করতে বঙ্গবন্ধুর জাতির পিতেৃ প্রশ্ন তুলে এ চক্র। তারা এ কথা বলে যে, জাতির পিতা দুই জন হবে কি করে। তাহলে তারা কী এখনো জিন্নাকেই বাঙালি জাতির পিতা মনে করে। সে তো পাকিস্তানের জাতির পিতা, মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ্। ইব্রাহিম (আ:) তো মুসলিম জাতির পিতা; আবরাহাম খ্রিস্টান জাতির পিতা। প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জাতির পিতা আছে। যে সব জাতির পিতা নাই, তাঁরা এখনো পরাধীন, তাঁদের নির্দিষ্ট ভূখন্ড নাই। জাতীয় স্বত্তা তাঁদের এখনো শৃঙ্খল, তাঁদের স্বপ্ন একজন জাতীয় পিতা বা জাতীয় নেতার। যার ডাকে শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হয়ে বিশ্বদরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ  স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত জিন্না্হকে পাকিস্তানের জাতির পিতার সম্মান দিয়েছে। বাংলাদেশ  স্বাধীন হওয়ার পরও  স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে তিনি অন্যান্য দেশ ও জাতির প্রতি সম্মান ও তাঁদের জাতির পিতার ও জাতীয় নেতাদের সম্মান প্রদর্শণ করেছেন। আসে নির্বাচন ধর্মান্ধ ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করা হয় তাতে, বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ধর্মীয় প্রচারনায়। আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকে এরা না কি, ভারতের দালাল বলে গালি দিতেই বেশি পছন্দ করে। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির জনক এ কথা  স্বীকার করতেও অস্বীকার করে। তারা বলে আমাদের জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ:)।

ভারত উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ‘মুসলিম লীগ’ এর প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্’র হাতে বৃটিশ সরকার ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দেয়। এ কারণেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ পাকিস্তানের জাতির পিতা। ১৯৪৭ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত পাকিস্তানের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, হয়েছে মতাদর্শরে উত্থান-পতন কিন্তু জিন্নাহ্’র পিতৃত্ব নিয়ে কোনো তর্ক-বিতর্ক হয়েছে বলে শুনিনি। যত সমস্যা আমার সোনার বাংলায়। শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি পেয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে। এ উপাধি শেখ মুজিবের  স্বঘোষিত নয়। তৎকালীন সম্মিলিত ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রিয় কমিটির পক্ষ থেকে এ ঘোষণা আসে ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিব। ১৯৭১ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ  স্বাধীনতা লাভ করে বলে তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা। বাঙালি জাতির পিতা।
বাংলাদেশের কিছু কিছু মৌলবাদী রাজনৈতিক নেতাদের মুখে ‘বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা’ প্রসঙ্গ এলে তারা বলে ‘নাউযুবিল্লাহ্’। দেশের রাজনৈতিক সংগঠন গুলোর রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবাদ দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিদন্দ্বিতা করা সকলের জন্য মঙ্গল। আসুন যাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ হলো তাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করি। বঙ্গবন্ধু ও আওয়মীলীগের বিরোধে এ শ্রেণি বিষবাস্প যাই ছড়ায় না কেন, আসুন আমরা দেখি বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ দেশ ও ধর্মের জন্য কী কী কাজ করেছে। সে কাজে দেশ ও ধর্মের কী উপকার হয়েছে আর কী কাজ ধর্মের বিরোধে গিয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর  স্বদেশ প্রেমের ফলে বাংলাদেশ দু’বার  স্বাধীন হয়েছে। প্রথম বার পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠির হাত থেকে, দ্বিতীয় বার ভারতীয় মিত্র বাহিনীর উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের মিত্র পক্ষ। মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার আত্মসমর্থন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু  স্বাধীন বাংলাদেশে  মিত্র বাহিনী থেকে যায়। বঙ্গবন্ধু মিত্র বাহিনীর সৈন্য ঢাকা ত্যাগে বাধ্য করেন, বাংলাদেশের  স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়।

আমাদের মনে আছে, নব্বইয়ের দশকে ইরাক-কুয়েত যুদ্ধ শুরু হলে, কুয়েতের মিত্র পক্ষ সেখানে অবস্থান নেয় এবং আজও তারা কুয়েতে এবং আরব বিশ্বে উপনিবেশ গড়ে রাষ্ট্রগুলোর  স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে আসছে। এ উপনিবেশের ফলেই ইরাক এবং আফগানিস্তান ধ্বংস করা ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর পক্ষে সহজ হয়। কেন না, প্রতিবেশি ইসলামি রাষ্ট্র থেকেই তারা আক্রমন করেছে। বাংলাদেশের  স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পরপরই ভারতীয় সৈন্যের ঢাকা ত্যাগ সে কারণে অবশ্যই তাৎপর্যবাহী এবং এর কৃতীত্ব একমাত্র বঙ্গবন্ধুর। তাছাড়া ১৯৭৪ সালে লাহোরে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগদান ভারত বাঁকা চোখে দেখলেও বঙ্গবন্ধু সে সম্মেলনে যোগদিয়েছিলেন।

  স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র প্রধান, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেন নাই। শুধু তাই নয় এ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইসলামী বিশ্বে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে-ভারত সহ অন্যান্য অমুসলিম মিত্র শক্তির দেখানো ভয়ে, বঙ্গবন্ধু’র ভয় না পাওয়ার মানে হলো সে একজন রাষ্ট্র প্রধান, কোন দেশের তাবেদার নয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপোষহীন নেতা, গ্রেট মুসলিম, মুসলমানের দাবীই ছিল তাঁর প্রধান দাবী। আর সে দাবিতেই তিনি লাহোরের সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন। এই যদি হয় ধর্মীয় চেতনা, রাষ্ট্র পরিচালনার বহিঃপ্রকাশ, তাহলে কোথায় বঙ্গবন্ধুর নমনীয় মনোবৃত্তি? ধর্মান্ধ ব্যবসায়ীরা যে বঙ্গবন্ধুর কথা বলে তিনি কোন্ জন? আমরা তাকে দেখতে চাই, তার দালালি কার্যকলাপের সাথে পরিচিত হতে চাই।

অনেকে মনে করেন বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ পুরানো ইতিহাস, আলোচনা হয়েছে অনেক। আবার কেন নতুন করে এতো আয়োজন! কিন্তু আমরা জানি বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এত বেশি আলোচিত হয় নি, যে পরিমান বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ বিরোধী মগজ ধোলাই হয়েছে নতুন প্রজন্মের মাঝে। ৩৪ বছর অবিরত চলেছে এ ধোলাইয়ের কাজ, সে তুলনায় বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু আলোচনায় এসেছে অতি সামান্য। দু’চারটি পত্রিকা ১৫ আগষ্ট ছাড়া বঙ্গবন্ধুর কথা খুব বেশি ছাপেনা বা বলেনা। বঙ্গবন্ধু নিয়ে আমাদের এ মানসিক দৈন্যদশা না ঘুচলে বাংলাদেশের দৈন্যতা ঘুচবেনা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমাদের প্রত্যেকের ভাবতে হবে, তাঁকে জানতে হবে সঠিক ভাবে। তাঁর ধর্মীয় চেতনা ও কার্যকলাপ সম্বন্ধে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী, ভক্ত সদস্যই অন্ধকারে হাবু-ডুবু খায়। আমরা ক’জন জানি বিশ্ব ইস্তেমার ব্যবস্থা করেছেন বঙ্গবন্ধু, তিনিই করেছেন ইসলামী ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম লীগ সভাপতি, বাংলাদেশ  স্বাধীন হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেট মুসলিম বলেছেন। তবে, সাত কোটি বাঙালির ভালবাসার কাঙাল বঙ্গবন্ধুর উদারতার সুযোগ নিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে অপকর্মের সূচনা যে হয়নি, এমন নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপের কারণে কোন অপকর্মই এদেশে হতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার সাক্ষ্য’ গ্রন্থের ২৬ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দেয়া যায়। তিনি সেখানে বলেছেন- ‘ স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আমরা অনেক অপকর্মের উদ্ভাবনা করেছি। তার মধ্যে একটি হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি অনুদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার প্রস্তাব। তৎকালিন শিক্ষা সচিব এই অনুদান বন্ধের প্রক্স্তাব প্রধান মন্ত্রীর কাছে করেছিলেন। প্রধান মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই প্রস্তাব সমর্থন করেননি। উপরন্তু তিনি মাদ্রাসার অনুদান বৃদ্ধি করেছিলেন। এরপরে আলিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নের জন্য তিনি সর্বোতভাবে সাহায্য করবেন। তিনি মাদ্রাসার শিক্ষক এবং ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন- ‘আসুন আমরা মিলিতভাবে দেশ থেকে ঘুষ, জুয়া ইত্যাদি অনৈসলামীক কাজের উচ্ছেদ ঘটাই। আমি রেস খেলা বেআইনী ঘোষণা করেছি। আপনারা আমার হাতকে সুদৃঢ় করুন। সর্বপ্রকার পাপের মূলোচ্ছেদ না করলে এদেশকে রক্ষা করা যাবে না।’ 


