• ঢাকা
  • বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০১৯, ০৪:৩২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৩, ২০১৯, ০৮:৪৮ পিএম

বিশেষ সাক্ষাৎকার

কৃষিজমি নষ্ট করে উন্নয়ন নয়

অনলাইন ডেস্ক
কৃষিজমি নষ্ট করে উন্নয়ন নয়
অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম নাজেম

........................

‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচুর ঘাটতি আছে, মারাত্মক ঘাটতি আছে, এ ব্যবস্থা কর্মমুখী নয়। কৃষি যান্ত্রিকায়ন করার ফলে যে শ্রম উদ্বৃত্ত থাকবে, তা শিল্প এবং অন্যত্র শিফট করা যাবে। দৈনিক জাগরণকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম নাজেম । সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এ খালেক

........................

জাগরণ : বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকার হচ্ছে শহরের সুবিধাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া। এ নির্বাচনি অঙ্গীকার নিয়ে মহলবিশেষ বিভ্রান্তি সৃষ্টি বা ভুল ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করছেন। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? 

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে যে বিষয়টি বলেছে তা হলো, ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের গ্রামগুলোকে শহরে রূপান্তরিত করা হবে। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে এর একটি ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে এই মর্মে যে, গ্রামগুলোকে ভেঙ্গেচুড়ে শহর বানানো হবে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। বাস্তবতা হচ্ছে শহরের মানুষগুলো নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু গ্রামের মানুষগুলো প্রায়শই এসব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে শহর ও গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মাঝে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে যেটা বলা হয়েছে তা হলো, শহুরের মানুষ যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তা গ্রামের মানুষের জন্য নিশ্চিত করা। অর্থাৎ গ্রামগুলোকে শহরের মতো করে গড়ে তোলা। 

শহর বলতে আমরা এমন একটি জনপদ বা স্থানকে বুঝি, যেখানে দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড বলতে আমরা শিল্প-কারখানাকে বুঝি। আর তৃতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড হলো নানা ধরনের সেবামূলক কর্মকাণ্ড। যেখানে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়, সেটাই হলো শহর। আর যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ের কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়, সেটাই হলো গ্রাম। বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামের প্রাথমিক কর্মকা- হলো কৃষি কাজ। কৃষির সঙ্গে যুক্ত আছে পোল্ট্রি, ডেইরি ইত্যাদি। শহর হচ্ছে এমন একটি স্থান যেখানে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড চলে। প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব পণ্য উৎপাদিত হয় সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করাকেই দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড বলা যেতে পারে। যেমন একজন কৃষক তার জমিতে তুলা চাষ করলেন। এটা হলো প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। কিন্তু সেই তুলা থেকে যখন সুতা তৈরি করা হবে, সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। তৃতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড হলো সেবা; যেমন ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক, বিউটি পার্লার ইত্যাদি। বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে যে সংখ্যক মানুষ বাস করে সেই পরিমাণ জমি নাই, যা দিয়ে তারা কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। ফলে উদ্বৃত্ত লোকবল শহরে চলে আসছে কর্মসংস্থানের জন্য। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গ্রামেও কিছু কিছু শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। গ্রামে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে গ্রামের উদ্বৃত্ত লোকগুলো শহরে আসতেই থাকবে। এতে শহরের জীবনযাত্রায় নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হবে। আমাদের দেশের সব শহরে একই মাত্রায় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। বড় বড় শহরে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে। ফলে গ্রামের মানুষের অভিবাসন প্রক্রিয়া বড় শহরের দিকেই বেশি লক্ষ্য করা যায়। আমাদের দেশের শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুলনায় বেশি পরিমাণ অভিবাসন ঘটছে। কারণ এসব শহরে তুলনামূলকভাবে বেশিসংখ্যক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড তথা শিল্প-কারখানা এবং সেবামূলক কর্মকাণ্ড যদি গ্রাম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা হলে গ্রামের মানুষগুলোকে কর্মসংস্থানের জন্য বড় শহরে আসতে হবে না। কারণ তারা শহরের সুবিধা গ্রামে থেকেই ভোগ করতে পারবে। 

