• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: মে ৬, ২০১৯, ০৪:৩৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ৬, ২০১৯, ১১:০৯ পিএম

সাক্ষাৎকারে আনু মুহাম্মদ

দু‍‍টি ব্যবসায়িক সংগঠনের হাতে দেশ জিম্মি

জাগরণ প্রতিবেদক
দু‍‍টি ব্যবসায়িক সংগঠনের হাতে দেশ জিম্মি

 দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, বাংলাদেশের শক্তিশালী দু’টি ব্যবসায়িক সংগঠনের হাতে দেশ জিম্মি হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে একটি হচ্ছে বিজিএমইএ এবং অন্যটি হচ্ছে ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন। তারা যা চাইছে তাই হচ্ছে। তাদের সঙ্গে সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে অবিরাম বোঝা-পড়া হচ্ছে। এবং পর্দার পেছনে বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হচ্ছে। দৈনিক জাগরণকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

দৈনিক জাগরণ : বিশ্বব্যাংক কয়েক দিন আগে তাদের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রশংসা করেছে। কিন্তু ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে বলে মন্তব্য করেছে। এই প্রেক্ষিতে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমান অবস্থা আপনার দৃষ্টিতে কেমন?

আনু মুহাম্মদ : দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেমন চলছে এ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের রায় বা সিদ্ধান্তের কোনো দরকার নেই। আমরা সবাই কম বেশি জানি ব্যাংকিং সেক্টর কেমন চলছে। বিশ্বব্যাংক ভালো বললেও তো আমরা বলতে পারবো না যে ব্যাংকিং সেক্টর ভালো চলছে। কোনো দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গেলে বিশ্বব্যাংক সাধারণত ভারসাম্য বজায় রেখে কথা বলে থাকে। তারা প্রথমে প্রশংসা করে। তারপর কিছুটা সমালোচনা করে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রশংসা করেনি এমন কোনো আমল নেই। 

অর্থাৎ সব সরকার আমলেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রশংসা করেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সমালোচনাও করেছে। তারা সব সময়ই ভারসাম্য বজায় রেখে কথা বলে। আর ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমান যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে বিশ্বব্যাংকেরও কিছুটা দায়-দায়িত্ব আছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য তারা অনেক কর্মসূচি নিয়ে এসেছিল। সেই সব সংস্কার কর্মসূচি কার্যত ব্যাংকিং খাতের উন্নতির পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে অবনতিই ঘটিয়েছে। খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, ব্যক্তি খাতের কিছু গোষ্ঠীর আধিপত্য এটা তৈরি হয়েছে তাদের সেই সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমেই। ব্যাংকিং সেক্টরে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা অভূতপূর্ব।

 ব্যাংকিং খাত কিছু গোষ্ঠীর এতটা যথেচ্ছাচারের মধ্যে এর আগে আর কখনোই পড়েনি। খেলাপি ঋণ আগেও ছিল। কিছু লোক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দিতো না। এ জন্য ব্যাংকগুলো সমস্যায় পড়তো। তারপরও ব্যাংকগুলো কিছুটা হলেও নিয়ম-কানুন মেনে চলার চেষ্টা করতো। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ঋণ গ্রহণ এবং ঋণ খেলাপি হবার জন্য কোনো নিয়ম-কানুনের প্রয়োজন হয় না, যদি তাদের সঙ্গে সরকারের ভালো সম্পর্ক থাকে। অর্থাৎ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে এখন ব্যাংকিং সেক্টরে যা ইচ্ছে তাই করা যায়।  এ জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হয় না।

 

 সরকারের মধ্যে যদি কমিশন ভোগি থাকে তাহলে কোনো নিয়ম-কানুন না মানলেও চলে। বাংলাদেশে এখন দু’টি ব্যবসায়িক সংগঠন খুবই শক্তিশালি। এরমধ্যে একটি হচ্ছে বিজিএমইএ এবং অন্যটি হচ্ছে ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন। তারা যা চাইছে তাই হচ্ছে। তাদের সঙ্গে সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে অবিরাম বোঝা-পড়া হচ্ছে। এবং পর্দার পেছনে বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হচ্ছে। এসব সংগঠন যেহেতু দেখছে তারা যা চাইছে তাই পাচ্ছে, সুতরাং তারা অবিরাম শুধু চেয়েই যাচ্ছে। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরৎ দিচ্ছে না তাদেরই বারবার সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে।

 যারা সৎ এবং ভালো ঋণ গ্রহীতা তাদের তেমন কোনো সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে না। ফলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারিরা হতাশ এবং নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। কোনো কোনো ব্যাংকের মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে কিছু মুখচেনা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ খেলাপিদের অনেকবার বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে চলেছেন তাদের তেমন কোনো সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আগামীতে কেউ আর ঋণ গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার জন্য উৎসাহ বোধ করবে না। 

