• ঢাকা
  • বুধবার, ০৩ জুন, ২০২০, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: এপ্রিল ১, ২০২০, ০৮:৫৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১, ২০২০, ০৮:৫৫ পিএম

পুলিশ-গোয়েন্দা যৌথ অভিযানে খালি করা হল নিজামউদ্দিন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পুলিশ-গোয়েন্দা যৌথ অভিযানে খালি করা হল নিজামউদ্দিন
অজিত ডোভালের সঙ্গে মারকাজ নিজামউদ্দিনের মওলানার সাক্ষাৎ● পিটিআই

বড়সড় অভিযান চালানো হল দিল্লির মারকাজ নিজামউদ্দিনে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের নেতৃত্বে দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিল করে দেয়া হয়েছে বড় এলাকা। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) মধ্যরাত থেকে বুধবার (১ এপ্রিল) সকালের মধ্যে পুরোপুরি খালি করে দেয়া হয়েছে মারকাজ চত্বর। সেখানে যতোজন ছিলেন, সবাইকে বের করে নিয়ে আইসোলেশনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।  মারকাজ চত্বরে বেশ কিছু কাঠামোও ভেঙে দেয়া হয়েছে বলেও দিল্লি পুলিশ জানায়।

মঙ্গলবার মধ্যরাতেই মারকাজ নিজামউদ্দিনে গিয়েছিলেন অজিত ডোভাল। বড়সড় বাহিনী এবং গোয়েন্দা কর্তাদের নিয়ে ডোভাল কেন মাঝরাতে মারকাজে হাজির হলেন, তা নিয়ে জোর জল্পনা ছড়াতে শুরু করেছিল। নিজামউদ্দিন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ডিফেন্স কলোনি পর্যন্ত একটা বড় এলাকাকে প্রথমে সিল করে দেয়া হয় ডোভালের নির্দেশে। এর ফলে লাটিয়েন’স দিল্লি থেকে বিচ্ছিন হয়ে পড়ে দক্ষিণ দিল্লির লাজপত নগর বা চিত্তরঞ্জন পার্কের মতো এলাকা। স্থানীয়দের অনেকেই প্রথমে ভেবেছিলেন, গোটা এলাকায় জীবাণুনাশক ছড়ানো হবে। ডোভাল যে পুরো মারকাজ চত্বর খালি করে দেয়ার অভিযানে নেমেছেন, তা কেউ আঁচ করতে পারেননি।

বুধবার (১ এপ্রিল) সকাল থেকে অভিযানের রূপরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করে। এলাকা সিল হয়ে থাকায় সেভাবে কেউ রাস্তায় বেরনোর সুযোগ পাননি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে চোখ রেখে দিল্লিবাসী বুঝতে পারেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নেতৃত্বে কী ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে।

জীবাণুনাশক ছড়ানো হচ্ছে ●  পিটিআই।

মারকাজ নিজামউদ্দিনের যারা শীর্ষ মওলানা, মঙ্গলবার রাতে তাদের সঙ্গেই সর্বাগ্রে যোগাযোগ করেন অজিত ডোভাল। মারকাজ নিজামউদ্দিনে জমায়েতের জেরে যে ঘটনা ঘটে গেছে এবং যতোজন এরই মধ্যেই সেখান থেকে সংক্রামিত হয়েছেন, তার প্রেক্ষিতে আর কোনও ঝুঁকি নেয়া যাবে না বলে মওলানাদের জানান ডোভাল। যারা তখনও মারকাজে রয়েছেন, তাদের অবিলম্বে বার করে নিয়ে গিয়ে আইসোলেশনে পাঠাতে হবে, প্রত্যেককে পরীক্ষা করাতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা শুরু করাতে হবে— জানান ডোভাল। মারকাজ নিজামউদ্দিন খালি করে দেয়ার পরে স্বাস্থ্য দফতর গোটা চত্বরকে জীবাণুমুক্ত করবে বলেও মওলানাদের জানান ডোভাল।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কথা মওলানারা মেনে নেন বলেই খবর।

প্রশাসনিক অভিযানে তারা সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। তারপরেই দিল্লি পুলিশ মারকাজ নিজামউদ্দিন খালি করতে শুরু করে দেয়।

অজিত ডোভাল আসরে নামার আগেও কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন এই কাজটাই করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাবলিগি জামাতের নেতৃত্ব সহযোগিতা করতে রাজি হননি। সংগঠনের প্রধান মওলানা সাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন , তিনি মারকাজ খালি করতে দেবেন না। তারপরেই ডোভালকে ময়দানে নামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

রাত ২টা নাগাদ মারকাজ নিজামউদ্দিনে যান ডোভাল। মওলানা সাদের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিজে কথা বলেন এবং মারকাজ খালি করার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হন। তারপরেই দিল্লি পুলিশ মারকাজ খালি করার কাজ শুরু করে দেয়।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাত পর্যন্তও যারা মারকাজে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের বার করে নিয়ে গিয়ে আইসোলেশনে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ। তাদের শারীরিক পরীক্ষা শুরু হয়। যারা এরই মধ্যে অসুস্থ, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসাও শুরু হয়ে গেছে। কোভিড-১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট যদি পজিটিভ আসে, তা হলে তৎক্ষণাৎ তার চিকিৎসা শুরু করার প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে।