জাগরণ : গ্রামাঞ্চলে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধে সরকার আইন করতে যাচ্ছে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : গ্রামের জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামের জমির পরিমাণ বাড়ছে না, বরং দিন দিনই গ্রামে জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। গ্রামে এখনো শহরের তুলনায় অনেক কম মূল্যে জমি পাওয়া যায়। অনেকেই স্বল্পমূল্যে জমি কিনে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণ করছে। এতে কৃষি জমির পরিমাণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। আগামীতে দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে হলে কৃষি জমিকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। কোথায় শিল্প স্থাপন করতে হবে, কোথায় বাড়িঘর নির্মাণ করতে হবে- এগুলো নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে। আমরা যখন সিলেটে যাই সেখানে দেখতে পাই একটি বিশাল বিলের মধ্যে সুন্দর একটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এখন সেই বাড়ির কারণে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে হচ্ছে। সেখানে কৃষির যে প্রতিবেশ আছে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ একটু চেষ্টা করলেই আমরা সেই কৃষি জমিকে আবাদের জন্যই নির্ধারিত করে রাখা যেত। বাড়িঘর নির্মাণের জন্য আলাদা জোন তৈরি করতে হবে। বাড়িঘর বা অন্য কোনো স্থাপনার জন্য যাতে উৎকৃষ্ট কৃষি জমি নষ্ট না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। জমির যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করার জন্যই সরকার ভূমি ব্যবহার আইন করতে যাচ্ছে। যাতে কেউ ইচ্ছে করলেই ফসলি জমি নষ্ট করে বাড়িঘর বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারেন। শহরের সুবিধাগুলো গ্রামে সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রামগুলোকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এমনভাবে গ্রামের উন্নয়ন করতে হবে যাতে আমরা সর্বোচ্চ পরিমাণ কৃষি জমিকে রক্ষা করতে পারি। বাগান, নদী, খাল ইত্যাদি গ্রামের ঐতিহ্যগুলোকে যে কোনো মূল্যেই হোক রক্ষা করতে হবে। গ্রামের পানিসম্পদকে রক্ষা করতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশের মোট জমির ৫৫ শতাংশ আছে কৃষির আওতাভুক্ত। মানুষের বসতির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ২৫ শতাংশ জমি। অর্থাৎ দেশের মোট আয়তনের চার ভাগের এক ভাগ জমি ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষের বসতি নির্মাণের জন্য। অবশ্য এই ২৫ শতাংশ জমি, যা মানুষের বসতি নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট বাগান, কৃষি, গাছপালা আছে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ জমিতে পানি এবং বনাঞ্চল রয়েছে। গত ২০ বছর ধরে আমরা এ ধারণাটি দেয়ার চেষ্টা করেছি যে, কোনো কারণেই আমরা দেশের জলাভূমিতে হাত দেব না। বনাঞ্চলকে নষ্ট করব না। যে ২০ শতাংশ জমিতে বনাঞ্চল এবং পানি রয়েছে তা আমরা কোনো কারণেই কমতে দেব না। আমরা কৃষি জমি নষ্ট করব না। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ জমিকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেব না। অবশিষ্ট যে ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে যেখানে বাড়িঘর রয়েছে, সেখানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে এই ২৫ শতাংশ জমি, যা আবাসন ব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত থাকবে তার মধ্যেই কল-কারখানা, হাট-বাজার স্থাপন, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল নির্মাণ ইত্যাদি কাজ করতে হবে। এই যে ২৫ শতাংশ জমি যা আবাসন ব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত থাকবে তা এখনো চিহ্নিত করা হয়নি। আমাদের উচিত হবে খুব দ্রুত এই ২৫ শতাংশ জমিকে নির্ধারিত এবং চিহ্নিত করা। আবাদযোগ্য জমি ৫৫ শতাংশ জমি, বসতি স্থাপনের জন্য ২৫ শতাংশ জমি এবং পানি ও বনাঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ২০ শতাংশ জমিকে আলাদা আলাদাভাবে চিহ্নিত করে জোনে ভাগ করতে হবে। শহরে যেমন কেউ ইচ্ছে করলেই যেখানে-সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ করতে পারে না। গ্রামেও সেই ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামেও বাড়িঘর বা শিল্প-কারখানা স্থাপনের পূর্বে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে অনুমতি গ্রহণের বিধান করতে হবে। নতুন নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণের চেয়ে আমাদের এখন উপরের দিকে যেতে হবে। অর্থাৎ আমরা গ্রামেও শহরের মতো বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করতে পারি। তবে খুব বেশি উঁচু ভবন নির্মাণ করা যাবে না। কারণ গ্রামের মানুষ গরু-ছাগল পালন করে। বসতবাড়ি বেশি উঁচু হলে সেখানে গরু-ছাগল পালন করা অসুবিধা হবে। বসতবাড়ি তৈরির জন্য জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের আরও সাশ্রয়ী হতে হবে। এটা করা গেলে গ্রামগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠবে এবং ভূমি ব্যবহারের আমরা সাশ্রয়ী হতে পারব। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হলে আমাদের গ্রামগুলো শহরের মতো হয়ে উঠতে পারে। যেমন, সিঙ্গাপুর পুরো দেশটাই তো শহর। সেখানে গ্রাম বলে আলাদা কিছু নেই। বাংলাদেশের জনসংখ্যার যে ঘনত্ব তা একটি শহরের জনঘনত্বের মতোই। ফ্রান্সে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ২ হাজার হলেই তাকে শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। গ্রামে যে ২৫ শতাংশ জমি আবাসন সুবিধার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে তা-সহ যদি আপনি হিসাব করেন তাহলে জনসংখ্যার ঘনত্বের বিচারের পুরো বাংলাদেশটাই শহর হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে। জাতীয় পর্যায়ে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব হলো প্রায় ১ হাজার ৩০০। এটা কৃষি জমি, জলাভূমি ইত্যাদিসহ। যে ২৫ শতাংশ জমি আবাসন ব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে তা বিবেচনায় নিলে এ ঘনত্ব হবে প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার। জনঘনত্ব বিবেচনা করলে পুরো বাংলাদেশটাই একটি শহর। কিন্তু শহরে যে সব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তা সেখানে নেই। সরকার গ্রামাঞ্চলে সেই শহুরে সুবিধাগুলো সম্প্রাসরণের কথাই বলেছেন। বর্তমানে আমাদের দেশে নগরায়ণ হচ্ছে। কিন্তু সেটা কীভাবে হচ্ছে? গ্রামের মানুষগুলো শহরে এসে নগরায়ণের সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ এভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরে নানা ধরনের জটিল সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যানজট বা এ ধরনের আরও অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। যেহেতু উন্নত মানের আধুনিক সুবিধা শহরেই সহজলভ্য, তাই গ্রামের মানুষও সেই সুবিধা ভোগ করার জন্য ক্রমশ শহরমুখী হচ্ছে। 