সে সময় ধর্মনিরপেক্ষতার আরও একটি শিকার হতে গিয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত— নেন যে, টেলিভিশন থেকে কোন প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে না এবং নিয়মিত ভাবে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত প্রচার করাও হবে না। এর পরিবর্তে তারা কিছু বাণী প্রচারের  ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থাও শেখ সাহেবের হস্তক্ষেপের ফলে কার্যকর হয়নি। এ উপলক্ষে আমার একটি ঘটনার কথা মনে পরছে, বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ঢাকার চান খাঁর পুলের আওয়ামি লীগ কর্মীরা একটি উৎসবের আয়োজন করেন। সেখানে গান-বাজনা এবং বাজি পোড়ানো হবে, এই সিদ্ধান্ত হয়। কর্মীরা এ উৎসবের জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে কিছু অর্থসাহায্য চেয়েছিলেন। তিনি সাহায্য দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, গান-বাজনা এবং বাজি পোড়ানোর পরিবর্তে মিলাদ মাহ্ফিলের আয়োজন করতে।

 বলেছিলেন- ‘মুসলমানদের উৎসব হচ্ছে মিলাদ। মুসলমানরা কোন কিছুতে সফলকাম হলে এবং খুশী হলে মিলাদ পড়ায়।’’ সৈয়দ আলী আহসানের এ উদ্ধৃতি থেকে আমরা জানতে পারি, সরকারি আমলারা বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার নাম করে ধর্মহীনতার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে ছিলেন ঠিকই কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হক্স্তক্ষেপে তারা তা পারেনি। বঙ্গবন্ধু তাদের অনৈসলামীক কাজ মেনে নিতে পারেননি। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বঙ্গবন্ধু একথা বার বার সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষণে স্পষ্ট ভাষায় বলেন- ‘‘বাংলাদেশে মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। খ্রিস্টান তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা করা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না।”

পবিত্র ধর্ম ইসলাম, এ ধর্মে অন্যায়-অত্যাচারের স্থান নাই। কোন প্রকার ধর্মীয় অনাচারের সমর্থন ইসলাম করে না। আমরা যদি মদিনা সনদের দিকে তাকাই, সেখানে দেখি নবী করিম (স:) মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন ব্যবহৃত সকল ধর্মের ঊর্ধ্বে। মহানবী (স:) মদিনা সনদে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে,  স্বাক্ষরকারী সকল ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক ও মুসলমান সম্প্রদায় সমূহ সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং তারা একটি সাধারণ জাতি কমনওয়েথ করে। তাদের মাঝে পূর্ণধর্মীয়  স্বাধীনতা বজায় থাকবে। মুসলমান ও অমুসলমান স¤প্রদায় বিনাদ্বিদায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কারো ধর্মে হস্থক্ষেপ করতে পারবে না।

‘‘আর রাহীকুল মাখতুম’-এর পৃ. ২১৬ লেখক ‘আল্লামা ছফিউল রহমান মোবারকপুরী’ বলেন- ‘‘হিজরতের পর রসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম মুসলমানদের মধ্যে আকীদা-বিশ্বাস, রাজনীতি এবং একক শৃংখলা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে অমুসলিমদের সাথে নিজের সম্পর্ক সুবিন্যস্তকরণের উদ্যোগ নেন। তিনি চাচ্ছিলেন, সকল মানুষ সুখ শান্তি ও নিরাপত্তার সৌভাগ্য ও বরকতে পূর্ণ হোক। তিনি উদারতা ও মানসিক প্রশস্ততার এমন কানুন প্রণয়ন করলেন, গোঁড়ামি বাড়াবাড়ি এবং চরম পন্থায় ভরা বিশ্বে যায় কোনো ধারণা চিন্তাও ছিলো না।
..মদীনার সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী ছিলো ইহুদীরা। তারা পর্দার আড়ালে যদিও মুসলমানদের সাথে শত্রুতা করতো, তবু এ পর্যন্ত তারা বিরোধিতা ও ঝগড়াঝাটির প্রকাশ ঘটায়নি। এ কারণে নবী করীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম তাদের সাথে একটি চুক্তিতে উপনিত হন। সে চুক্তিতে তাদের দ্বীন ধর্ম পালন এবং জানমাল রক্ষার নিরংকুশ  স্বাধীনতা দেয়া হয়।’’ বঙ্গবন্ধু ইসলামের এ শান্তি— প্রতিষ্ঠায় মগ্ন ছিলেন। তাঁর সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় বাংলাদেশে যে পরিমান ইসলামী প্রচার-প্রচারনা এবং ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তি দৃঢ় করার প্রচেষ্ঠা চলেছে তা বঙ্গবন্ধু পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কোন সরকার করেনি।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তি জীবনেও ধর্ম নিবিড় ভাবে জড়িয়েছিল। ইসলামী দর্শন, ইসলামি জীবন বিধান তিনি তাঁর ব্যক্তি জীবনে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় যতটা ব্যবহার করেছেন, তা সঠিক ভাবে করার চেষ্টা করেছেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সাথে কখনো ধর্মীয় জুয়া তিনি খেলেননি। এ ধর্মীয় জুয়া, ফাঁকিবাজি, ধোঁকাবাজি, ধাঁনধাবাজি ১৯৪৭ সালের পার থেকে বঙ্গবন্ধু ব্যতিত প্রত্যেক সরকারই কম-বেশী করেছে। পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহ্’র ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় জীবন হাস্যকর বটে। প্রচুর অর্থবিত্ত এবং আইন ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি ঘনঘন বৃটেন যেতেন, কিন্তু হজ্জ্বে যাননি কখনো। বিয়ে করেছেন অগ্নিপূজারী স্যার দীনশা বোম্বাই-এর কন্যা ‘রটী বাঈ’কে। তাদের একমাত্র বংশধর কন্যা ‘দীনা বাঈ’ বিয়ে করেছে জুরস্ত্রি অগ্নিপূজারীকে। অর্থাৎ জিন্নাহ্’র বর্তমান বংশধরেরা অগ্নিপূজারী।

 ১৯৪৭ এ পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল শুধু মাত্র ‘মুসলমান’ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। এ ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে আর কোন মিল ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা এ দেশের উপর তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যে যে অপকর্ম করে তা সহজে বোধগম্য হয় ‘‘মাসিক মুঈনুল ইসলাম, দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম, ডিসেম্বর ২০০৭, পৃ. ৩’’ পাঠে। সেখানে বলা হয়েছে- ‘‘দ্বীনদার মুসলমানদের সমর্থন কুড়ানোর জন্য ফাঁকিবাজি ও ধোঁকাবাজীর জাল চড়িয়ে কেবল শাসন ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে চেয়েছিল। ইসলাম ও মুসলমানদের ঈমান আমল সংরক্ষণ করার পরিবর্তে ইসলামের উপর ক্ষুর চালাতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেনি তারা।.....আল্লাহর আইনে দেখেছিল তারা সম্মানের হানি, ইজ্জতের অবমাননা।’’ আশ্চর্যে ব্যপার যে, ‘‘যে জিন্নাহ্ ও লিয়াকত আলী খানেরা যারা একদা বাংলাকে কুফরি বা পৌত্তলিক ভাষা বলে ঘৃনার চোখে দেখেছিল তাদের কবরে আল্লাহ্ সুবাহানাহু তাআলা বাংলা ভাষাকে চিরতরে খোদাই করে দিয়েছেন। 