কারণ তারা দেখছে,ঋণের কিস্তি ফেরত না দিলেও কোনো অসুবিধা হয় না। বরং বারবার তাদের সুবিধা প্রদান করা হয়। কেউ যদি ঋণ খেলাপি হয় তাহলে তার সুবিধা অনেক বেশি। কেউ যদি ঋণ খেলাপি হয় তাহলে তাকে সুদ প্রদান করতে হয় কম হারে। তার আরো বেশি ঋণ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। সরকারের নিকট ঋণ খেলাপির মর্যাদাও বেশি থাকে। আর যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন তাদের মর্যাদা থাকে কম। তারা চাপের মধ্যে থাকেন। এ ধরনের একটি ভয়ঙ্কর অন্যায় ব্যাংকিং খাতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। প্রতিবছর দেশ থেকে যে ৭০ হাজার কোটি থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয় এটা এই গোষ্ঠীর মাধ্যমেই হচ্ছে। 

দৈনিক জাগরণ : কিছু দিন ধরে ব্যাংকিং সেক্টরে আইনি সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঋণ হিসাব অবলোপনের সময়সীমা কমানো হয়েছে। পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা পরিবর্তন করা হচ্ছে। আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে যা কার্যত খেলাপি ঋণকে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা মাত্র। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানাবেন কি?

আনু মুহাম্মদ: বর্তমানে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ এবং অবলোপনের নীতিমালা সহজীকরণ করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে তার উদ্দেশ্য খেলাপি ঋণ আদায় করা নয়। বরং কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো। আগেও এ ধরনের সুবিধা দেয়া হয়েছে। ঋণ হিসাব পুন:তফসিলিকরণের নীতিমালা সহজীকরণের ফলে খেলাপি ঋণ কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানো যাবে। কারণ খেলাপি ঋণ আদায় না করেও তাকে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ না দেখনোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

 বর্তমান অর্থমন্ত্রী যেভাবে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছেন তা অব্যাহত থাকলে আগামীতে দেখতে পাবো,ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। যদি ঋণের কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো যেতো তাহলে অবশ্যই তাকে ধন্যবাদ দেয়া যেতো কিন্তু তা তো হচ্ছে না। বাস্তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগামীতে ভয়াবহভাবে বেড়ে যাবে। এটা ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ হচ্ছে। পুরো কাজটিই হচ্ছে হিসাবের মারপ্যাঁচ। অর্থমন্ত্রী যুক্তি দিচ্ছেন তার এই সব সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু আমরা সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি,এখানে কৃত্রিম উপায়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো কখনোই শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না। 

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে যারা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে শীর্ষ ঋণ খেলাপি হিসেবে পরিচিত তারাই এখন নীতি নির্ধারণ করছেন। সমস্যাটি হচ্ছে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে তারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে আছেন। আইনগতভাবেও এটা হতে পারে না। এটা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হয়। যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকেন তাদের প্রতিষ্ঠান এভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারে না। সিদ্ধান্ত যেহেতু তারাই নিচ্ছেন তাই সব সিদ্ধান্তই তাদের স্বার্থের অনুকূলে যাচ্ছে। যারা ঋণ খেলাপি তারাই সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন।

 কাজেই এখানে ন্যায় বিচার হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। ব্যাংকিং খাত এমন একটি অবস্থার মধ্যে পড়ার কারণে আসলেই এই খাতটি ‘তলাবিহীন ঝুঁড়ি’তে পরিণত হয়েছে। সরকার থেকে পাবলিক মানি দিয়ে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করা হচ্ছে। সেই টাকা ব্যাংকিং খাতে না থেকে চলে যাচ্ছে কিছু মানুষের পকেটে। এই অবস্থায় নিয়ম মাফিক ঋণ গ্রহণ করা এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হবে। আগামীতে ব্যাংকিং খাত বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হবে। তারল্য সঙ্কট দেখা দেবে। সরকারি প্রকল্প অর্থায়নের জন্য আবারো জনগণের উপর চাপ দিতে হবে। ট্যাক্স বাড়তে পারে। ফলে গণদুর্ভোগ বৃদ্ধি পেতে পারে। 

