• ঢাকা
  • শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ১৮, ২০২০, ০৭:১৫ এএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১৮, ২০২০, ০৩:৩৪ পিএম

খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু : শতবর্ষী মুক্তির মহানায়কের কথা

এস এম সাব্বির খান
খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু : শতবর্ষী মুক্তির মহানায়কের কথা

সাল ১৯৩৮: প্রথম যেদিন দাবি আদায়ে সরব হলেন 'বাংলার রাজা বাঘ'

খোকা নামেই ডাকতো সবাই বাড়িতে। তখনও স্কুলের গণ্ডি পেরোননি। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। শেরে বাংলা গেলেন পাবলিক হল দেখতে আর সোহরাওয়ার্দী গেলেন মিশন স্কুল পরিদর্শনে। মন্ত্রী মহোদয় পরিদর্শন শেষে ডাক বাংলোর দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একদল ছাত্র এসে হঠাৎ তাঁদের পথ আগলে দাঁড়ালো। ছাত্রদের এমন কাণ্ড দেখে হেড মাস্টার সাহেব রীতিমতো ভড়কে গেলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, 'এই তোমরা কী করছো! রাস্তা ছেড়ে দাও'। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় ছাত্রদের কথা শুনতে চাইলেন। তখন ছাত্রদের মধ্য থেকে একটি ছাত্র এগিয়ে এসে বললো তাদের স্কুলের সমস্যার কথা। জোরাল কন্ঠে জানালো ছাত্রদের দাবির কথা, চাইলো প্রতিকার। এমনি এক দাবি আদায়ের মধ্য দিয়ে যার জীবনযাত্রা শুরু সেই ছাত্র আর কেউ নন, তিনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।তখন তিনি গোপালগঞ্জ মথুরানাথ মিশনারি হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।

১৯৪৩ সালের মন্বন্তর: এক মানবতাবাদীর আত্মপ্রকাশ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। বাংলায় তখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছে। ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অনেকেই মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার ভিক্ষা করে খাচ্ছে। ভাতের ফেন খুঁজে খাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন মন্ত্রী পরিষদের সদস্য। পরে তিনি সারাদেশে লঙ্গরখানা খোলেন দুস্থ, অভাবগ্রস্ত মানুষের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দিতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন সারাদিন অসহায় মানুষর জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন আর রাতে এসে পার্টি অফিসের বেঞ্চে ঘুমাতেন। মানুষের জন্য সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মানুষের দ্বারে দ্বারে হেঁটেছেন, একমুঠো অন্নের জোগান দিতে তার ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে তুলে দিতে। বহু রাত সেই সব দুস্থ মানুষের জন্যে সাধ্যের সীমা অতিক্রম করতে না পারার ক্ষোভে, কষ্টে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত শক্ত কাঠের বেঞ্চে ঠুকে ঠুকে কেঁদেছেন তিনি। এভাবেই তিনি সবসময় বাংলার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

১৯৪৬ এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা: অসাম্প্রদায়িকতার ধ্বজাধারী সাম্যবাদী শেখ মুজিব

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতার বেকার হোস্টেলে থাকাকালীন শুরু হয়েছিল ইতিহাসের আলোচিত সেই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। সেই দাঙ্গার প্রভাব ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্রদের মাঝে সাম্প্রদায়িক বৈরীতা সৃষ্টি সম্ভাবনাকে অসামান্য দক্ষতায় প্রতিহত করে নিজের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্যবাদীতার পরিচয় প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু। পরে স্থানীয় পর্যায়ে মূল দাঙ্গা প্রতিরোধেও গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। যার প্রেক্ষিতে হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান সর্বস্তরের ছাত্রদের নিরঙ্কুশ সমর্থন অর্জন করে কলেজ ছাত্র সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নেতৃত্বের গুণে এভাবেই মানুষের মাঝে ভালোবাসা আর আস্থার প্রতিশব্দ হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে এই সময়টি ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভারতবর্ষের রাজনীতির অবিস্মরণীয় সব ইতিহাস, কলকাতার তালতলায় অবস্থিত স্মিথ লেনের এই বেকার হোস্টেলকে সমৃদ্ধ করেছে। ইতিহাসের রাজসাক্ষী সেই বেকার হোস্টেল আরও বেশি স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছে তার বুকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো কীর্তিমানকে লালন করে। সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালির স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বেকার হোস্টেলের সেই ২৪ নম্বর কক্ষটিকে পরবর্তীতে শেখ মুজিব স্মৃতি যাদুঘরে রূপ দেয়া হয়।