জিন্নাহ সাহেবের কবরে মার্বেল পাথরের উপরে উর্দূর পাশাপাশি বাংলায় তার জন্ম ও মৃত্যু তারিখ খোদাই করা আছে, লিয়াকত আলী সাহেবের কবরের মার্বেল পাথরের উপরে বড় করে বাংলায় খোদাই করা আছে- ‘কায়দে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান’ (প্রবন্ধ : মোহাম্মদ জমির হায়দার বাবলা, ইসলাম ও আমাদের ভাষা আন্দোলন)।’’ মজার ব্যপার হলো জিন্নাহ উর্দূ এবং বাংলা কোন ভাষাই জানতেন না। তিনি ছিলেন গুজরাটের ইসমাঈলী শিয়া সম্প্রদায়ের লোক। জেনারেল জিয়াউর রহমান তো ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে মদ, জুয়া, হাউজি, পতিতা ব্যবসার মত অনৈসলামীক কার্যক্রমের লাইসেন্স দিয়ে দেশে সে ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত করে যান। যা বঙ্গবন্ধু বেআইনী করেছিলেন। বেগম জিয়া তার  স্বামীকেই অনুস্মরণ করেছেন মাত্র, পঞ্চম জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে। এরশাদের সরকারও অনৈসলামীক কাজের উদে উঠতে পারেনি।
প্রত্যেক মানুষের জীবন ধারায় দু’টি প্রবাহিত ধারা থাকে। একটি ব্যক্তিগত, অপরটি সামগ্রিক। বঙ্গবন্ধুর এ দু’টি জীবন ধারার কোথাও ধর্মহীনতা খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মের শাসন মেনে চলেছেন। তাঁর পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাই মূলত: বঙ্গবন্ধুকে মানুষের কাছে এনেছিলো, যে মানুষেরা তাঁকে প্রতিদান দিয়েছেন জাতির পিতার মর্যাদার। পৃথিবীর কোন ধর্মেই অন্যায় অত্যাচার সমর্থন করেনি, মানুষকে ঘৃণা করার উপদেশ দেয়নি। পবিত্র ধর্ম গুলোর উপদেশ সৃষ্টির মাঝে মানুষের শান্তি স্থাপন। ভালবাসার মাধ্যমে একে অপরের নিকটে আসার প্রেরণা। কিন্তু যখন মানুষ সেই পবিত্র ধর্মের নামে, ইসলামের নামে শোষণ-অত্যাচার, ঘৃণার সূচনা করলো, তখন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এর প্রতিবাদ করলো।
 
বাংলাদেশের তেমন প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদ বাঙালির মুক্তির পথকে প্রসারিত করলো। জাতীয়তা বোধের আলোয় আলোকিত হল বাঙালির মন-প্রাণ। এলো মুক্তি,  স্বাধীনতা। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা। মনে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। যে বা যারা বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিয়ে নিন্ধা করে বা করে আসছে, তারা বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনে একটি মাত্র অনৈসলামিক কাজের সন্ধান দিতে পারবে বলে মনে হয় না, রাষ্ট্র পরিচালনায় তো সম্ভবইনা।

বঙ্গবন্ধু  স্বাধীনতার পরপরই পাকিক্স্তানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ইসলামি বিশ্বের সাথে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার চেষ্টা করেছেন। লাহোরে ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান, টুঙ্গীতে বিশ্ব ইস্তেমার ব্যবস্থা, ইসলামী ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশে সকল প্রকার অনৈসলামীক কার্যক্রম বেআইনী ঘোষণা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যদি গ্রেট মুসলিম না হতেন তাহলে ধর্মীয় এত সব সংস্কার মূলক কাজ করতে যাবে কার  স্বার্থে  আর সংস্কারের মত কাজে যে পরিমান সৎসাহস প্রয়োজন হয় তাইবা পাবেন কোথা থেকে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিক্স্তান সরকার যা ২৪ বছর শাসনামলে করতে পারেনি বা করেনি বরঞ্চ অনৈসলামি কাজের প্রসার তারা করে গেছে। পরবর্তী কালে ব্যারাকী শাসকেরা পাকিক্স্তানী শাসন পূর্ণ প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে এদেশের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে ফায়দা লুটেছে এবং জাতীয় নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন করেছে।

 মদ, জুয়া, হাউজি আফিম অর্থাৎ সকল প্রকার নেশা এবং পতিতালয়ের মত অপরাধ মূলক কাজ পবিত্র ইসলাম সহ পৃথিবীর কোন ধর্মই  স্বীকৃতি দেয়নি। সে সব নিষিদ্ধ হারাম কাজ-কর্ম এদেশে সরকারী মদ্দে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ্’ সংযোজনের পর নতুন করে শুরু হয়েছে। ‘বিসমিল্লাহ্’ বললে অপরাধ মূলক কাজ যা ধর্মীয় আইনে যা নিষিদ্ধ, তা কি করে হালাল হয়ে যায়? যদি হালাল না হবে, তাহলে জেনারেল জিয়া কিংবা বেগম জিয়ার প্রসঙ্গে ধর্মীয় বিধি লঙ্গনের অভিযোগ আসে না কেন? জাতীয় বিবেকের কী ধর্মীয় অনুভূতি একেবারেই, ভোতা হয়েছে? বাঙালি জাতি চির কালই ধর্ম ভীরু, তাঁদের এ ভীরুতার সুযোগ নিয়ে যে বা যারা তাদের ব্যক্তিগত  স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে আসছে, জাতির আজ দিন এসেছে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করার। 

