• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০১৯, ০৮:১৪ এএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ৭, ২০১৯, ১২:০৯ পিএম

মহাবিপাকে কিডনি বিকল রোগীরা

রিকু আমির
মহাবিপাকে কিডনি বিকল রোগীরা
রাজধানীর একটি হাসপাতালের ডায়ালাইসিস সেবা কার্যক্রম

বি শে ষ  প্র তি বে দ ন

............

দেশে নানা কারণে কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই সুযোগে অধিক মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার বানিয়ে ইচ্ছে মতো কিডনির রোগীর ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ফলে ডায়ালাইসিস ও এর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে বেশিরভাগ রোগী ও রোগীর পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। এমতাবস্থায় কিডনি সংক্রান্ত রোগের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদির দামের লাগাম টানতে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ঢাকার জাতীয় কিডনি ইন্সটিটিউটসহ বেশ কিছু সরকারি হাসপাতালে প্রতিবার ৪০০ টাকায় ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা, লোভী কর্মচারীদের কারণে সরকারি হাসপাতাল থেকে ৪০০ টাকার ডায়ালাইসিস পেতে কমপক্ষে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় বলে অভিযোগের কথা শোনা যায়। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস খুবই ব্যয়বহুল। এমনকি ৯০ শতাংশ তুলনামূলক সামর্থবানরা সর্বোচ্চ তিন বছর চিকিৎসা চালানোর পর ডায়ালাইসিস বন্ধ করে দেন অর্থের অভাবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকারের নজরদারির অভাব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা। কর্তৃপক্ষ সহানুভূতিশীল হয়ে নজর দিলেই ডায়ালাইসিস সেবার মূল্য আরও কমানো সম্ভব। যার সুফল পাবেন দেশের সাধারণ রোগীরা।

কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসে আইভি সেট ও এভি ফিস্টুলা নিডেল সেট অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশে একমাত্র জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড এ সেট উৎপাদন করে। এ প্রতিষ্ঠান নিডেল সেট বিক্রি করে নির্ধারিত মূল্য ২৫০ টাকারও বেশি। এটা ভারতে রফতানি করা হয় মাত্র ১০০ টাকার কিছু বেশি মূল্যে। একইভাবে রক্ত বাড়াতে কিডনি বিকল রোগীদের প্রতি সপ্তাহে ০.৫ মিলি লিটারের রিকমভিন্যাট এরিথ্রোপয়েটিন ইনজেকশন নিতে হয়। যার বাজার মূল্য ২ হাজার টাকারও বেশি। দেশের বেশ কয়েকটি কোম্পানি এ ওষুধ উৎপাদন করলেও উৎপাদন মূল্য থেকে ৪ থেকে ৫ গুণ দামে বিক্রি করে যাচ্ছে। ডায়ালাইসিস চলাকালে রোগীর শিরায় ‘হেপারিন সোডিয়াম’ ইনজেকশন দিতে হয়। এটির দাম ৩৫০-৩৮০ টাকা। অথচ উৎপাদন ব্যয় অনুযায়ী এটির দাম ১৩০ টাকার বেশি হওয়া উচিৎ নয়।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রতিবার হেমোডায়ালাইসিসের খরচ পড়ে ২৩০০ থেকে ৯ হাজার টাকা। একজন ক্রনিক কিডনি রোগীকে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করাতে হয়। সে হিসাবে- শুধু ডায়ালাইসিসে ব্যয় হয় সাড়ে ৭ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা।

গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টারে প্রতিদিন ২৫ জন অতিদরিদ্র রোগীকে বিনামূল্যে সেবা দেয়া হয়। ৩০০ সাধারণ রোগীর জন্য প্রতি ডায়ালাইসিস ১১০০ টাকা, ৭৫ জন মধ্যবিত্ত রোগীকে দিতে হয় ১৫০০ টাকা এবং উচ্চবিত্ত রোগীকে দিতে হয় তিন হাজার টাকা। সেখানে প্রায় ৪০০ জন রোগীর সেবা দেয়ার ব্যবস্থা আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন- সঠিক নিয়ম মেনে একজন রোগীর কিডনি ডায়ালাইসিস করতে প্রায় ২ হাজার টাকার বেশি খরচ হয় না। এর মধ্যে ফিল্টার ৬০০ টাকা, ফ্লুইড (এ ও বি) ১৮ লিটার ৫০০ টাকা, আইভি সেট এবং এভি ফিস্টুলা নিডেল সেট ২৪০ টাকা, ইনজেকশন ১৫০ টাকা, রোগীপ্রতি মেশিন ওয়াশ ৫০ টাকা, বিছানা পরিষ্কার বাবদ ৪০ টাকা এবং আনুষঙ্গিক (বিদ্যুৎ, পানি, পরিচ্ছন্নতা, কর্মচারীর বেতন) ২০০ টাকা। ডায়ালাইসিস-সংক্রান্ত বেশিরভাগ অনুসঙ্গের ওপর রয়েছে ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ ২০ থেকে ২৬ শতাংশ ট্যাক্স। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ ও আনুষঙ্গিক ট্যাক্স কমানো হলে ডায়ালাইসিস ব্যয় আরও কমে আসবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী দৈনিক জাগরণকে বলেন, ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি অনুসরণ করলে ডায়ালাইসিস সংক্রান্ত খরচ আরও কমিয়ে আনা সম্ভব। ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতা করে এসব ওষুধপত্রের দাম বাড়ায়। দেশে উৎপাদিত রিকমভিন্যাট এরিথ্রোপয়েটিন ইনজেকশনের বাজার মূল্য ২১০০ টাকা। ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি অনুসরণ করা হলে ১০০ টাকা লাভসহ এর দাম হতো ৬০০ টাকা।

ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এ বি এম ফারুক দৈনিক জাগরণকে বলেন, দাম নির্ধারণের বিষয়টি ওষুধ প্রশাসনের আওতাধীন। তাই দাম নির্ধারণের সময় তাদের উচিৎ যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা।

এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান ও মুখপাত্র পরিচালক রুহুল আমিনের বক্তব্য নিতে সব রকম মাধ্যমে যোগাযোগ করেও তাদের পাওয়া যায় নি। তবে ওষুধ প্রশাসনের একজন তত্বাবধায়ক জানান, যে কোনও ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনকারীরা দেশের বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য প্রশাসন থেকে নির্দিষ্ট মূল্য অনুমোদন করায়। এই মূল্য নির্ভর করে উৎপাদন খরচ, বিপণন ইত্যাদির ওপর। তারা অন্য দেশে কী দামে বিক্রি করবে, সেটা তাদের বিষয়। এখানে ওষুধ প্রশাসন কিছু করতে পারে না। এটাই বর্তমানে প্রচলিত জাতীয় ওষুধ নীতি অনুযায়ী নিয়ম।

আরএম/এসএমএম

আরও পড়ুন

Islami Bank