• ঢাকা
  • শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০১৯, ০৬:২৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৯, ২০১৯, ০৬:২৭ পিএম

স্বাস্থ্যসেবায় অযৌক্তিক আইন সংশোধনে আইনি লড়াইয়ের হুমকি

জাগরণ প্রতিবেদক
স্বাস্থ্যসেবায় অযৌক্তিক আইন সংশোধনে আইনি লড়াইয়ের হুমকি
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এফডিএসআর আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা - ছবি : জাগরণ

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন ২০১৮’ এর খসড়াকে অযৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করেছে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এফডিএসআর)। একইসঙ্গে আইন সংশোধনে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে রিট বা আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এফডিএসআর আয়োজিত “প্রস্তাবিত ‘স্বাস্থ্য সেবা ও সুরক্ষা আইন ২০১৮’ নিরাপত্তা রোগী ও চিকিৎসক : বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা জানান। 

গোলটেবিল বৈঠকে জানানো হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেছে এফডিএসআর। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, আইন প্রণয়ন করার সময় বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ)-সহ স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতারা উপস্থিত ছিলেন।  এ বিষয়ে তখন তারা কোনোরূপ মন্তব্য করেননি। তাদের মতে, এ আইন ঠিকঠাক মতোই প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু এদিকে স্বাচিপকে বাদ দিয়ে মন্ত্রণালয় কখনোই তৃণমূল চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে না। ফলে চিকিৎসকদের জন্য উপকারী কোনো আইন প্রণীত হয়নি।  বরং চিকিৎসকদের জন্য একটি নিবর্তনমূলক আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। 

বৈঠকে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের উপদেষ্টা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ডা. আব্দুন নূর তুষার। তিনি বলেন, ডাক্তারের নিরাপত্তা বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে তিনি যেন কোনোরূপ হামলার শিকার না হন। এছাড়া আর কিছু উল্লেখ নেই। সাধারণত হামলার শিকার হলে ফৌজদারি মামলা করলে বিচার পাবে। এজন্য আলাদা কোনো আইনের দরকার ছিল না। তাছাড়া যেকোনো বিচার চাইতে বিএমডিসি বাদে আদালত পর্যন্ত চিকিৎসক এবং রোগী কেউ পৌঁছাতে পারবে না, এমন অযৌক্তিক ধারাসহ আরো অনেক ধারা রয়েছে এ আইনে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এই আইন শুধুমাত্র বেসরকারি ক্লিনিকের চিকিৎসকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যেখানে রোগীদেরকেও মূল্যায়ন করা হয়নি। 

বিএমডিসি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. লিয়াকত বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিএমডিসি এখন পর্যন্ত কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। অথচ এক্ষেত্রে বিএমডিসির অনেক বড় অবদান থাকার কথা ছিল। নিবন্ধন ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের আরও অনেক কাজ রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করা আছে। প্রয়োজনে অনৈতিক আচরণের জন্য চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। 

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ইশতিয়াক রেজা বলেন, বিএমএ ও স্বাচিপ কেউ আইনের বিষয়ে কথা বলছে না। এফডিএসআর তরুণ চিকিৎসকদের একটি সংগঠন, শুধুমাত্র তারাই কথা বলছে। আসলে চিকিৎসকদের কণ্ঠ অনেক ক্ষীণ, অধিকার আদায়ের ব্যাপারে আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে।  

প্রস্তাবিত আইনে ডাক্তার ও রোগীদের সম্পর্কটি সঠিকভাবে বিবেচনা করা হয়নি উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাসনিম বলেন, চিকিৎসা সেবা নিতে এসে রোগীর প্রশ্ন হতে পারে- চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে কি না।  কিন্তু জানার পরও কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে তখন তারা সবকিছু অস্বীকার করে ডাক্তারদের দোষারোপ করেন। তারা বলেন, আমরা জানি না বা বুঝি না। যেমন- রোগী বা রোগীর স্বজনদের অনুমতি না পেলে গর্ভাবস্থায় সিজার করা যায় না বা আমরা করতে পারি না। সিজারের পর কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে তখন রোগীর স্বজনরা আমাদেরকেই দোষারোপ করে। এরকম একটি জটিল বিষয় কিংবা চিকিৎসকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সেরকম কিছুই হয়নি বলা হয়নি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে কী তথ্য সংরক্ষণ করতে পারবে সেই ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। 