মারকাজ নিজামউদ্দিন চত্বরে পুলিশ বেশ কিছু কাঠামো এ দিন ভেঙে দিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গিয়েছে। তাবলিগি জামাতের যে ধর্মীয় সমাবেশের জন্য মারকাজে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোকের জমায়েত হয়েছিল, সেই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ১২ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। যারা সমাবেশে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, তাদের নানা প্রয়োজন মেটানোর জন্য কিছু অস্থায়ী কাঠামো গড়তে হয়েছিল মারকাজ নিজামউদ্দিন চত্বরে। অনেকগুলো দিন ধরে একসঙ্গে কয়েক হাজার লোকজন জমায়েত করে থাকায় বেশ কিছু আবর্জনাও জমেছিল সেখানে। সেসব আবর্জনা সরাতে এবং মারকাজ চত্বরকে পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত করার কাজ মসৃণ করতেই পুলিশ ওই সব কাঠামো ভেঙে দিয়েছে বলে খবর।

মারকাজ নিজামউদ্দিন এলাকায় চিকিৎসা শুরু করার প্রস্তুতি ● পিটিআই।  

পুলিশি অভিযান শেষ হতেই স্বাস্থ্য দফতরের কর্মীরা মারকাজে ঢোকেন।পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় মসজিদ, দরগাহ সহ গোটা মারকাজ চত্বর। পুরোটাতেই জীবাণুনাশক ছেটানো হয়। ছড়িয়ে দেয়া হয় ব্লিচিং পাউডার। আপাতত মারকাজ চত্বরে কাউকে থাকতে দেয়া হবে না— জানিয়েছে প্রশাসন। সেখানকার মসজিদে আপাতত নামাজের জমায়েতও হবে না বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

শুক্রবারের নামাজও নয়।

কিন্তু ১২ থেকে ১৫ মার্চ মারকাজ নিজামউদ্দিনে অত বড় জমায়েত কীভাবে করল তাবলিগি জামাত, তা নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন উঠছে। তাবলিগ নেতৃত্বের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে তো বটেই, গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগও উঠেছে।

মার্চের প্রথম সপ্তাহেই জমায়েত না করার বিষয়ে সতর্ক করতে শুরু করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হোলি খেলবেন না বলে জানিয়েছিলেন। দেশবাসীকেও হোলিতে জমায়েত না করার বার্তাই দিয়েছিলেন। প্রায় সব বড় বড় মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছিল। পরীক্ষা স্থগিত করা হচ্ছিল, স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছিল। লকডাউন তখনও ঘোষিত হয়নি। কিন্তু জমায়েত যে এড়াতেই হবে, সে বার্তা গোটা দেশেই তখন ছড়িয়ে গিয়েছে। তার পরেও তাবলিগি জামাত অত বড় জমায়েত কেন করল? কেন পিছিয়ে দেয়া হল না কর্মসূচি? প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

আর জমায়েতের বিরুদ্ধে যখন গোটা দেশে সতর্কবার্তা জারি করা হচ্ছে, তখন রাজধানীর বুকে অত বড় জমায়েত অত দিন ধরে যে চলবে বা চলছে, তা কেন প্রশাসন জানতে পারল না, সে প্রশ্নও উঠছে। দেশের ১৮টা রাজ্য থেকে লোকজন হাজির হচ্ছিলেন নিজামউদ্দিনে।

বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ থেকেও লোকজন দিল্লিতে ঢুকছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর নর্থ ব্লকের নাকের ডগায় তারা সবাই জড়ো হচ্ছিলেন। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনও নজরই কি ছিল না সে দিকে? এই প্রশ্নও উঠছে। ফলে বড়সড় গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগও সামনে আসছে।

শারীরিক পরীক্ষা করা হচ্ছে ● পিটিআই

তবে বিলম্বে হলেও বোধোদয় হয়েছে প্রশাসনের। ডোভালের নেতৃত্বে হওয়া অভিযানে এ দিন মারকাজ থেকে যাদের বার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ২১৬ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছে বলে খবর। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই মুহূর্তে আরও প্রায় ৮০০ জন মারকাজফেরত বিদেশি নাগরিক ছড়িয়ে পড়েছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে। তাদের অবিলম্বে খুঁজে বার করে আইসোলেশনে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে ওই বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ করা হবে বলে খবর।

বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে যারা মারকাজে গিয়েছিলেন, তারা ভিসার আবেদনে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন পর্যটক হিসেবে।

ধর্মপ্রচারের কাজে এলে ভিসার আবেদনে ‘ধর্মপ্রচারক’ পরিচয়ই দিতে হবে, নিয়ম তেমনই। তথ্য গোপন করে ভারতে ঢোকার ভিসা নেয়ার অপরাধে ওই বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।

তারা কালো তালিকাভুক্ত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী কালে আর কখনও ভারতে ঢোকার ভিসা পাবেন না। আনন্দবাজার।

এসএমএম