• ঢাকা
  • বুধবার, ০৫ আগস্ট, ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২০, ০২:৫২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ২৮, ২০২০, ০২:৫৩ পিএম

প্রতিপক্ষের ঘেরে কোনঠাসা

ভারতের আকাশজুড়ে দুর্যোগের ঘনঘটা

এস এম সাব্বির খান
ভারতের আকাশজুড়ে দুর্যোগের ঘনঘটা

কাশ্মীর সীমান্তে প্রায় প্রতিদিনই চলছে গোলাগুলি আর হতাহতের ঘটনা। সম্প্রতি লাদাখ সীমান্তে চীনের সঙ্গে শুরু হওয়া উত্তেজনা ক্রমেই যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। এরইমধ্যে এবার নিরাপত্তা ইস্যু তুলে ধরে সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে নেপালও। সেচের পানি বন্ধ করে দিয়ে তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভুটান। লাদাখের পরিস্থিতি প্রভাব ফেলতে পারে বলে কাশ্মীর অঞ্চলে ভারি সামরিক সরঞ্জাম স্থাপন ও সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি করছে পাকিস্তানও।

সর্বোপরি বলা যায়, একের পর এক প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, রীতিমত কোনঠাসা পরিস্থিতে ফেলেছে ভারতকে। শুধু সীমান্তে এই সেনা ঘেরই নয়, চীনের সার্বিক প্রস্তুতির ছককাটা দেখে সুস্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, বিশেষ কোনো পরিকল্পনা মাথায় রেখেই ভারতকে ঘিরে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে প্রতিপক্ষের জাল বেছানো।

ভারতীয় ও চীনা গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য মতে,  লাদাখ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে আরো কয়েকটি নতুন চীনা ঘাঁটির অস্তিত্ব স্পট করা হয়েছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। ২৭ জুন এ তথ্য জানায় আনন্দবাজার পত্রিকা।

রাডার গাইডেড অটোমেটিক চীনা ড্রোন- ফাইল ফটো

এদিকে ওয়ান ইন্ডিয়া নিউজ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য মতে জানা যায়, লাদাখ সীমান্তের প্রতিটি পরতে পরতে নজরদারি শুরু করেছে ঝাঁকে ঝাঁকে চীনা ড্রোন। যার প্রেক্ষিতে ভারতও ইসরাইলের তৈরি দুটি বিশেষ ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি শুরু করেছে।

লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারত উত্তেজনার প্রেক্ষিতে জলে ও আকাশ পথে চীনা সমরাভিযান পরিচালনার শক্ত প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, এরই মধ্যে পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে চীন। করাচী বিমান বন্দরসহ বেশ কয়েকটি পাকিস্তানী বিমানঘাঁটিতে এরই মধ্যে মজুত করা হয়েছে চীনের জঙ্গী বিমান। তবে ভারতের জন্য সবচেয়ে ভয়ের খবর হচ্ছে, জলপথে হামলা চালাতে, পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে পাক নৌবন্দরে ঘাঁটি গাড়তে শুরু করেছে পারমানবিক শক্তিবাহী চীনা সাবমেরিন।

পারমানবিক শক্তিবাহী চীনা সাবমেরিন- ফাইল ফটো

সম্প্রতি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে থেকে জানানো হয়েছে যে, কাশ্মীর সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মজুদ, অত্যাধুনিক ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপক স্থাপনসহ সামরিক মজুত ভারি করতে শুরু করেছে তারা। দেশটির নিরাপত্তা বিভাগের দাবি, ভারত শুরু থেকে 'কিছু বললেই জবাব দেয়া হবে' বলে বার বার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসলেও বাস্তবতা হচ্ছে পদে পদে মার খেয়ে ফিরছে তারা। লাদাখে চীনের হাতে পর্যুদস্ত ভারতীয় সেনারা কাশ্মীরে সে জেদ মেটানোর চেষ্টা করতে পারে বকেই তাদের এই প্রস্তুতি।