স্বাস্থ্যসুরক্ষা আইনটি ঘষামাজা করতে গেলে ৫৭  ধারার মতো একটি প্রহসনমূলক আইনে পরিণত হবে উল্লেখ করে সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা বলেন, ডাক্তার ও সাধারণ মানুষ প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে। এরকম আইন করার সময় রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে নজর রেখে আমলারা কিংবা অন্যরা আইনটি করে ফেলেন। আপনারা জোর দাবি তুলে ধরেন- এ খসড়া আইন বাতিল, নতুন খসড়া আইন প্রণয়নের জন্য।  যেখানে আপনাদের উপস্থিতি থাকবে। কেননা, এটা করতে গেলে ৫৭ ধারার মতো, সাংবাদিক দমন করার আইনের মতো ডাক্তার দমনের একটি আইন প্রণীত হয়ে যাবে।  

তিনি বলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ নেবে, না হলে সম্পূর্ণরূপে সরে দাঁড়াতে হবে। আবার চিকিৎসকদের নৈতিকতা আইন কীভাবে ঠিক করে? প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বিদেশে না গিয়ে দেশের চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসা নেবেন। কিন্তু তিনি দেশের বাইরে থেকে চিকিৎসা সম্পন্ন করে এসে বললেন, সাইকোলজিকাল কারণে দেশের চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দিতে পারেননি।  এটা আমাদের দেশের চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। 

অনুষ্ঠানে বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, আমাদের দেশের জনগণের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা একেবারেই কমেনি। রাজনৈতিক নেতাদের দেশের বাইরে চিকিৎসা করানোর সংস্কৃতি এ দেশে বহু পুরান। বঙ্গবন্ধুর গলব্লাডারে অপারেশন করা হয়েছিল বিদেশে। দেশের চিকিৎসকরা ঝুঁকি নিতে চাননি। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় ডাক্তার থাকে না, সেখানে হেলথ প্রোভাইডার থাকেন।  তারা বেআইনিভাবে প্রেসক্রিপশন করে, এন্টিবায়োটিক দিচ্ছে। এসব বিষয় নজরে আনা দরকার।   

গণস্বাস্থ্য ডায়লাইসিস সেন্টারের চিকিৎসক ডা. শামীম বলেন, খুলনা ও চট্টগ্রামে কীভাবে বিদেশি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়? ভারতের চিকিৎসকরা কীভাবে এখানে এসে চিকিৎসা প্রদান করে? আবার সরাসরি অ্যাম্বুলেন্সে করে কলকাতায় রোগী কোন নিয়ম মেনে যান? এসব জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই এই আইনে। এসব তো দেখার কথা বিএমডিসির। তারা কী করে?

অভিনয় শিল্পী আরেফিন শুভ নিজেকে ডাক্তার বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, দেশে ৫৮ শতাংশ মানুষ যদি ভুয়া চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে অথবা এত বেশিসংখ্যক যদি ভুয়া ডাক্তার থেকে থাকে তাহলে আমিও নিজেকে ডাক্তার বলে দাবি করতে পারি।  যেহেতু সেটার কোনো বিচার হবে না। 

এফডিএসআরের মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ ডা. ফরহাদ মঞ্জুর, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. জাহিদুর রহমান, আইন বিষয়ক সম্পাদক ডা. নোমান চৌধুরী, মিডিয়া এবং পাবলিকেশন বিষয়ক সম্পাদক ডা. শাহেদ ইমরান প্রমুখ।

আরএম/ এফসি

আরও পড়ুন