• ঢাকা
  • সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ২৪, ২০২০, ০৪:০৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৪, ২০২০, ০৪:০৯ পিএম

বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে কোভিড-১৯

এস এম সাব্বির খান
বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে কোভিড-১৯

আধুনিক সভ্যতা অথবা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষে অর্জিত শক্তিশালী প্রযুক্তি ব্যবস্থা, যার কথাই বলা হোক না কেন- এমন সবকিছুই যেন বৃথা আজ। বিশ্বের পরাক্রমশালী রাষ্ট্রগুলোর মাঝে নেই ক্ষমতায়নের প্রতিযোগিতা, স্তব্ধ হয়ে গেছে নানা দেশে চলমান যুদ্ধের দামামা। বিলিয়ন ডলার অর্থায়নে উদ্ভাবিত সামরিক প্রযুক্তি বা মহাকাশ গবেষণা ব্যবস্থাপনা; বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বলা যায় আজ অবদি মানব ইতিহাসের সকল অর্জনই যেন ব্যর্থ। তার প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের অহংকার বিচূর্ণ করে চোখের সামনে সারা পৃথিবী দখল করে নিল প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্টি মহামারি কোভিড-১৯। যার বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীর সকল শক্তি এক করেও যেন কম পড়ছে পতন প্রতিরোধের প্রচেষ্টায়।

বিগত কয়েক মাস ধরে সারা বিশ্বকে ক্ষতবিক্ষত করছে মহামারী করোনাভাইরাস। অতীতেও বড় বড় এমন বেশ কয়েকটি দুর্যোগ বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে, যেগুলো শেষ হওয়ার পরই বিশ্বব্যাপী নজরে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। করোনা তার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে শান্ত হওয়ার পর তেমনই একটি বৈশ্বিক পরিবর্তনের বৈপ্লবিক ইতিহাস রচিত হবেন বলেই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে মার্কিন ম্যাগাজিন ফরেন পলিসি বলছে, মহামারি করোনাভাইরাসের পরিণাম হবে বিস্তৃত ও ব্যাপক, যার খুব অল্পই ধারনা করা যাচ্ছে। এরইমধ্যে এই মহামারি সারা পৃথিবীর জনজীবন বিপর্যন্ত করে তুলেছে, বিশ্ব বাজার অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিয়েছে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের প্রকৃতি যোগ্যতা ও তাদের দক্ষতা বা অদক্ষতার আসল রুপটি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলোর আলোকে করোনা পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। আর তাদের অধিকাংশের মতে, সাম্প্রতিক বিশ্বে মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতা অনেকাংশেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন শক্তির হাতে। এই প্রলয়ের ধাক্কায় বিশ্বব্যাপী জেগে ওঠবে মানব সচেতনতা আর তাতেই আসবে ইতিবাচক একটি ধারা, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নতুন ও পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব ঘটাবে। 

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাবে। এগুলো সামনে আসবে করোনার ধ্বংসযজ্ঞের কিছুদিন পর। মহামারী করোনাভাইরাসের পর কেমন হবে পৃথিবী- এ নিয়ে বিশ্বের ১২ জন শীর্ষ বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলেছে মার্কিন ম্যাগাজিন ফরেন পলিসি। বিশ্লেষকরা অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সেই উত্তর দিয়েছেন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন এম ওয়াল্ট মনে করেন, মহামারী করোনা ভাইরাস বিশ্বের দেশগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে এবং বাড়িয়ে তুলবে জাতীয়তাবাদ। সব সরকার সংকট নিরসনে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এতে উদ্ভব ঘটবে নতুন অনেক শক্তির।

মার্কিন এই অধ্যাপক মনে করেন, ক্ষমতার পরিবর্তন গতিশীল করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাসের কারণে ক্ষমতা ও প্রভাব পশ্চিম (আমেরিকা ও ইউরোপ) থেকে পূর্বের (এশিয়া) নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর। এছাড়া এটি ছড়িয়ে পড়ার পর নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিয়েছে চীনও।

সেই তুলনায় ইউরোপ ও আমেরিকার সাড়া মন্থর ও এলোমেলো। এতে পশ্চিমাদের যে বাড়তি সুনাম ছিল তা ভেঙে চুরমার হচ্ছে। সবমিলিয়ে করোনা ভাইরাসের কারণে এমন এক বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি হবে যেখানে উন্নয়নের গতি হ্রাস পাবে, যে কেউ চাইলেই যে কোনো জায়গায় যেতে পারবে না এবং সবকিছুতে থাকবে কড়াকড়ি। ভয়াবহ ভাইরাস, অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও অদক্ষ নেতৃত্বের কারণে মানবতা এখন সবচেয়ে ভয়ংকর পথের দিকে এগোচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের বিশ্লেষক কিশোর মাহবুবানি মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মৌলিকভাবে পাল্টে দেবে না মহামারী করোনা ভাইরাস। তবে এটি অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসবে, যা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মহামারী করোনা ভাইরাসের পর যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের পরিবর্তে চীনকেন্দ্রিক বিশ্বায়ন শুরু হবে।

ল্যাটিন আমেরিকার বিশ্লেষক শ্যানন ও’নেইল মনে করেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন অনেক কমে যাওয়ার কারণে মুনাফাও কমে যাবে। এমনকি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শেষ হওয়ার পরও এই অবস্থা থাকতে পারে। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে চাকরি হারাতে পারে অনেক মানুষ। যদিও এখনই নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোসেফ নিইয়ে জুনিয়রের দৃষ্টিতে, করোনা ভাইরাসের পর মার্কিন শক্তিকে নতুন কৌশলে এগোতে হবে। ২০১৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার জন্য নতুন একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের ঘোষণা দেন। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে ট্রাম্পের সেই কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষমতা থাকলেও একক কোনো কৌশলে যে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় তা বুঝতে পেরেছে মার্কিন প্রশাসন। 

জোফেস নিইয়ে জুনিয়র বলেন, আন্তঃদেশীয় হুমকি যেমন কোভিড-১৯ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু নিজেদের কথা ভাবলে চলবে না। এক্ষেত্রে অন্যদের শক্তিগুলো বিবেচনায় নিতে হবে এবং তবেই সফলতা পাওয়া যাবে। করোনা ভাইরাসের কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে- বিশ্বজুড়ে আমরা কৌশলগুলো সমন্বয় করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

মার্কিন কূটনৈতিক রিচার্ড এন হাস মনে করেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে পরিচয় মিলবে অনেক ব্যর্থ রাষ্ট্রের। অনেক রাষ্ট্রই এই সংকট থেকে বের হয়ে আসতে হিমশিম খাবে। অবশ্য এর পাশাপাশি শক্তিশালী কিছু দেশেরও দেখা পাওয়া যাবে। তবে সবমিলিয়ে বৈশ্বিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। এই ব্যবস্থাকে পরবর্তী অবস্থানে নিতে ভেঙে দিয়ে গড়ে তোলা হবে নতুন অবকাঠামো।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে এই সংকট সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তুলবে এবং অধিকার আদায়ে সচেতন করে তুলবে। একই সঙ্গে সমরাস্ত্র প্রযুক্তির চেয়ে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মত ক্ষেত্র গুলোতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও বিন্যাস এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা ও জাতিগত উন্নয়নে আসতে পারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন যা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সম্ভাবনায় ও সুশৃঙ্খল বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে।