• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৬, ২০১৯, ০৬:১৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৬, ২০১৯, ০৮:০৪ পিএম

সবার প্রিয় ‘হানিফ স্যার’

মাহমুদুল হাসান বাপ্পি
সবার প্রিয় ‘হানিফ স্যার’
আবূ হানিফ

সন্ধ্যা হলেই চারদিকে শুনশান নিরবতা নেমে আসে।  আকাশে নক্ষত্ররাজি মিটমিট করে ,অন্ধকারের ভেতর থেকে আলোর ঝলকানির মতো চোখে লাগে।ঘন অন্ধকারের মধ্যে কোনো কোনো জায়গায় আলোর ঝলকানি লাগলে পাথর খণ্ডের মতো জমাট অন্ধকার তাতে নড়ে না।  ঘরময় অন্ধকার লাগে অন্ধকারের আলোয় যতদূর চোখ যায়। অন্ধকার পেরিয়ে শহুরে জীবনে যখন রাত্রি নেমে আসে। বস্তু পাড়ায় ব্যস্ততা বাড়ে আর সব ধীর হয়ে আসে। সকাল হলে স্কুলের ছাত্ররা পাখির মতো কিচিরমিরি করে স্কুলে আসে শিক্ষা গ্রহণ করে চলে যায়।

বলছি চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানাধীন মধুপুর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা। ২০০৯ সালে এই বিদ্যালয়ে আসেন আবূ হানিফ নামে এক শিক্ষক সবার কাছে যিনি পরিচিত হানিফ স্যার নামে। শুনশান নিরবতা আর ভয়ের আড্ডাখানা হয়ে পড়া সেই স্কুলকে তিনি বদলে দেন 'জাদুর কাঠি'র মতো করে। 

একটা সময় যেই স্কুলের পাশ দিয়ে যেতেও ভয় করতো মফস্বলের সেই ছেলে- মেয়েদের। সেই স্কুল এখন হিমশিম খায় ছাত্র-ছাত্রীদের জায়গা দিতে। যার সিংহভাগ কৃতিত্বই একজনের ভয়কে জয় করা ‘হানিফ স্যারে’র।অনেকটা সিনেমার মতোই, যার চিত্রনাট্যের সবটা জুড়ে আছেন সবার প্রিয় ওই শিক্ষক। 

শিক্ষার আলো মশাল দিয়ে তার চারপাশ আলোকিত করতে যিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নামে যেই অভিযোগের তীর, সেসবকে রূপান্তরিত করেছেন ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট করা যাবে। আবু হানিফ, যে বছর মধুপুরের ওই স্কুলে যোগ দেন তার পরের বছর অর্থাৎ ২০১০ সালে এই স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১০ জন শিক্ষার্থী, পাশ করেন তাদের সবাই।

২০১৯ ইং সনের প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রথম সারিতে দ্বিতীয় জন আবূ হানিফ। 

আর গত তিন বছরে ওই স্কুল থেকে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত সংখ্যাটাও এর চেয়ে বেশি। ২০১৬ সালে মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এ প্লাস পেয়েছেন ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৪ জন আর সর্বশেষ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ১২ জন। আর এইসব বারই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন আবূ হানিফ। তার দিন রাতের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসলই এই ফলাফল বলে মনে করেন সবাই।

শুধু ফলাফল কোনো শিক্ষকের মানদণ্ড নয়, এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারেন কেউ কেউ। তাদের শিক্ষার্থীদের জনপ্রিয়তার সাক্ষী হবার আমন্ত্রণের পাশাপাশি আরও একটি ব্যাপার জানিয়ে রাখা যায়, কেবল পড়াশুনাই নয় খেলাধুলায়ও হানিফ স্যার মধুপুর স্কুলকে তুলেছেন সফলতার স্বর্ণশিখরে।

সেই মফস্বলের মেয়েদের কেবল ফুটবলই খেলাননি। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পেরিয়ে পৌঁছেছেন বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত। তার তত্ত্বাবধানে শত বাঁধা ডিঙিয়ে ২০১৩ সালে মধুপুর স্কুলের মেয়েরা জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়ে পৌঁছেছিল বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত।

ক’দিন আগে এই স্কুল ছাড়তে চেয়েছিলেন আবূ হানিফ। অভিভাবকরা তাতে মনক্ষুন্ন। শিক্ষার্থীরা তো বটেই, অনুরোধ করেন অভিভাকেরাও। এক পর্যায়ে তো কান্নাকাটির উপক্রম, শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি তার।

এমন হানিফ স্যারদের সংখ্যা আমাদের চারপাশে অনেক, শুদ্ধতা ছড়িয়ে দিতে যারা নিজেদের জীবন ব্যয় করেন। ভালোবাসা বিলিয়ে আপন হয়ে যান শিক্ষার্থীদের কাছে, নির্দিধায় দাঁড়িয়ে যান স্রোতের বিপরীতে। তাদের হাতের আলোর মশালটা নিভে গেলেই তো অন্ধকার নেমে আসবে এই জাতির। তা যদি না চাই আমরা, তবে তাদের সামনে নিয়ে আসাটা জরুরি।

এমএইচবি