জাগরণ : আপনি আগে একবার সাক্ষাৎকারে শহর ও গ্রামের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। সেই অবস্থা কি এখনো বিদ্যমান আছে?

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : গ্রাম ও শহরের মাঝে অর্থনৈতিক বৈষম্য আগেও ছিল, এখনো আছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আগের চেয়েও বেড়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৯ শতাংশ গ্রামে বাস করে। অবশিষ্ট ৩১ শতাংশ শহরে বাস করে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে শহরের অবদান ৬০ শতাংশেরও বেশি। এ অবস্থা দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় ১ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার। এই ১ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলারের মধ্যে বিত্তবান মানুষের আয়ও যেমন আছে তেমনি বিত্তহীন মানুষের আয়ও আছে। আমার যদি সুনির্দিষ্টভাবে ঢাকা শহরের মানুষের গড় আয় বিবেচনা করি, তাহলে তা হবে ৫ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি। ঢাকা শহরেও গরিব মানুষ আছে। কিন্তু এখানে অনেক বড় লোক আছেন যারা প্রচুর আয় করে থাকেন। আর গ্রামের মানুষের আয় যদি আলাদাভাবে বিবেচনা করেন তাহলে তাদের আয় হবে বার্ষিক গড়ে ৫০০ মার্কিন ডলারের মতো। এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে শহর এবং গ্রামের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে। এ বৈষম্য সম্পদের বৈষম্য, আয়ের বৈষম্য। 

জাগরণ : আপনি আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে। কিন্তু তারা জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ অবদান রাখছে। এ অবস্থার কি পরিবর্তন হয়েছে, নাকি আগের মতোই আছে?

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : এ অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অবস্থা অনেকটা আগের মতোই আছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে শহরের অবদান ক্রমশ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে আয়ের যে বৈষম্য, তা হ্রাস পাচ্ছে না বরং ক্রমশ বাড়ছে। এ অবস্থা উদ্বেগজনক। আমরা যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে রাখব সেখানে তা আরও বেড়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই এ অবস্থা থেকে আমরা উত্তরণ ঘটাতে পারছি না। গ্রাম এবং শহরের মধ্যে আয় বৈষম্য বিদ্যমান আছে। গ্রামের মানুষের গড় আয় শহরের মানুষের তুলনায় অনেক কম। গ্রামের মানুষের আয় শহরের মানুষের তুলনায় কম বলেই গ্রাম থেকে মানুষ শহরে চলে আসছে। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন প্রক্রিয়ার এটাই হচ্ছে মূল কারণ। শহরে সাধারণভাবে আয়ের সুযোগ গ্রামের চেয়ে বেশি। শহরে এলে মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়। জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। এসব কারণে মানুষ গ্রাম থেকে শহরমুখী হয়। এ অবস্থায় শহরের আধুনিক সুবিধাসমূহ যদি গ্রামে সম্প্রসারিত করা যায়, তাহলে গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন প্রক্রিয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। যেমন, গ্রামে যদি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে গ্রামের মানুষ কেন শহরে আসবে? প্রত্যেক গ্রামে যদি শিল্প-কারখানা স্থাপন নাও করা যায় তাহলে উপজেলা পর্যায়ে শিল্প-কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে। তাহলে গ্রামের মানুষ তাদের নিজ নিজ উপজেলায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। তারা সকালে এসে কাজ করে বিকেলে বাড়িতে চলে যেতে পারবে। একান্ত অপারগ না হলে গ্রামের মানুষ শহরে থাকতে চায় না। মানুষ যদি তার নিজের বাড়িতে অবস্থান করে নিকটবর্তী এলাকায় চাকরি বা কর্মসংস্থান করতে পারে, তাহলে তার বাড়ি ভাড়া দেয়ার প্রয়োজন হবে না। এতে তার ব্যয় সাশ্রয় হবে। একটি মেয়ে শহরে তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করে যদি মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতন পায়, তাহলে বাড়ি ভাড়া বাবদ তাকে অন্তত ৩ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে যদি তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপন করা যায় তাহলে সে কাজ করে বিকেলবেলা তার বাড়িতে চলে যেতে পারে। কাজেই আমাদের কল-কারখানাগুলো বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। শ্রীলঙ্কায় এমন ব্যবস্থা আছে। শ্রীলঙ্কায় যে সব তৈরি পোশাক কারখানা আছে, তার বেশির ভাগই গ্রামে অবস্থিত।
  