শিল্পীর অঙ্কনে তরুণ শেখ মুজিব- সংগ্রামের নোটবুক

১৯৪৭-১৯৫২: বাঙালির মহাকাব্যিক ইতিহাস রচনায় মহানায়কের উত্থান

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এতো এতো প্রদেশ থাকতে শোষকদের মস্তক পীড়া ছিল কেবল এই বাংলা আর বাঙালি নিয়ে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তথাকথিত উচ্চ শ্রেণি জিন্নাহর এ দাবি বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলেও মানতে পারেননি বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছাত্রদের এক সভায় দেয়া বক্তৃতায় প্রথম জিন্নাহর অবান্তর এই ঘোষণার বিরুদ্ধে দুঃসাহসী প্রতিবাদের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঝরান বজ্রকন্ঠের অধিকারী শেখ মুজিব। দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবি। এই দাবি আদায়ে সরকারের উপর চাপ অব্যাহত রাখতে পরবর্তীতে আরও কর্মসূচির ঘোষণা দেন শেখ মুজিব। যার মাঝে অন্যতম ছিল আম্রকাননের বৈঠকের আয়োজন এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভাষার দাবি নিয়ে রাজপথে নামা। কিন্তু তার আগেই সরকার বিরোধী আন্দোলনের 'হোতা' হিসেবে গ্রেফতার হন মুজিব। কিন্তু তার শুরু করা ভাষার লড়াই চলতে থাকে। মুজিবসহ অন্যান্য ছাত্রনেতাদের গ্রেফতারে আরও বেগবান হয় সেই আন্দোলন। 

এরই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলন ঘনীভূত হতে থাকে এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শোষক গোষ্ঠীর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা রাজপথে নামে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে। সেই মিছিলের উপর শোষকের সশস্ত্র বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালালে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকেই। মায়ের ভাষার জন্য বীর বাঙালির এই আত্মাহুতিকে ব্যর্থ হতে না নেয়ার দৃঢ় শপথ নেন কারারুদ্ধ মুজিব। রচিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পটভূমি।

সূত্র- সংগ্রামের নোটবুক

১৯৬৬ সালের আন্দোলন: মুক্তিকামী বাঙালির নেতা শেখ মুজিব ও মুক্তিরসনদ ৬ দফা  

১৯৫২-৬৬, এই সময়ের মাঝে নানা ঘটনা প্রবাহে তারুণ্য পেরিয়ে রাজপথ মাড়িয়ে বিপ্লবের মহামঞ্চে পদার্পণ করেন বাঙালির নেতা শেখ মুজিব। বারংবার কারাবন্দি, শোষকের নির্যাতন ও নিপীড়নে সময়ের সঙ্গে এক দুর্বার বিপ্লবী রূপে আবির্ভূত হন মুক্তির মহানায়ক। তার নেতৃত্বে আসে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট পাল্টে দেয়া আরও একটি লগ্ন। শুরু হয় ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছিল এই ৬ দফা। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনি কমিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে এবং বাঙালি জাতির মুক্তির নেপথ্যে এই ৬ দফার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারা বাংলা সফর শুরু করেন। এ সময় তাঁকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বারবার গ্রেফতার করা হয়। শুধু এ বছরেই তিনি ৩ মাসে ৮ বার গ্রেফতার হন। কিন্তু মহাপ্রলয়ের পথ কে কবে রুখতে পেরেছে? কেই বা থমকে দিতে পেরেছে বিধ্বংসী ঝঙ্কার ঝটা! মুজিব নামের সেই মহাপ্রলয়ও রুখতে পারেনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। আর শেষ পর্যন্ত সেই প্রলয়েই পতন ঘটে লঙ্কার রাবণরুপী স্বৈরাচারী শাসকের। 

১৯৬৮ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র চেয়ে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে তৎকালীন পশ্চিমা সরকার ১৯৬৪ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামী করে মোট ৩৫ জন বাঙালি রাজনৈতিক নেতা, সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা দায়ের করে। যা ঐতিহাসিক 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' হিসেবে পরিচিত। ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে আবার ওই জেলগেট থেকেই গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে অবরুদ্ধ করা হয়। অতঃপর ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শুরু হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদের বিচারকার্য। পাকিস্তান সরকার জানতো, এক মুজিবের পতনেই থামানো সম্ভব বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম আর স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান। কারণ তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল; মুজিব মানেই দ্রোহের প্রলয়, মুজিব মানেই আগামীর বাংলাদেশ।

মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

শেখ মুজিবুর রহমান জেলে রাজবন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি পূর্ববর্তী ৬ দফাসহ ছাত্রাদের ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সে সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের গড়ে তোলা দুর্বার আন্দোলন পরিণত হয় আপামর বাঙালির অপ্রতিরোধ্য গণআন্দোলনে। যার ফলশ্রুতিতে জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে কে্দ্রীয় সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। 

২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-জনতার সংবর্ধনা সমাবেশে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মুক্তির মহারণের অদম্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙ্গালি জাতিসত্ত্বার একচ্ছত্র প্রতিনিধি হিসেবে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৬৯ সাল: বাংলাদেশ নামকরণ

৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলা-এর নামকরণ করেন 'বাংলাদেশ'। তিনি বলেন, একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে 'বাংলা' কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।... একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। .. জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম 'পূর্ব পাকিস্তান' এর পরিবর্তে শুধুমাত্র 'বাংলাদেশ'। 

স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বাঙালির সংগ্রাম যে সুনিশ্চিত সাফল্য অর্জন করবে, একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী রাজনেতা হিসেবে সে ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এই মুক্তির মহানায়ক, তারই জীবন্ত সাক্ষী আজকের বাংলাদেশ।

১৯৭০ সাল: জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচন

৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় মুক্তিকামী বাঙালির প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানের নির্বাচনী জনসভায় বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান। ১৭ অক্টোবর আসন্ন নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে 'নৌকা প্রতীক' নির্ধারন করেন বঙ্গবন্ধু।

১২ নভেম্বর ১৯৭০, ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় গোর্কির আঘাতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। এতে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের প্রাণহানী ঘটে। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রস্তুতির কাজ এক পাশে ঠেলে ছুটে যান তার বিপর্যস্ত উপকূলবাসীর কাছে। সামর্থ্যের সবটুকু নিঙড়ে দিতে নিবেদিত হন সর্বহারা অসহায় মানুষের পাশে। 

পরবর্তীতে ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসানের মধ্যে ১৬৭ টি আসানে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ টি আসানের মধ্যে ২৩৩টি আসনে জয়যুক্ত হয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। বাংলার জনগণ ৭০-এর ঐতিহাসিক সেই ভোট বিপ্লবের মধ্যদিয়ে জাতির জনকের প্রতি নিজেদের অকুন্ঠ সমর্থন ঘোষণা করে। বিশ্ববাসী সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে, বাঙালির নন্দিত রাজনেতা শেখ মুজিবের সত্যায়ণ হয় এক অবিসংবাদিত জননেতা হিসেবে।

১৯৭১ সাল: মহানায়কের মহাকাব্যিক ভাষণে মুক্তির মহামন্ত্র

মুক্তিকামী বাঙালি জাতির সার্বভৌমত্ব অর্জনের লড়াইয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের অনবদ্য নেতৃত্বের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছিলেন শেখ মুজিব। নিজের ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দ্বারা বহু আগেই নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। তবে 'বঙ্গবন্ধু' যে কোনো সীমিত সত্ত্বা নন, তিনি যে সারা বিশ্বের বিস্ময়। একজন রাজনৈতিক নেতা রুপে বিশ্বমঞ্চে মহানায়কচিত চরিত্র হিসেবে যে তিনি সুযোগ্যজন; এবার যেন সেই অকাট্য তত্ত্ব সত্য প্রমাণে আবির্ভূত হলেন বিশ্ব রাজনীতির এই কালজয়ী মহাকবি।

৩ জানুয়ারি রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ পরিচালনা করেন। ২৪ জানুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেন। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ঢাকায় জাতীয় পরিষদর বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দিয়ে দুই প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের প্রতি ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। ১৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে ভুট্টোর এই দাবির তীব্র সমালোচনা করে বলেন- "ভুট্টো সাহেবের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক..ক্ষমতা একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ক্ষমতার মালিক এখন পূর্ব বাংলার জনগণ।" এরই প্রেক্ষিতে ১ মার্চ ইয়াহিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত ঘোষণা দিলে- সারা বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় উঠে। 

