• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: মে ৯, ২০১৯, ০৫:২৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ৯, ২০১৯, ১১:২৭ পিএম

সাক্ষাৎকারে ড.জাহিদ হোসেন

‘খেলাপিদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশ্রয়  দিলে হিতে বিপরীত হবেই ’

জাগরণ প্রতিবেদক
‘খেলাপিদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশ্রয়  দিলে হিতে বিপরীত হবেই ’

ড.জাহিদ হোসেন। দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদ। লীড ইকোনমিস্ট হিসেবে তিনি
বিশ্বব্যাংক,ঢাকা অফিসে কর্মরত রয়েছেন। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে প্রদত্ত ঋণের টাকা নির্ধারিত
সময়ে ফেরত না আসাকে তিনি দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের প্রধান সমস্যা হিসাবে মনে করেন। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং
লোনের(এনপিএল) হিসাবের মধ্যে নানা ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। দৈনিক জাগরণকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত
করেন।

দৈনিক জাগরণ: কয়েক দিন আগে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভূয়সী প্রশংসা
করা হয়েছে। তবে ব্যাংকিং সেক্টরকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের
প্রেক্ষিতে ব্যাংকিং সেক্টরের কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন?

ড.জাহিদ হোসেন : একটি দেশের সার্বিক আর্থিক স্বচ্ছলতার কথা যদি আমরা বলি তাহলে দেখবো, ব্যাংকিং সেক্টর যদি স্বচ্ছল এবংশক্তিশালি না হয় তাহলে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি কোনোভাবেই স্বচ্ছল এবং শক্তিশালি হতে পারে না। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিংসেক্টরের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে প্রদত্ত ঋণের টাকা নির্ধারিত সময়ে ফেরৎ না আসা। একটি ব্যাংকের কাজ কি? একটি ব্যাংক অনেক ধরনের কাজ করে থাকে। কিন্তু তার প্রধান কাজ হচ্ছে আমানতকারিদের নিকট থেকে আমানত সংগ্রহ করা এবং সেই টাকা উদ্যোক্তাদের নিকট ঋণহিসেবে প্রদান করা।

 কিন্তু সেই ঋণের টাকা যদি ঠিকভাবে নির্ধারিত সময়ে আদায় না হয় তাহলে ব্যাংক ব্যবসায় ভালোভাবে চলতে পারেনা। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোনের(এনপিএল) হিসাবের মধ্যে নানা ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। তারপরও যেহিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাংকিং সেক্টরের মোট এ্যাসেটের ১০ শতাংশ বাসাড়ে ১০ শতাংশ এনপিএল। গত সেপ্টেম্বর মাসে এনপিএল’র হার সাড়ে ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ডিসেম্বর মাসে এসে এটা কিছুটা
কমেছে। অবশ্য ডিসেম্বর মাসে খেলাপি ঋণ কমার নানা কারণ রয়েছে।
 
ব্যাংকেংর ব্যালেন্স সীট ক্লিন দেখানোর জন্য এ সময় যেনোতোনোভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখনোর উদ্যোগ নেয়া হয়। পঞ্জিকা বছরের শেষ ত্রৈমাসিকে খেলাপি ঋণ আদায় বেশি হয় কিনা সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই। তবে এ সময় ঋণ হিসাব পুন:তফসিলিকরণ,ঋণ হিসাব অবলোপন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ঋণের কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো হয় না। যেগুলোকে আমরা ম্যাক্রো পটেনশিয়াল ইন্ডিকেটর বলি সেখানে কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অন্য দিকে ব্যাংকের আমানতের গ্রোথও আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। 

ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের উপস্থিতি থাকবেই। কিন্তু আমাদের দেশে এর হার পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা বেশি। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে খেলাপি ঋণেরপরিমাণ কমানোর জন্য আমরা কি ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং সেটা খেলাপি ঋণ সৃষ্টির মূল কারণকে এড্রেস করছে কিনা? উদ্বেগের বিষয় সেখানেই।সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের কথা শোনা যাচ্ছে তাতে দু’ধরনের আলোচনা দেখা যাচ্ছে। ঋণ খেলাপিদের আমরা ধরতে পারছি না। ঋণ খেলাপি হলে তাদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়ার কথা তা আমরা নিতে পারছি না।ব্যাংকিং আইনেও অনেক ফাঁক-ফোকর আছে। কাজেই আদালতে রীট করলেই ঋণ খেলাপিরা খেলাপির তালিকা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছে। তারা নতুন করে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারে। 

