• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২০, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২০, ০৮:১৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ১৪, ২০২০, ০১:০১ এএম

অনুসন্ধানি প্রতিবেদন

ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেলে কোভিড বাণিজ্য, উপেক্ষিত সরকারি নির্দেশনা

এস এম সাব্বির খান
ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেলে কোভিড বাণিজ্য, উপেক্ষিত সরকারি নির্দেশনা
প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাস (কোভিড-১০) আক্রান্ত রোগীদের টেস্ট ও চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্ধারিত নীতিমালা প্রণয়নের ভিত্তিতে রাজধানীর বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালকে অনুমোদন দিয়েছে সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় ৬ জুন (শনিবার) করোনা চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৪ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত জাপান ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে। কিন্তু এরই মধ্যে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে চিকিৎসা ব্যবস্থা, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অপ্রতুলতা ও করোনা চিকিৎসার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যয় সংক্রান্তসহ নানা বিষয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, করোনা ইউনিট পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অপ্রতুলতা আড়াল করতে অনভিজ্ঞ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দিয়ে করোনা চিকিৎসা প্রদানে বাধ্য করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন-এর ফেসবুক পেজের সূত্রে এমন ভয়াবহ অভিযোগের কথা প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটিরই একদল ইন্টার্ন চিকিৎসক।

অপরদিকে হাসপাতালের গতানুগতিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশার কথা উল্লেকখপূর্বক করোনা চিকিৎসা প্রদানে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা নিয়ে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। একই সঙ্গে করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে বাড়তি চার্জ ধার্য করা এবং অতিরিক্ত খরচের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এরই মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ হতে শুরু করেছে হাসপাতাল সংলগ্ন উত্তর সিটির কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। 

অনেকেই বলছেন, প্রত্যক্ষভাবে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন গুরুতর কার্যকলাপ কি সরকারের দুর্বলতা নাকি বিশেষ মহলের সরকারের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে?

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উঠে আসা এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বাস্তবিক প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানে নামে দৈনিক জাগরণ। যার শুরুতেই হাতে আসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোভিড-১৯ চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রকাশিত একটি তথ্যলিপি। যেখানে কোভিড-১৯ ল্যাব টেস্ট, আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ও চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে নির্ধারিত চার্জ সম্পর্কে তথ্য দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত তালিকার বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে করোনা টেস্টের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ গ্রহণ সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।

হাসপাতালটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এই তালিকার তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে লিখিত নির্দেশনা জারির মাধ্যমে যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে করোনা টেস্টের জন্য যেখানে নির্ধারিত চার্জ নির্দিষ্ট ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ টাকা, সেখানে হাসপাতালটিতে এই চার্জ ধরা হয়েছে ৪ হাজার টাকা। 

শুধু তাই নয়, নির্ধারিত এই চার্জের সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে যুক্ত করা হবে ভ্যাট। সেক্ষেত্রে সর্বসাকূল্যে জনপ্রতি করোনা টেস্টের খরচ গিয়ে দাঁড়াবে নির্ধারিত চার্জের চেয়ে অনেক বেশি।

করোনা চিকিৎসা ব্যয় সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্যের মধ্যে রয়েছে, রোগী ভর্তির সময় আলাদা চার্জ (প্রয়োজন সাপেক্ষে) ১৫০০ টাকা , আইসোলেশন কেবিন চার্জ দিনপ্রতি সাড়ে ১০ হাজার টাকা, করোনা কেবিন ২১ হাজার ৪০০ এবং ওয়ার্ডে শয্যাপ্রতি ৭ হাজার ৭০০ টাকা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্ত রয়েছে ‘সার্ভিস চার্জ’ সংযোজনের শর্ত। যেখানে প্রতিটি ওষুধ, টেস্ট বা চিকিৎসা সংক্রান্ত যে কোনও বিষয়ের জন্যে আলাদা আলাদা বিল ধার্য করার বিষয়টিও নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে যে সব শর্ত আরোপ করা হয়েছে হাসপাতালটির পক্ষ থেকে সেখানেও রয়েছে এক ধরনের মরণ যাতাকল। হাসপাতালের প্রকাশিত তালিকা থেকে জানা গেছে, ভর্তির জন্য ১৫-৯০ দিনের বুকিং দিতে হবে। কোনও রোগী যদি ৩০ দিনের কম সময়ের জন্যে (নূন্যতম ১৫ দিন ভর্তি থাকার নিয়ম সাপেক্ষে) এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হন তবে তাকে সম্পূর্ণ টাকা ভর্তি চার্জের সঙ্গে এককালীন পরিশোধ করতে হবে। তবে ৩০ বা তার বেশিদিনের ক্ষেত্রে রয়েছে কিস্তির ব্যবস্থা।