দৈনিক জাগরণ : এই অবস্থায় আগামীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং কি আস্থার সঙ্কটে পতিত হতে পারে বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যে অবস্থার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে তাতে আগামীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ব্যাংকিং খাতের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকার কথা নয়। অবশ্য এভাবে যদি অর্থ পাচার হয় তাহলে সেটা আন্তর্জাতিক বিশ্বের ফিন্যান্সিয়াল দানবরা বেশ পছন্দ করবে। কারণ এভাবে কোনো দেশের অর্থ লুণ্ঠন হলে তারা লাভবান হতে পারবেন। বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় অনেক ব্যাংক আছে যাদের গতি প্রবাহ নির্ভর করে অন্য দেশের অবৈধ টাকার উপর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যারা অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত তাদের নিকট থেকে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রশংসিত হতে পারে। 

দৈনিক জাগরণ : নতুন ব্যাংকগুলোর অনেকগুলোই ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে অনেকেই মার্জারের কথা বলছেন। কিন্তু শোনা যাচ্ছে সরকার আরো কয়েকটি নতুন ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দিতে পারেন। আপনি এ ব্যাপারে কি বলবেন?

আনু মুহাম্মদ: সরকার এখন একচেটিয়া ক্ষমতায় আছেন। সরকারের মধ্যে কোনো জবাবদিহিতা নেই, স্বচ্ছতা নেই। ফলে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত লোকজনের আকাক্সখা এবং লোভ বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। সরকার এখন চাইলে যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। তাই সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত লোকজন আরো সহজে কিভাবে টাকা বানানো যায় সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। আর বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টর হচ্ছে টাকা বানানোর একটি চমৎকার ক্ষেত্র। ফলে অনেকেই ব্যাংক স্থাপন করতে চাইছে। সরকারও প্রয়োজন থাক আর নাই থাক ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছেন। পাবলিক মানি লুণ্ঠন করার জন্য ব্যাংকিং সেক্টরকে একটি সুন্দর উপায় হিসেবে দেখছেন অনেকেই। আর এ কারণেই ব্যাংক স্থাপনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।

দৈনিক জাগরণ : বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এই দু’টি বিভাগ দ্বৈতভাবে ব্যাংকিং সেক্টর পরিচালনা করছে। এতে অনেক সময় সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সে জন্য অনেকেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশনকে বিলুপ্ত করার কথা বলছেন। আপনি কি বলেন?

আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মধ্যে এখন আর কোনো সংঘাত নেই। অর্থমন্ত্রণালয় যা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেটাই বাস্তবায়ন করে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা কোনো সত্ত্বা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নির্দেশনায় অন্য দশটি প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে গুরুত্ব এবং দায়িত্ব তার কোনো বহিঃপ্রকাশ আমরা এখন আর দেখছি না। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আমরা লক্ষ্য করছি না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়ে গেলো তার কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হলো না। যারা এই অপকর্মের জন্য দায়ী তাদের এখনো পর্যন্ত শনাক্ত করা হয় নি। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী একটি মহল দ্বারা শৃঙ্ক্ষলিত হয়ে পড়েছে এবং তাদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানিক যে শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক যে দায়িত্ব, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে দূরদর্শী যে প্রক্রিয়া তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। 

দৈনিক জাগরণ : ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ঋণ খেলাপিদের যেভাবে সুবিধা দেয়া হচ্ছে তাতে আগামীতে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য কি আরো বাড়বে বলে মনে করেন?            
আনু মুহাম্মদ: বৈষম্য তো বাড়বেই। বিগত ১০বছরে বাংলাদেশে বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে যে তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। যাদেরে হাতে বিরাট অংকের টাকা জমা আছে তাদের আয়ের একটি বড় অংশই হচ্ছে অবৈধ আয়। এই অবৈধ আয়ের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক হিসাবের মধ্যে নাই। এগুলো হিসাবের মধ্যে আনা গেলে দেখা যাবে বৈষম্য আরো অনেক বেশি। যেভাবে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে,কিছু লোকের হাতে অর্থ পুঞ্জিভুত করার ব্যবস্থা হচ্ছে তাতে আগামীতে দেশের মানুষের আয় বৈষম্য ভয়াবহ আকার ধারন করতে যাচ্ছে। 

দৈনিক জাগরণ : প্রতি বারই দেখা যায় জাতীয় নির্বাচনের পর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় কিন্তু এবার একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এর কারণ কি?