অন্যান্য পলিসি সাপোর্ট যা যা আছে তা তারা পেতে পারেন ঋণ খেলাপি হওয়া সত্বেও। মূলত এ কারণেই ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান আইনের সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। এটা ঠিক আছে। আইন তো মানুষই তৈরি করে। আর সময়ের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে আইনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই নতুন আইন প্রণয়ন অথবা বিদ্যমান আইনের সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে ফাইন্যান্সিয়াল লোন কোর্স যেগুলো আছে এবং অলটারনেটিভ ডিসপুট রেজুলেশনের যে সিস্টেমগুলো করা হয়েছে তা সঠিকভাবে কাজ করছে না। 

সেই নিয়ে সংস্কারের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। অন্য দিকে যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে সেখানে দেখা যাচ্ছে,কমিটি থেকে সুপারিশ করা হলো যে রিস্ক ক্যাজুলিং এর কন্ডিশনগুলো আরো শিথিল করে দেয়া হোক। ঋণ হিসাব পুন:তফসিলিকরণের ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্টের হার কমিয়ে দেয়া হোক। সুদের হার কম, পুন:তফসিলিকরণের মেয়াদ বাড়ানো, ঋণ হিসাব অবলোপনের সময়সীমা কমানো, (আগে যেখানে একটি ঋণ হিসাব মন্দ ঋণ হিসেবে আখ্যায়িত হবার পর ৫ বছর অতিক্রান্ত হলে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের এবং শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ পূর্বক অবলোপন করা যেতো। এখন সেখানে ৩ বছর অতিক্রান্ত হলেই অবলোপন করা যাবে। মামলা দায়ের এবং শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণের শর্তও শিথিল করা হয়েছে।)অর্থাৎ সার্বিকভাবে শিথিলতার দিকে যাওয়া হচ্ছে। এ ধরনের আইনি সংস্কারের যুক্তি হলো,যারা ঋণ ফেরৎ দিতে পারছে না তারা অনেক বিপদগ্রস্থ হয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না। 

ফলে তারা অনিচ্ছা সত্বেও ঋণ খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। আমরা যদি এদের সহায়তা না করি তাহলে তাদের ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে কি করে? ঋণ গ্রহীতাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান যদি না চলে তাহলে দেশের কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে। এতে চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশের রফতানি,বিনিয়োগ,উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বর্তমানে দেশের দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে আরো ৩৭ হাজার কোটি টাকা যোগ হবে,যা অবলোপন করা হয়েছে। সঠিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে যেতে পারে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট প্রদত্ত ঋণের ১০ শতাংশ বা সাড়ে ১০ শতাংশ। 

আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে খেলাপি ঋণ হিসাব করলে এটা আরো অনেক বেড়ে যেতে পারে। বর্তমানে যে সব ঋণ খেলাপি আছেন তাদের মধ্যে যদি সিংহভাগই অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি হতেন তাহলে বুঝতাম এসব পদক্ষেপ ডায়গোনোসিসের সঙ্গে ট্রিটমেন্টের সঙ্গতি আছে। দেশের অর্থনীতিতে এমন কোনো ঘটনা কি ঘটেছে যে কারণে আপনার সিদ্ধান্তের বাইরের কোনো ফ্যাক্টরের কারণে আপনি ঋণ খেলাপি হয়েছেন? এমন তো হয়নি যে দেশের বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে। অথবা দেশের রাজনীতিতে মারাত্মক কোনো সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এমন তো হয় নি যে,বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের কোনো মন্দার সৃষ্টি হয়েছে। অথবা আপনি যেখানে থাকেন সেখানে চকবাজারের মতো মারাত্মক কোনো অগ্নিকান্ড সংঘঠিত হয়েছে। তাহলে আপনি কেনো ঋণের কিস্তি ফেরৎ দিতে পারবেন না? 