হাসপাতালটির করোনা বাণিজ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হাসপাতালটির এই করোনা বাণিজ্য ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। কেউ কেউ ঘোষণা দিচ্ছেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেলে করোনা চিকিৎসা গ্রহণ বয়কটের। তাদের বেশিরভাগেরই অভিযোগ, সরকার জনগণের দ্বারে করোনাকালীন চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অনুমোদন দিচ্ছে কিন্তু এই অনুমোদনকে পুঁজি করে চলছে চিকিৎসা বাণিজ্য।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে কথা হয় জাপান ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের সঙ্গে। যেখানে প্রথমেই তিনি প্রকাশিত সেই তথ্যলিপিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকেই প্রকাশিত বলে নিশ্চিত করেন। যদিও এর কোথাও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, ব্যবস্থাপনা পর্ষদ বা পরিচালনা পর্ষদের কোনও দায়িত্বশীল ব্যক্তির সত্যায়ন নেই। শুধু তাই নয় তথ্যলিপিটি হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক প্যাডেও ছাপা হয়নি। কিন্তু এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে।

কোভিড-১৯ টেস্টের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত চার্জের বেশি ধার্য করা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবার ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বরাবরই একটু বেশি থাকে। কারণ এক্ষেত্রে সরকারি কোনও সহযোগিতা যুক্ত নেই। পুরো প্যাকেজের অধীনে রোগীর খাবার, ওষুধ, আনুষাঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডাক্তার ভিজিট সংযুক্ত থাকে। অক্সিজেন সাপোর্টও রয়েছে। সব মিলিয়ে একটু ব্যয় তো হবেই।

কিন্তু এই নির্বাহী কর্মকর্তার তথ্যের সঙ্গে মিলছে না তথ্যলিপি। কারণ সেখানে পরিষ্কারভাবেই উল্লেখ করা আছে, রোগীর আনুষাঙ্গিক পথ্য, পরীক্ষা ও অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে আলাদা বিল পরিশোধ করতে হবে।

চিকিৎসকদের সম্পর্কে মোজাম্মেল হক জানান, হাসপাতালটিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সিং সদস্য রয়েছেন যাদের প্রত্যেকেই করোনা চিকিৎসা প্রদানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত৷

এক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিয়োগ করার বিষয়টি আলোচনায় আনলে প্রথমে তা স্বীকার করলেও পরবর্তীতে পাশ কাটিয়ে যান তিনি। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য ‘স্যার’ এর সঙ্গে আলোচনা করে জানানোর কথা বলা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেউ আর যোগাযোগ করেননি।

ইন্টার্ন চিকিৎসদের বক্তব্যের একাংশ- ফেসবুক হতে সংগৃহিত

করোনাকালীন অধিকাংশ মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষের যেখানে শূন্য হাড়ির গড়াগড়ি ঘরের মেঝেতে, সেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা ও প্রাণঘাতী করোনা সংক্রমণের চিকিৎসা গ্রহণ করা কতটা সম্ভব তাই এখন মূল প্রশ্ন।

সম্প্রতি ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট উত্তরার জাপান ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট করা হয়।

৬ জুন (শনিবার) হাসপাতালের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সে তথ্য নিশ্চিত করা হয়। ৭ জুন (রোববার) থেকে করোনা আক্রান্ত রোগীর টেস্ট ও চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে ভর্তির কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেয় হাসপাতালটি।

স্থানীয়রা বলছেন, এসব হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার অনুমোদন দিয়ে দায়সারা তো হচ্ছে কিন্তু নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না সেবা প্রাপ্তি। মৃত্যু ভয়ে নয়, হাসপাতালের বিলের ভয়েই এখন করোনাকে ভয় লাগে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আমলে নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও যথাযথ চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় জনগণ। 

তারা বলছেন, সরকার অনুমোদন দিয়েছে অর্থ উপার্জনের জন্যে নয় মানুষের দ্বারে করোনাকালীন চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে। অথচ সরকারি নির্দেশনার এমন প্রত্যক্ষ অবমাননার ধৃষ্টতা এবং মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সেই সাধু সিদ্ধান্তগুলোকে সমালোচিত করা হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত উপেক্ষা মানে রাষ্ট্রীয় বিধি বিরোধী আচরণ। তাই এসব অরাজকতা প্রতিহত করতে প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ সরকারের পক্ষে মাঠে নামবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তারা।

এসকে/এসএমএম