 স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে দেশের সকল প্রকার অনৈসলামিক এবং অনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেন আর ব্যারাকি শাসক গোষ্ঠী বাংলাদেশে পাকিক্স্তানামলের অরাজকতা সৃষ্টি করে, যুব সমাজের অধঃপতন করে শাসন কার্যক্রম দীর্ঘ করার পরিকল্পনা করেছে। 
কিন্তু ইসলামের নাম বিক্রি করে পাকিক্স্তান যেমন বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি, তেমনি নব্যদেশির পাকিদের নীলনক্সারও ব্যবস্থা বাঙালি করেছে বলে বিশ্বাস করি। মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের ধর্মচিন্তার ফলে যে পাকিক্স্তান সৃষ্টি হয়েছিল, পাকিস্তান ধবংসও হয়েছিল সেসব ধার্মিক বুদ্ধিজীবিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চেষ্টায় আর সে চেষ্টাতরীর মাঝি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ইসলামি চিন্তার আদর্শ পুরুষ সৈয়দ আলী আহসানের বক্তব্য হলো- ‘‘আজ অনেকটা পিছনে দৃষ্টি ফেলে অনুভব করতে পারি যে, আমাদের সকলের কাছে তখন পাকিক্স্তান ছিল একটি বিরাট আদর্শ ভৌগলিক বন্ধনীতে অবদ্ধ কোন রাষ্ট্র নয় কিন্তু ইসলামী আদর্শের তাৎপর্যবহ একটি অনুভূতি, এই বিশেষ অনুভূতিটাই আমাদের অনেককে অন্ধ করে ফেলেছিল। আমরা পাকিস্তানকে সকল কিছুর উর্ধ্বে স্থান দিতে শিখেছিলাম। 

আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার প্রয়োজন হয়নি। বরঞ্চ অল্পদিনেই পাকিক্স্তানের প্রতি আমার মোহভঙ্গ হয়েছিল এবং ক্রমশ: পাকিস্তানকে অস্বীকার করার সামর্থ আমি অর্জন করেছিলাম।” তৎকালিন পূর্ব পাকিক্স্তানের (ক্ষমতাসীন) মুসলীম লীগ পাকিক্স্তান অস্বীকার করার সামর্থ অর্জন করতে না পারলেও তাঁরা পশ্চিম পাকিক্স্তানের শাসন ব্যবস্থাকে অ স্বীকার করার ক্ষমতা অর্জন করেছিল। পাকিক্স্তান মুসলিম লীগ (পূর্ব পাকিক্স্তান প্রাদেশিক) সভাপতি কাজী কাদেরের দেয়া এক  স্বাক্ষাতকারে এ বিষয়ে জানা যায়- আফরোজা নাজনীনের নেয়া (অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা পৃ. ৫০) এ  স্বাক্ষাতকারে কাজী কাদের বলেন- ‘শেখ মুজিবের বিজয়ের পর আমিই শাহবাগের পেছনের গ্রীন হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলন করে ইয়াহিয়ার উদ্দেশ্যে বলেছিলাম You hand over power to Mujib ইয়াহিয়া তা করেনি। পরিনামে বিপর্যয় এসেছে।”

মুসলিম লীগ সভাপতির এমন ঘোষণার ফল কি-না জানি না, তবে পাকিস্তানের দালালিতে তাদের তুলনায় জামাতের সদস্য সংখ্যা বেশি ছিল বলে মনে হয় এবং এখনো জামাত পন্থিদের মধ্যে পাকিস্তান প্রেম দেখা যায় বেশি। জামাতের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদেই মুক্তিযোদ্ধারা লাঞ্ছিত হয়, বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে ধর্মীয় অপপ্রচার হয়। ’৭০ এর নির্বাচনে মুসলীম লীগের পরাজয়, আওয়ামী লীগের বিজয় এবং পূর্ব পাকিক্স্তান মুসলীম লীগের আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হক্স্তাš—ররের দাবী এবং  স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান তাদের (মুসলীম লীগ সদস্য) বাঙালি জাতীয়তা বোধেরই  স্বীকৃত বলে বিবেচিত। ১৯৮৭ সালের ১৭ জানুয়ারী নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর ৭২তম মৃত্যু বার্ষিকী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ বলেন- ‘‘আজকের বাংলাদেশের স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ কথাটি অকৃপণ ভাবে সকলকে  স্বীকার করতেই হবে।

কাজী কাদেরের দাবী, ‘‘পাকিস্তান রাষ্ট্র অবস্থায় বঙ্গবন্ধু যদি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ কে পাকিস্তানের জাতির পিতার মর্যাদা দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি জাতির পিতার মর্যাদা দিতে দোষের কিছু নাই।’’ ৪৭এ দেশ বিভাগের সোনালী  স্বপ্ন ছিল- ইসলামী আদর্শে শাসন তন্ত্র প্রণয়ন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মুক্তির  স্বপ্ন। কিন্তু পাকিক্স্তান প্রতিষ্ঠার পর তার কোনটাই পূর্ব পাকিক্স্তানে প্রতিফলিত হয় নি, সব কিছুতেই ছিল বৈষম্য। পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ সে বৈষম্য দূর করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী শাসনামলে ঐ বৈষম্য এবং ধর্মীয় অত্যাচার এত বেশি ভয়াবহ হয়ে পড়েছিল যে, বাঙালির  স্বাধীনতা ছাড়া অন্যপথ ছিলনা। ধর্মীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার ছায়ায় ধর্মব্যবসায়ীদের উত্থানও পাকিক্স্তান ভাগ হওয়ার আর এক কারণ।

“যে দিন আমরা প্রথম বুঝে উঠেছিলাম-ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা শোষণ ও শৃক্সখল মোচনের,  স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মবিকাশের, উপায় মোটেই নয়। সে দিন প্রথম আমরা ভ্রান্তি ও পাকিস্তান মোহাচ্ছন্নতার ওপর বিজয়ী হয়েছিলাম।” (সৈয়দ শামসুল হক। বিজয়ের বার্তা দিবসের চেতনা, দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৬ ডিসেম্বর-২০০৫।) সে মোহাচ্ছন্নতার ফলেই ধর্মের নামে শাসন শোষণ বাঙালির উপর অন্যায় অত্যাচার রাজনৈতিক মুক্তি হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে দু’জাতির দু’টি ভূ-খণ্ড চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল। শুধু সময় আর সঠিক নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। হাজার বছরের (প্রায় দুই হাজার) বীর বাঙালি তাঁদের জাতীয়তার ঐক্যে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে,  স্বাধীনতার ঐক্যতানে। কবির কবিতা যেন তখন সকলের মুখেই উচ্চারিত হয় “হিন্দু না ওরা মুসলিম, ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন?’’ বাঙালি এখন  স্বাধীনতার জন্য, সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত। সে সংগ্রামশীল প্রস্তুত জনতার মাঝে ঢেউ তুলেছেন বঙ্গবন্ধু, সে ঢেউয়ে পাকিক্স্তান ভেঙ্গে তছ্নছ হয়ে যায়, বাঙালির  স্বপ্ন পূরণ হয়। 

যে বাঙালি মাত্র কিছু দিন আগেও ধর্মনিয়ে মাতামাতি করে একে অন্যের রক্ত ঝড়াতো নিজে ডুবতো অন্যকে ডুবাতো, সেই প্রায় ডুবে যাওয়া বাঙালিকে হ্যামেলিনের বাঁশীওয়ালার মত তাঁর কথার বাঁশী বাঁজিয়ে কাছে টেনে নিলেন, বাঙালির মুক্তি তরীর কান্ডারি হয়ে হাল ধরলেন শক্ত হাতে। ধর্মান্ধ ব্যবসায়ীরা বাঙালির গণ জাগরণ মেনে নিতে পারেনি। তারা এ জাগরণের পথ বন্ধ করার নানা অপচেষ্টা করতে থাকে। সে সাথে বঙ্গবন্ধুর নামে ধর্মীয় কুৎসা রটনা করতে থাকে। যে জামাত শিবিরের সদস্যরা বাঙালি পরিচয়ে ঘৃণাবোধ করতো, তারা আজ  স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশী’ হয়েছে। সেই জামাত শিবিরের বাংলাদেশী পালে হাওয়া দিতে এখন মুক্তিযোদ্ধাসহ তাঁদের সন্তানেরা দিতে ভুল করে না। 