আপনি যদি ব্যবসায়-বাণিজ্য করেন তাহলে তো তাতে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি থাকবেই। ঝুঁকি আছে বলেই তো আপনি মুনাফার অংশিদার হতে পারেন। আপনি লাভের অংশিদার হবেন কিন্তু লোকসানের দায়ভার বহন করবেন না তা তো হয় না। আপনি ব্যবসায় লোকসান দিলে কি ব্যাংকে গিয়ে বলবেন, আমি ব্যবসায় লোকসান দিয়েছি আমি ঋণের কিস্তি ফেরৎ দিতে পারবো না? ব্যাংকতো এ ধরনের যুক্তি মানবে না। এই ভাবে তো অনিচ্ছাকৃত ঋণ ডিফাইন হয় না। ব্যাংক তো কোনো ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নয় বা কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানও নয়। আমরা ব্যাংকিং সেক্টরে যাদের ঋণ খেলাপি হিসেবে চিনি তাদের অধিকাংশকেই অনিচ্ছকৃত ঋণ খেলাপি বলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। 
ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশ্রয় দেয়া হয় তাহলে তা হিতে বিপরীত হবেই। যারা অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি তারাও ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি হবার জন্য প্রলুব্ধ হতে পারে। এমন কি যারা নিয়মিত ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করছেন তারাও ঋণ খেলাপি হবার জন্য প্রলুব্দ হতে পারে। কারণ কোনো কারণে আপনি যদি প্রমান করতে পারেন যে,আপনি অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি তাহলে এই সুবিধাগুলো পাচ্ছেন। ব্যাংকিং সেক্টরের সমস্যা চিন্িহত করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে এটা ঠিকই আছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ এগুচ্ছে না। কাজ এগুচ্ছে অন্য ক্ষেত্রে। 

দৈনিক জাগরণ : নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আজ থেকে আর খেলাপি ঋণ বাড়বে না। তারপর ব্যাংকিংসেক্টরের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নানা ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছেন। এসব পদক্ষেপ কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোরউদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটা আপনি কোন্ দৃষ্টিতে দেখছেন?

ড.জাহিদ হোসেন: অর্থমন্ত্রী যে কথা বলেছেন তা ঠিকই আছে। আমি চেষ্টা করবো আজ থেকে যেনো খেলাপি ঋণের পরিমাণ না বাড়ে। কিন্তুবাস্তব অবস্থার উন্নতি না হলেও যদি কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হয় তাহলে তো কোনো লাভ হবে না। আমিঋণের কিস্তি আদায় করতে পারলাম না কিন্তু আইনি সংস্কারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণকে খেলাপি হিসেবে দেখালাম না তাহলে কি লাভ হবে?এমনও শোনা যাচ্ছে ঋণ শ্রেণি বিন্যাসকরণের যে নীতিমালাগুলো আছে তাও পরিবর্তন করা হচ্ছে। ঋণ হিসাব শ্রেণিকৃত করার ক্ষেত্রে যেনিয়ম আছে যেমন, ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা উত্তীর্ণ হবার পর ৯০দিন অতিবাহিত হলে তাকে সাবস্ট্যান্ডার্ড বা নিম্ন মানের ঋণ
হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

 সন্দেহজনক ঋণ হিসাবের ক্ষেত্রে ১৮০দিন এবং মন্দ ঋণ হবার ক্ষেত্রে ৩৬০ দিনের যে শর্ত ছিল তারও শিথিলকরা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। প্রস্তাবিত নতুন আইনি সংস্কারে কোনো ঋণ হিসাবকে নি¤œমান হিসেবে আখ্যায়িত করার জন্য কিস্তিপরিশোধের নির্ধারিত দিন হতে ১৮০ দিন, সন্দেগহজনক ঋণের ক্ষেত্রে ৩৬০দিন এবং মন্দ ঋণ হতে হলে নির্ধারিত পরিশোধের মেয়াদ হতে প্রায় ২ বছর সময় প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ঋণ হিসাব শ্রেণি বিন্যাসকরণের জন্য যে নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানের।
আমরা এখন ব্যাসেল-টু’তে আছি। ব্যাসেল-থ্রি’তে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তো স্টার্ন্ডাডগুলো আরো একটু কঠোর। 

দৈনিক জাগরণ : এসব আইনি পরিবর্তন বা সংস্কার যদি করা হয় তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হবে কি?