এই গেল ভারতের সীমান্তে প্রতিপক্ষের তৎপরতা। তবে এখানেই শেষ নয়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলমান এই পরিস্থিতির মাঝেই দেশটির অভ্যন্তরে অবস্থানকারী সশস্ত্র উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর তৎপরতা নজরে পড়ছে। বিশেষ করে ভারতীয় যুবাদের দলে ভেরাতে এবং ভেতর থেকে দেশটির তারুণ্যের শক্তি শুষে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। এরইমধ্য দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ২ শতাধিক তরুণের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, তাদের প্রত্যেকেরই পাকিস্তানী পাসপোর্ট ছিল।

সীমান্তে টহলরত নেপালি গুরখা ইউনিট- সংগৃহিত

সামগ্রিক পরিস্থিতি বলছে, সম্প্রতি নিজের ছোট ছোট প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর প্রতি বেপরোয়া দাম্ভিক আচরণ প্রদর্শনের যে মনোভাব ভারত দেখিয়ে আসছিলো তারই খেসারত টানতে শুরু করেছে দেশটি। সীমান্তবর্তী ও জলবন্টন সংক্রান্ত নানা  ইস্যুতে বার বার ভারতীয় স্বার্থনীতির কারণে ক্ষগিগ্রস্ত হলেও, ঐতিহ্যগত মিত্রতার প্রতি সম্মান রেখেই নিরব থেকেছে বাংলাদেশ। কিছুদিন আগেও ভারতীয়দের স্বার্থরক্ষায় ফেনী নদীর পানি বন্টন চুক্তি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের এই বন্ধুত্বের বিনিময়ে সীমান্তে শুধুই নিরীহ বাংলাদেশিদের লাশের গুনতি বাড়িয়ে দিচ্ছে ভারত। এটুকুই নয়, ভারত নিজের স্বার্থপরতার দায়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ইস্যুতে হস্তক্ষেপ ও প্রকাশ্যে ধৃষ্ট মন্তব্য উগলে দিয়ে এই বন্ধুত্বের অবমূল্যায়ণ করে চলছে।

তবে বাংলাদেশের মত এতটা সহনশীলতার প্রকাশ দেয়নি নেপাল ও ভুটান। দেশটিকে 'চুটকু' দেশ বলে ভারতীয়দের যে তাচ্ছিল্যের বুলি শোনা যায়, তাদের সরকারের আচরণে যেন তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিলো বার বার। শেষ অবদি ভারত সরকারের ধমকের সুরে কথা বলার বিপরীতে নাকের সামনে আঙুল তুলে সতর্কবার্তা জানান দিয়েছে নেপাল। ছোট হলেও, নেপালের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চোখ রাঙালে সরাসরি ভারতে ঢুকে হামলা চালানোর দুঃসাহসি বার্তাও পাঠায় তারা। এদিকে ভারতের দম্ভচূর্ণ করে নিজ দেশের কৃষকদের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে সীমান্তে সেচের পানি বন্ধ করে দিয়েছে ভুটান।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমঝোতা বা বন্ধুত্বের ভাষা ভুলতে বসা ভারত যেন ল্রক্তিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে বেশি রকম খাটো করে দেখতে শুরু করেছিলো। হয়তো তাদের ধারণা, বিশাল সেনাবহর থাকায় ভয়ে ছোট দেশগুলো বরাবরই মুখবুজে পিঠ পেতে দেবে। তবে ভারতের সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো। সেই সঙ্গে নিজের প্রতিবেশিদের সঙ্গে এই দুঃসম্পর্ক ক্রমশ বাড়িয়ে তুলেই চীনকে আঘাত হানার মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছে ভারতই। এখন চীনের আঘাতের ক্ষোভ ঝাড়তে যতই অন্যান্যদের সীমান্তে সংঘর্ষ আর নিরীহ মানুষ হত্যা বায়ারাবে ভারত, ততই পতনের দিকে এগিয়ে যাবে। ভারতীয় কূটনীতির চরম ব্যর্থতাই বর্তমান বিপর্যয়ের মূল কারণ।