জামাত শিবির আজ বাংলাদেশের বাংলাদেশী নাগরিক-চিন্তা চেতনায় পাকিক্স্তানি, তারা আজও  স্বপ্ন দেখে ইয়াহিয়ার  স্বপ্ন বাক্স্তবায়নের, ভাবে উর্দূখানদানি ভাষা, বাংলা ঘৃনিত। পাকিক্স্তানি  স্বপ্ন বিলাসীরা ধর্মের অনুশাসন মানেনা, ধর্মকে নিজেদের  স্বার্থের প্রয়োজনে যেমন খুশি সাজিয়ে নাচায়, এরা মিথ্যার সারথী। মিথ্যাকে এরা প্রচারে প্রচারে সত্য বলে চালাতে উক্স্তাদ, অধর্মকে এরা ধর্মের অপব্যাখায় ধর্মবলে চালাতে জানে। শুধু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নয়, ব্যক্তি  স্বার্থে এরা ধর্মকে, ধর্মের সুস্পষ্ট নিদের্শকে এরা বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত।  স্বার্থের প্রয়োজনে ধর্ম অধর্ম সব এদের কাছে জায়েজ হয়ে যায়। এরা মুখে নারী নেতৃত্ব হারাম বললেও নারীর ছায়াতলে লালিত পালিত হয়, ক্ষমতার লোভে এদের লোভী চোখ চক্চক্ করে, নির্বাচনে যাওয়ার লোভে এরা তাদেও নিজস্ব রাজনৈতিক সংবিধান থেকে আল্লাহ্ ও রাসুল (সঃ) এর নাম ও তাঁদের আদেশ-নির্দেশ বাদ দিতেও কুণ্ঠিত হয়না। তা দেখা গেল ২০০৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। একেই বলে ভূতের মুখে রাম নাম। এদের ধর্মব্যবসার কূট কৌশল বাঙালির আজ আর বুঝতে বাকী নাই।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে ভারত জননীর ‘বঙ্গভূমি’র শাসন বাঙালি কখনোই করতে পারেনি। চৌর্য, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, পাঠান, মুগল, ইংরেজদের কেউই বাঙালি ছিল না এবং বাংলা ভাষার ব্যবহার তাদের শাসনামলে রাজ কাজে গৃহিত হতো না। বাঙালি জাতির এবং বাংলা ভাষার সে পরাধীনতার গ্লানি দূর হলো, বাঙালির আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক মুক্তি  এলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঠিক নেতৃত্বের কারণে। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতার মর্যাদা দিলো। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন, তাঁর বঙ্গ সন্তানদের সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে। ধর্মীয় সমধিকার ছিল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্মগুলোর অন্যতম। এ কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ডুবে যাওয়া সক্স্তানদের আত্ম মর্যাদা নিয়ে বাঁচার প্রেরণা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্ম নিরপেক্ষতা, বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সঞ্চিত পূণ্যের ফসল। তাঁর রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ, রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্ম নিরপেক্ষ এ সকল বিষয়ে তিনি তাঁর পূর্বতন বাঙালি মহাপুরুষদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন- ‘আমরা হিন্দু মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য আমরা বাঙালী’ এ আদর্শ নিয়েই বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মধ্য দিয়েই বাঙালির মুক্তির  স্বপ্ন দেখেন।

 বাংলাদেশকে বাঙালির আদর্শ রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠার সবরকম ব্যবস্থা করেন। যত দিন তিনি পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন বাংলার আলো-বাতাস গ্রহণ করেছেন, ততদিন তিনি মহাকবির মত বাঙালির বীর গাঁথায় বাণীরূপ দিয়েছেন। বীরত্বের প্রেমিক, মানুষে মানুষে প্রেম প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তাঁর দ্বারা কোন ধর্মের ক্ষতি হয় নি, অবমাননা হয় নি। শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর একমাত্র ব্রত। মানুষের জীবনে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা লক্ষ্য করেই তিনি ধর্মের সঠিক ব্যবহার করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান করেছেন। সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে দেশের মানুষকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

 বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সময় একজন কবি হযরত মুহাম্মদ (স:) কে নিয়ে ব্যঙ্গ করাতে কবিকে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেয়া হয়। এটাও কি বঙ্গবন্ধুর ইসলাম বিরোধি কাজ? এরপরও  তথাকোথিত ‘বাংলাদেশী’রা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ধর্মীয় বিষ বাষ্প ছড়ায়। কেউ জেনে, কেউবা নাজেনে। না জানা অপরাধ নয়। যারা জানেনা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ধর্মীয় কার্যক্রম, তাঁর চিন্তা-চেতনা সম্বন্ধে- তাঁদের জানাতে হবে এবং এর দায়-দায়িত্ব আওয়ামি পরিবারকেই নিতে হবে, এখন সময় এসেছে এ পথে এগিয়ে যাওয়ার