ড. জাহিদ হোসেন: অবশ্যই। এসব আইনি সংস্কার করা হলে বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আস্থার সঙ্কটে পতিত হতে পারে। এই সব ব্যাংক যে এলসি খুলছে তার বিপরীতে বিদেশি ব্যাংক যখন অর্থায়ন করবে তখন আস্থার ব্যাপারটি বড় হয়ে দেখা দিবে। তারা যদি বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর উপর আস্থা রাখতে না পারে তাহলে তারা যেসব ফি আরোপ করে থাকে তার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর এলসি’র বিপরীতে অর্থায়ন করতে নাও চাইতে পারে। এই অবস্থায় তারা অন্য কোনোব্যাংকের গ্যারান্টি চাইতে পারে। গ্যারান্টি চাইলে তার জন্য তো ফি দিতে হবে। কাজেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থায়নের ব্যয় বেড়েযাবে,যদি আপনার ব্যাংক ব্যবস্থার উপর ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল কমিউনিটির আস্থা কমে যায়। 

দৈনিক জাগরণ : এর আগে ৫০০ কোটি টাকা এবং তদুর্দ্ধ অঙ্কের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনর্গঠন করে হয়েছিল। যারা এই সুবিধা নিয়েছিলেন
তাদের অনেকেই পরবর্তীতে ঋণের কিস্তি ফেরৎ দেয় নি। এর কারণ কি?

ড.জাহিদ হোসেন : এখানেই তো আবারো পুরনো বিষয়ে ফিরে আসতে হয়। আপনি যদি প্রকৃত অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিকে এ ধরনের সুবিধাপ্রদান করেন তাহলে তা কার্যকর হবে। কিন্তু যারা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি বা যারা এ ধরনের সুবিধা পাবার জন্য ঋণ খেলাপি হচ্ছেন তাদের এধরনের সুবিধা দিলে তারা আবারো এমন সুবিধা পেতে চাইবে। আমরা যাকে মোরাল হ্যাজার্ড যাকে বলি তার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। পলিসি’রকারণে তাদের আচরণ বদলে যাচ্ছে। যে আচরণটা বন্ধ করার জন্য আপনি পলিসিটা করছেন সেই আচরণটাই উৎসাহিত হচ্ছে। 

দৈনিক জাগরণ : শোনা যাচ্ছে,যারা বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ঋণ খেলাপি হয়েছেন তাদের ঋণ হিসাব পুন:তফসিলিকরণেল ক্ষেত্রে সুদেরহার হবে ৭ শতাংশ। আর যারা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি তাদের ক্ষেত্রে সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। এতে কি নিয়মিত ঋণের কিস্তি প্রদানকারিঋণ গ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে না? কারণ তাদের তো এখনো ডাবল ডিজিটে সুদ প্রদান করতে হচ্ছে।

ড.জাহিদ হোসেন: অরিজিনাল ঋণের যে শর্তাবলি ঋণ হিসাব পুন:তফসিলিকরণের শর্তাবলি তার চেয়ে কঠিন হতে হবে। তা নাহলে সবাইতো অরিজিনাল ঋণ হিসাবকে পুন:তফসিলিকরণ করতে চাইবে। ঋণ খেলাপিদের যদি তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেয়া হয় তাহলে তো সবাইখেলাপি হয়েই এই সুবিধা পেতে চাইবে। এই অবস্থায় অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। 

দৈনিক জাগরণ: প্রতি বছরই দেখা যায়,বিশ্বব্যাংক বা এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের প্রদর্শিত প্রবৃদ্ধির হার নিয়েদ্বিমত প্রকাশ করে থাকে। অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, চলতি অর্থ বছরে ৮দশমিক ১৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে। আপনি কি বলেন? 

ড.জাহিদ হোসেন: পরিসংখ্যান নিয়ে অতীত বিতর্ক থেকে আমরা কি শিখলাম? এতে আলোর চেয়ে তাপেরই সৃষ্টি হয় বেশি। অর্থমন্ত্রী কিন্তুকিছু দিন আগে ওয়াশিংটনে গিয়ে বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন,আমি বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানাই যে তারা ৭দশমিক৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছেন। কারণ ওনারা ৬ শতাংশ বা সাড়ে ৬ শতাংশের উপরে বলতে চান না। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনের সঙ্গেবাংলাদেশ সরকারের প্রাক্কলনের যে মিল হয় নি সে ব্যাপারে ওনি বলেছেন এটা কোনো বিষয় নয়। আমরা বলেছি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ককরে কোনো লাভ নেই। আমাদের দেখতে হবে প্রবৃদ্ধির চিত্রটি কি এবং সেখানে কোনো উদ্বেগের জায়গা আছে কিনা?