এমন নিষ্ঠুরভাবে গণমানুষের গনতান্ত্রিক অধিকার হরণ, শোষকের বিকৃত নীতির প্রদর্শন আর বঞ্চিত মানুষের হাহাকারে সহন আর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গর্জে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। 

৭ মার্চ ১৯৭১, রেসকোর্সের ঐতিহাসিক জনসভাস্থল পরিণত হয় জনসমুদ্রে। নেতার নির্দেশনা পেতে ময়দানে নামে জনতার ঢল। সেদিনের সেই ঐতিহাসিক জনসভার দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। প্রতীক্ষার পালা শেষে মহামুক্তির সেই মহামঞ্চে পদার্পণ ঘটে বঙ্গবন্ধুর। গণমানুষের মুক্তির তরে, বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রতিষ্ঠায় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক দফা দাবি আদায়ের ঘোষণায় গর্জে ওঠেন বজ্রকন্ঠী শেখ মুজিব। মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব অর্জনে, দেশের মাটি দখলদার মুক্ত করার ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, 'আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায় রাখতে পারবে না......এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম......জয় বাংলা।' 

অবিসংবাদিত মহানায়কের সেই মহাকাব্যিক ভাষণে, মুক্তির মহামন্ত্র হয়ে বঙ্গোপসাগরের অতল গহ্বর হতে হিমালয় পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয় বীর বাঙালির রণহুঙ্কার- 'জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু...বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো...'।

২৫-২৬ মার্চ ১৯৭১: অপারেশন সার্চ লাইট ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

বাঙালির মুক্তির আন্দোলনকে স্তিমিত করতে ২৫ মার্চের (দিবাগত রাত, ২৬ মার্চ) ভয়াল কালরাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পরিচালনা করে 'অপারেশন সার্চ লাইট' নামে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ। নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালির উপর ক্ষুধার্ত হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে তারা। মানবতাকে লাঞ্ছিত করে চালানো হয় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত গণহত্যা। আর সে রাতেই গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। কিন্তু নিজের মৃত্যু সুনিশ্চিত মেনে নিয়ে কাপুরুষের মত গা ঢাকা দেননি মহাবীর। বরং বীরদর্পে নিজের কর্তব্যটুকু সম্পন্ন করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর লেখা স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র- ছবি: সংগৃহিত

২৫ মার্চ দিবাগত রাত (২৬ মার্চ) ১২টা ২০ মিনিট। একতি চিরকুটে জাতির পিতা তার বার্তা ঘোষণা করেন বাংলার আপামর জনতার উদ্দেশে। তিনি লেখেন, "এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে......কোনো আপোষ নাই। জয় আমাদের হবেই। পবত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করো। সকল আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লোকদের কাছে এ সংবা পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।"

পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে পাঠ করেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান।

১৯৭২ সাল: বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপি রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। লাখো শহীদের রক্তে পৃথিবীর বুকে অংকিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র। এই পুরোটা সময় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে কারারুদ্ধ ছিলেন।

অবশেষে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেদিনই বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার উদ্দেশ্যে প্রথমে লন্ডন পাঠানো হয়। ৯ জানুয়ারি লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ হয়। লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি.ভি.গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। 

১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রথম পা রাখেন মুক্তির মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, কোটি বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ঢাকায় পৌছালে তাঁকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে বাংলাদেশের মানুষ। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে লাখো জনতার সমাবেশে অশ্রুসিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ভাষণ দেন শেখ মুজিব। আর সেখানেই বঙ্গবন্ধু থেকে বাংলা ও বাঙালির এই মুক্তির কাণ্ডারিকে আপামর জনতা 'জাতির পিতা' হিসেবে বিরল সম্মানে ভূষিত করে। বাংলার আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনি তোলে কোটি বাঙালির জয়ধ্বনি, 'তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব...স্বাধীন দেশের জাতির পিতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব...জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু...'।

যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, যত দিন বাঙালি জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব থাকবে; ততোদিন অমরত্বের সুধায় জীবন্ত রবে জাতির জনকের নাম। সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র আর তার স্থপতি- সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ যেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম যুগলবন্দী। খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা। বাংলার এই মুক্তিকামী মহান নেতার পরিচয় প্রতিটি বাঙালির সত্ত্বায় সদা জাগ্রত থাকুক এই সত্যে- 'আমার প্রথম আমার শেষ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ'।

সম্পাদনা সহযোগী- রিয়াজুল ইসলাম শুভ