• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০১৯, ০৮:৫১ এএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ২০, ২০১৯, ০৯:০৭ এএম

পা হারানো একজন অদম্য আবুল কালাম

রিকু আমির  
পা হারানো একজন অদম্য আবুল কালাম
আবুল কালাম -ছবি : জাগরণ

৩৭ বছর আগে মারাত্মক জীবাণু দিয়ে আবুল কালামের বাঁ পা সংক্রমিত হবার পর তা উরু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছিল। ধীরে ধীরে ডান পায়েও জীবাণু বাসা বেঁধে ফেলেছিল। ফলে ডান পায়ের সব আঙুল কেটে ফেলতে হয়। সেই থেকে রাজমিস্ত্রি আবুল কালাম হয়ে উঠেন কঠোর পরিশ্রমী কাঠমিস্ত্রি। এ দিয়েই ৬ সদস্যের তার পরিবারকে আগলে রেখেছেন এতোটা বছর। সঙ্গে ছিল দুই সন্তান হারানোর শোক।

ঢাকার মহাখালীর সাততলা বস্তির কাছেই বেশকিছু কাঠজাত সামগ্রী প্রস্তুতের দোকানপাট রয়েছে। সেখানে মো. দুলালের দোকানে আবুল কালাম কাজ করেন। ওখানেই তার সঙ্গে প্রতিবেদকের প্রথম দেখা। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে কালাম তখন বেশ মনযোগ সহকারে হাতুড়ি-বাটাল দিয়ে চেয়ারের পায়া প্রস্তুত করছিলেন। মাঝেমাঝে স্টিলের টেপ দিয়ে টুকরো কাঠ মাপ শেষে ডান কানে গেঁথে রাখা সবুজ রঙের কাঠপেন্সিল দিয়ে চিহ্নিত করছিলেন তিনি।

কিভাবে পা হারা হলেন?- প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাসসহ উত্তর আসে- এরশাদের শাসনামলে গ্রামের বাড়ি শেরপুর সদরে থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন আবুল কালাম। একদিন দুপুরে শরীর খারাপ লাগলে বাড়ি ফিরে ঘুমান। পরদিন সকালে ঘুম থেকে বুঝতে পারেন তার বাঁ পা নড়ানো যাচ্ছে না। সেদিন আর কাজে যাননি। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পর টের পান বাঁ পায়ে হালকা ব্যথা হচ্ছে। দিনদিন এ ব্যথা বৃদ্ধি হতে থাকে। একপর্যায়ে তার বাঁ পা অচল হয়ে পড়ে। একইসাথে পায়ের আঙুলের অংশে কালো ছোপ ছোপ দাগ পড়তে থাকে। সে অংশগুলোয় কোনো অনুভূতি পেতেন না তিনি। দিনদিন তীব্র ব্যথার সঙ্গে এসব কালো অংশ বাড়তে থাকে। দাগ বাড়তে বাড়তে বাঁ পায়ের আঙুল থেকে দেহের উপরের দিকে থেকে উঠে আসে।

সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে গ্রামের চিকিৎসক, পানিপড়া, ঝাড়ফুঁক- কোনো কিছুই বাদ রাখেননি আবুল কালাম। তিনি বলেন, পরে ময়মনসিংহ মেডিকেলের ডাক্তার দেখাই। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বলল- আমার মারাত্মক ইনফেকশন হয়েছে। এটা কমানো সম্ভব না, পায়ের অনেক উপরিভাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। পা কেটে না ফেললে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়বে।

সেসময় অপারেশন করার মত শারীরিক অবস্থাও ছিল না তার। আবুল কালাম বলেন, দুইমাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। অনেক ওষুধপাতি, ভালা খাওন খাওয়ার পরে তিন-চার মাসের মাথায় ডাক্তার অপারেশন করে পা কেটে ফেলে। ডান পায়ের আঙ্গুলও কাটতে হয়।

বাড়ি ফিরে আবুল কালাম চেষ্টা করলেন তার সেই রাজমিস্ত্রির পেশায় ফিরতে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তা করা কষ্টদায়ক হয়ে পড়ে। পরে পেশা পরিবর্তন করে গ্রামে কাঠমিস্ত্রির কাজ শুরু করলেন। প্রথমে রাজমিস্ত্রিদের সঙ্গে স্ক্রাচে ভর করে কাজ শিখতে যেতেন। একসময় কাজে দক্ষ হয়ে উঠলে আবুল কালাম গ্রামে চেয়ার-টেবিল-খাটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও গৃহ নির্মাণের কাজ করতে লাগলেন।

তিনি বলেন, কিন্তু ইনকাম অনেক কম হইতো। বউপোলাপান নিয়া চলতে পারতাম না। নিজের জমিজিরাত আছিলো না, থাকতাম ভাঙ্গা একটা ঘরে। ২০০২ সালে ঢাকায় আইসা পরি ভাল ইনকামের জন্য।

সেই ২০০২ থেকে আবুল কালাম কাজ শুরু করেন মহাখালীর সাততলা বস্তি এলাকায়। এখনও সেখানেই আছেন। এ এলাকায় তার আত্মীয়-স্বজনও আছেন। এখানে রয়েছে তার স্ত্রী জোৎস্না বেগম, ছেলে টুটুল (২২), ফাহিম (১৪)। দুই মেয়ে নাসিমা ও ফাহিমা সংসার জীবন-যাপন করছেন। তবে এসব সন্তানের আগে তার এক ছেলে ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় শিশু বয়সে ও এক মেয়ে ক্যান্সারে মারা যান পরিণত বয়সে।

আবুল বলেন, বাচ্চাগুলো মরে যাওয়া, আমার পা চলে যাওয়া, সহায় সম্পত্তি না থাকা আমাকে অনেক কষ্ট দিতো। এখনও দেয়। কোথাও যাই নাই সাহায্য চাইতে, ভিক্ষা করতে। এই কাঠমিস্ত্রির কাম সেই যে শুরু করছিলাম, আইজও করতাসি। ঢাকায় আইসা মেয়ে দুইটারে গার্মেন্টসে দিসিলাম। টুটুলকে কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখায়ে অন্য জায়গায় কাজে দিয়ে দিছি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আবুল বলেন, বয়স তো কম হয় নাই, ৬০ এর উপরে চলে। গ্রামে ঘর নাই, সম্পদ নাই। এইটাই আমার বড় কষ্টের জায়গা। গায়ে গতরে কাজ কইরা প্রতিদিন কামাই, প্রতিদিন খাই। জমানোর মতন টাকা হাতে থাকে না। কী আর করমু, এই কাঠমিস্ত্রিগিরি কইরাই বাকি জীবনটা পার করমু।

আরএম/একেএস
 

আরও পড়ুন