আনু মুহাম্মদ: এর কারণ হচ্ছে সম্প্রতি যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তা নানা কারণেই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠান যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে অর্থনীতির যে নিজস্ব গতি তাও ব্যাহত হয়। তখন কারা বিনিয়োগ করবে,কতটা বিনিয়োগ করবে তা নির্ভর করে সরকারি সিদ্ধান্তের উপর।

 জাতীয় প্রয়োজন বা ব্যক্তির চাওয়া পাওয়া সেখানে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। যেহেতু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অতিমাত্রায় কেন্দ্রভুত তাই এই অবস্থায় যারা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তারাই বিনিয়োগ করবে। অন্য বিনিয়োগকারিরা এই অবস্থায় বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। বর্তমানে আমরা সেই অবস্থাই প্রত্যক্ষ করছি। একই অবস্থা আমরা শেয়ার বাজারেও প্রত্যক্ষ করছি। নানাভাবে চেষ্টা করা সত্বেও শেয়ার বাজার চাঙ্গা হচ্ছে না। শেয়ার বাজার বর্তমানে নিজস্ব মাত্রার ফাঁদের মধ্যে আটকে আছে। শেয়ার বাজারে ধ্বংস নামলেও তো সরকার বা অর্থমন্ত্রীর কিছু আসে যায় না। এর আগে বেশ কয়েকবার শেয়ার বাজারে ধ্বস নামলেও তার কোনো প্রতিকার হয় নি। ফলে শেয়ার বাজারের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে গেছে।
  
দৈনিক জাগরণ : দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনেতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এগুলো দেশের অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: কোন বিনিয়োগে কেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা লাভজনক হবে তা নির্ভর করে বিনিয়োগটা কোথায় হচ্ছে তার উপর। যদি প্রকৃত অর্থেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারি প্রকল্পে বিনিয়োগ হয় তাহলে তার ফলাফল এক রকম হবে। আবার শুধু কিছু হোটেল রেস্তোরা বা জমি দখলের জন্য বিনিয়োগ করা হয় তাহলে তার রেজাল্ট হবে অন্য রকম। কাজেই এইসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারা বিনিয়োগ করছেন, কোন খাতে বিনিয়োগ করছেন তার উপরই সবকিছু নির্ভর করছে।


 দেশের সামান্য কিছু শিল্পগোষ্ঠীর হাতে সাধারণ মানুষের জমি চলে যাচ্ছে। এই জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ফলে গ্রামীণ কৃষি জমি নষ্ট হবে। পুরো পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। কাজেই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো যাতে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখে তার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আমাদের অর্থনীতিতে কেমন অবদান রাখবে তা পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা-গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ রাখতে হবে। ভারতে কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল বাস্তবে তার এক দশমাংশও হয় নি। বাংলাদেশের প্রক্রিয়া আরো দুর্বল এবং অস্বচ্ছ। কাজেই আমাদের এখানে কতটা কর্মসংস্থান হবে বা জাতীয় উন্নয়নে এগুলো কতটা অবদান রাখবে পারবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। 

দৈনিক জাগরণ : সরকার আগামী ৫ বছরে দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলছেন। এটা কতটা সম্ভব বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: এগুলো তো মুখের কথা বলে। দেশে কতটা কর্মসংস্থারে সুযোগ সৃষ্টি হবে নির্ভর করে কেমন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। কারা বিনিয়োগ করছে, যে প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হচ্ছে তা কর্মটা শ্রমঘন প্রতিষ্ঠান তার উপর। এগুলো হচ্ছে কোনো দায়-দায়িত্ব ছাড়াই একটি ঘোষণা দিয়ে দেয়া। যেমন, ওয়াসার এমডি বলেছেন, ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয়। এ ধরনের ঘোষণা দিয়ে দিলে তা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এসব কথা আমরা আগেও শুনেছি। কিন্তু রেজাল্ট কি তা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। সরকার যেভাবে বিভিন্ন্ প্রকল্প গ্রহণ করছে তার সঙ্গে এই ঘোষণার কোনো মিল নেই। সরকার এমন অনেক প্রকল্প গ্রহণ করছেন যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে কর্মসংস্থান নষ্ট হচ্ছে। 

 

 

 

দৈনিক জাগরণ : বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ নাকি লেবার ইনটেনসিভ শিল্প কোনটা দরকার? 

আনু মুহাম্মদ: আমি মনে করি, একটি দেশের জন্য দু’ ধরনের শিল্প-কারখানারই দরকার আছে। কিছু শিল্প আছে যেখানে প্রচুর ক্যাপিটালের দরকার হয় সেখানে ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ শিল্পায়ন প্রয়োজন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেবার ইনটেনসিভ শিল্প প্রয়োজন সেখানে তাই করতে হবে। কাঁচামাল এবং ভোগ্য পণ্য তৈরি করার যেমন দরকার আছে। তেমনি মেশিনারি তৈরিরও প্রয়োজন আছে। কাজেই প্রয়োজনের নিরিখেই নির্ধারণ করতে হবে আমাদের দেশে কোন্ ধরনের শিল্প দরকার। উভয় ধরনের শিল্পায়নের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এই ভারসাম্য সরকারই প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। ব্যক্তি পুঁজিপতিগণ ভারসাম্যের বিষয়টি দেখবে না তারা খুঁজবে কোথায় লাভ বেশি হবে।                               

Islami Bank