জাগরণ : বর্তমান সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার হচ্ছে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১ কোটি ২৮ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে শহরের সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারণের বিষয়টি কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন? একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হচ্ছে, এগুলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতটা অবদান রাখবে?

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন তা ফিলোসফিক্যালি অত্যন্ত ভালো। দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হচ্ছে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখবে। কিন্তু এটা পুরোপুরি নির্ভর করছে বিনিয়োগের ওপর। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে গেলেই বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। আমরা আগামীতে কতটা বিনিয়োগ আহরণ করতে পারব তার ওপর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি অনেকটাই নির্ভর করছে। বিনিয়োগ, বিশেষ করে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ যত বেশি করবেন তত বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ বিনিয়োগ ব্যতীত ঈপ্সিত মাত্রায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে না। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে চাকরি প্রদানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করা যাবে না। সরকার যদি আগামীতে যথাযথ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশে যারা বিত্তবান শ্রেণির মানুষ আছেন, তাদের বিনিয়োগের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা। 

জাগরণ : কর্মসংস্থান আমরা সবাই চাই। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক বলে মনে করেন?

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মারাত্মক ঘাটতি আছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী নয়। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিলিয়ন বিলিয়ন মার্কিন ডলার চলে যায় বিদেশ থেকে আনা কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য। তৈরি পোশাক শিল্পের মধ্যম এবং উচ্চ পর্যায়ের টেকনিক্যাল পার্সনদের বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে। স্থানীয় লোকবল দিয়ে এটা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যদি উপযুক্ত লোকবল তৈরি করতে পারতাম, তাহলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যেত না। শিল্প-কারখানায় সব পর্যায়ে কাজ করার মতো উপযুক্ত লোকবল তৈরি করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা কর্মমুখী হওয়া উচিত। অর্থাৎ একজন ছাত্র বা ছাত্রী যাতে শিক্ষাজীবন শেষ করেই কাজ করার মতো উপযুক্ততা অর্জন করতে পারে সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। এমনকি বিদেশে যে জনশক্তি প্রেরণ করা হয়, তারাও প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ নন। ফলে তারা অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পায়। বাংলাদেশ থেকে প্রচুর সংখ্যক মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থান করছে। কিন্তু তাদের আয় প্রত্যাশিত নয়। তারা যদি প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ হতেন তাহলে আরও অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ দেশে প্রেরণ করতে পারতেন। আমাদের দেশ থেকে অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত লোকবল বিদেশে প্রেরণ করা হয় বলে তারা সেখানে গিয়ে নানা ধরনের অসুবিধায় পতিত হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানমুখী করে ঢেলে সাজাতে হবে। 

জাগরণ : সরকার কৃষি যান্ত্রিকায়নের জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কৃষি খাতে উদ্বৃত্ত শ্রমিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি বলে মনে করেন?

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : এখনই কৃষি খাতে অনেক লোকবল উদ্বৃত্ত আছে। ভবিষ্যতে ব্যাপকভাবে কৃষি যান্ত্রিকায়ন করা হলে আরও অনেক লোক উদ্বৃত্ত হবে। এটা হবেই। কিন্তু এতে শঙ্কিত হবার কিছু নেই। কারণ যান্ত্রিকায়নের ফলে কৃষি খাতে শ্রমশক্তি উদ্বৃত্ত হলেও নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। যান্ত্রিকায়নের ফলে কৃষি উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হতে পারে। সেখানে প্রচুর লোকের নতুন কর্মসংস্থান হবে।

জাগরণ : দৈনিক জাগরণ এর পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম নাজেম : আপনাকে এবং দৈনিক জাগরণকেও ধন্যবাদ। 

Space for Advertisement