• ঢাকা
  • বুধবার, ২২ মে, ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০১৯, ১০:০৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২৪, ২০১৯, ১০:০৯ পিএম

‘শ্রীলঙ্কায় হামলা সব দেশের জন্য দুটি বার্তা দিয়েছে’

জাকির হোসেন
‘শ্রীলঙ্কায় হামলা সব দেশের জন্য দুটি বার্তা দিয়েছে’
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ

শ্রীলঙ্কার বর্বরোচিত সিরিজ হামলা বিশ্বের সব দেশের জন্য দুটি বার্তা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাত্কি সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থার দুর্বলতা এবং নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে কী ভয়ঙ্কর ঘটনা পারে এর একটা বড় উদাহরণ হলো শ্রীলঙ্কা। 

তিনি জানান, বর্তমান বৈশ্বিক সন্ত্রাসের একটি বহুমাত্রিকতা আছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ছকে একে সাজানো যাবে না। এর জন্য সারাক্ষণ গবেষণা করা প্রয়োজন। আর গোয়েন্দা সংস্থার উচিত জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরো বিস্তৃত এবং আরো নিবিড় করা। কেননা জনগণের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের সন্ত্রাস দমন করা কঠিন। বুধবার (২৪ এপ্রিল) দৈনিক জাগরণকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।   

ইস্টার সানডে উদযাপনের সময় ২১ এপ্রিল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে  শ্রীলঙ্কায় ৩টি গির্জা ও ৩টি পাঁচতারকা হোটেলে একযোগে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩৫৯ জন। আহত পাঁচ শতাধিক।  নিহতদের মধ্যে ৩৯ জন বিদেশি নাগরিক। এ হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৬০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।  ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) এই হামলায় দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। তবে আইএস তাদের এই দাবির পেছনে এখনও কোনো প্রমাণ দেখায়নি বা দেখাতে পারেনি। মঙ্গলবার জঙ্গিদের নিজস্ব বার্তা সংস্থা আমাককে উদ্ধৃত করে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। 
শ্রীলঙ্কায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বাড়তি নিরপত্তা এবং নজরদারি জোরদার করা  হয়েছে। গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে মনিটরিং। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তাদের অব্যাহত অভিযানের কারণে যেসব স্থানীয় গোষ্ঠী জেএমবি, বা অন্য জঙ্গিসংগঠনগুলোর যে 
ধরনের প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামাদি থাকা দরকার তা না থাকায় তারা বড় ধরনের হামলা করার শক্তি হারিয়েছে। নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হলেও কোনো ধরনের হুমকি নেই। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব উগ্রবাদী বা জঙ্গি সংগঠনগুলো সবসময়ই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের মতের সঙ্গে মিল আছে এমন সংগঠনের সঙ্গে একটা যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে। 
 
এসব বিষয়ে অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ  বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার হামলা থেকে শুধু বাংলাদেশ নয়, সব দেশেরই শিক্ষা নেয়ার সুযোগ আছে। সবার জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো- সন্ত্রাসী হামলা যে  কোনো দেশে, যে কোনো জায়গায়, যে কোনো কারণে হতে পারে। তাই আমাদের গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের ওপর দৃষ্টি দেয়া দরকার। একইভাবে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন আবার ভাবমূর্তির সংকটে না পড়ে তা-ও দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে শ্রীলঙ্কায় গোয়েন্দা কার্যক্রম ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। অতীতে আমরা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চেও এমনটি দেখেছি। তাই এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার সুযোগ আছে।’ 

ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার দুর্বলতা থাকলে কী ভয়ঙ্কর ঘটনা পারে এর একটা বড় উদাহরণ হলো শ্রীলঙ্কা। এখানে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে বললে ভুল হবে। কেননা শ্রীলঙ্কান কর্তৃপক্ষ বলছে তারা একটি বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে হামলার আগাম খবর পেয়েছিল। এরপরও কেন তারা সক্রিয় হয়ে উঠল না এটা একটা বিষয়। আরেকটি হলো নিজেদের মধ্যে বিভাজন। বিশেষভাবে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একটি বড় বিভাজন তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা গত অক্টোবরে বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করেছিলেন। এই ঘটনায় দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়া। পরবর্তীতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে আবারও প্রধানমন্ত্রীর পদ ফিরে পান বিক্রমাসিংহে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এই বিভাজনের সুযোগ নিয়েছে হামলাকারীরা।

তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দা সংস্থার একট বড় ব্যর্থতা এই যে তারা জনগণের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারেনি। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে এটা প্রতিহত করতে হলে অবশ্যই জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী হামলা এই দুটি বড় শিক্ষা আমাদের দিয়েছে।

সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধের উপায় বিষয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধে আমাদের সার্বক্ষণিক তৎপর থাকতেই হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমান বৈশ্বিক সন্ত্রাসের একটি বহুমাত্রিকতা আছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ছকে একে সাজানো যাবে না। এ জন্য আমাদের  সারাক্ষণ এ নিয়ে গবেষণার মধ্যে থাকা দরকার। ঠিক একইভাবে গোয়েন্দা সংস্থার উচিত জনগণের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এর বিস্তৃতি আরো বাড়ানো প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা নিত্যদিনের ঘটনা। সন্ত্রাসীদের মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত পাকিস্তানও সন্ত্রাসী হামলা থেকে পরিত্রাণ পায়নি।  সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতেও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই অঞ্চলে কাশ্মীর সংকট সন্ত্রাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। 

শ্রীলঙ্কায় হামলা গত ১৫ বছরে এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় হামলা। ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ১৫০ জন নিহত হয়। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে  সেনাপরিচালিত স্কুলে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় প্রায় ১৫০ জন। 

২০১৬ সালে ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার আগে ও পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর মতাদর্শী বা স্বপ্রণোদিত অনুসারীর উপস্থিতি দাবি করেছিল। বাংলাদেশ তা অস্বীকার করলেও পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অবস্থানে অনড় আছে। 

২০১৭ সালে বিশ্বের মোট সন্ত্রাসী হামলার ৩১ শতাংশই ছিল দক্ষিণ এশিয়ায়। ওই বছর সন্ত্রাসে নিহত ২৯ শতাংশই এ অঞ্চলের। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবিষয়ক প্রতিবেদনগুলোতে বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে দক্ষিণ এশিয়াকে। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের এই অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক করে আসছে। সিডনি ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনোমিকস অ্যান্ড পিস এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বৈশ্বিক সন্ত্রাসের শিকার হওয়া প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে আফগানিস্তান দ্বিতীয়, পাকিস্তান পঞ্চম ও ভারত সপ্তম স্থানে আছে। বাংলাদেশ আছে ২৫তম স্থানে, শ্রীলঙ্কা ৪৯তম স্থানে।
 
শ্রীলঙ্কার ২ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ। হিন্দু ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, ৯ দশমিক ৭ শতাংশ মসুলমান এবং ৭ দশমিক ৬ শতাংশ খ্রিস্টান। 

১৯৮৩ সালের ২৩ জুলাই শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে ১৩ জন সৈন্যকে হত্যার মাধ্যমে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সূচনা করে তামিল টাইগাররা। ২০০৯ সালে সামরিক বাহিনীর হাতে তামিল বিদ্রোহী নেতা প্রভাকরণ নিহত হলে সেই গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। গৃহযুদ্ধ চলার সময় দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে সংঘাত-আত্মঘাতী বোমাহামলা ছিল প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। গত বছরের মার্চে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি সম্প্রদায়ের সদস্যরা মুসলমানদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা শুরু করলে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।  

জেড এইচ/ এফসি

Space for Advertisement