 অর্থনীতিবিদদের দায়িত্ব হলো কোথায় সমস্যা আছে তা চিন্হিত করা। আপনি ডাক্তারের নিকট গেলেন আর ডাক্তার যদি আপনার অসুখের কথা না বলে ভালো দিকগুলো বলেন তাহলে তো কোনো লাভ হলো না। ডাক্তারকে বলতে হবে আপনার সমস্যা কোথায়? আপনার পুরো শরীর হয়তো ভালো আছে কিন্তু কোনো এক স্থানে সমস্যা আছে। ডাক্তারের দায়িত্ব হলো সেই সমস্যার কথাটি আপনাকে জানানো,যাতে আপনি সঠিক চিকিৎসা নিতে পারেন। আমরা যদি প্রবৃদ্ধি ৮দশমিক ১৩ শতাংশ হবে, নাকি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হবে সে বিতর্কে নাও যাই তাহলে প্রবৃদ্ধিটা আসছে কোত্থেকে? প্রবৃদ্ধিটা আসছে মূলত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের গ্রোথের কারণে। রফতানি খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা আগেও ছিল এখনো রয়ে গেছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি খুব একটা বাড়েনি।

 জিডিপি’র অনুপাতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে খুবই সামান্য। এই বৃদ্ধির হার আগের বছরের প্রবৃদ্ধির তুলনায় শূন্য দশমিক এক শতাংশের মতো বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যানে আগেও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেছে। এবারও সেই দুর্বলতা রয়ে গেছে। আমাদের মূল উদ্বেগের কারণ সেটাই। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আশাব্যাঞ্জকভাবে না বাড়লে উৎপাদন ক্ষমতার বৃদ্ধি হচ্ছে না। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ যে একেবারেই হচ্ছে না তা নয়। কিন্তু জিডিপি যেভাবে বাড়ছে বিনিয়োগ সেভাবে বাড়ছে না। কিন্তু এই বৃদ্ধি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ আমাদের লক্ষ্য আরো অনেক বেশি। সরকারি খাতের বিনিয়োগ বেড়েছে,পণ্য রফতানি বেড়েছে। এমন কি ভোক্তা ব্যয় বাড়ছে। 

কিন্তু তা সত্বেও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি আশাব্যাঞ্জক নয়। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কেনো বাড়ছে না এই বিষয়টি আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। ভোক্তা ব্যয় বাড়ার অর্থ হচ্ছে অভ্যন্তরীণভাবে আমাদের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। রফতানি বৃদ্ধির অর্থ হচ্ছে আপনার উৎপাদিত পণ্য বাইরের দুনিয়ার বিক্রি করতে পারছেন। সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ হচ্ছে অবকাঠামোগত খাতে যে দুুর্বলতা ছিল তা ক্রমশ দূর হচ্ছে। তাহলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কেনা বাড়ছে না। আমাদের এই বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে।       

দৈনিক জাগরণ : দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে বলে
অভিযোগ শোনা যায়। এর কারণ কি?

ড.জাহিদ হোসেন: ব্যক্তি খাতে যে সব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে তার মধ্যে কিছু কিছু ইতোমধ্যেই কার্যক্রমশুরু করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগও এসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসেছে। স্যামসাং কিছু দিন আগে একটি মোটরসাইকেল ফ্যাক্টরির জন্য বিনিয়োগ করেছে। বড় বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল বিশেষ করে সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত হচ্ছে সেগুলো বিলম্বিত হচ্ছে।যে কারণে আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় এবং অর্থ ব্যয় বেড়ে যায় এসব ক্ষেত্রেও একইবিষয় ঘটছে। 

দৈনিক জাগরণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের সম্ভাবনা কেমন বলে মনে করেন? 

ড.জাহিদ হোসেন: বিষয়টি ভালোভাবে বিশ্লেষণ না করে বলা যাবে না। কারণ শুধু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করলেই তো হবে না।উদ্যোক্তারা সেখানে যেতে চাইবে কিনা তাও দেখতে হবে। আপনি বড় ধরনের বিনিয়োগ করে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করলেন কিন্তুউদ্যোক্তারা সেখানে গেলেন না তাহলো তো হবে না। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যান্য স্থানের মতো নয়। সেখানে কোনো কিছুকরতে গেলে পরিবেশগত বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। 

কোনো কারণেই উন্নয়নের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ বিপন্ন করা যাবে না। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামে শিল্পায়নের সুযোগ কতটা আছে তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ,গ্যাস বা যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ আপনি চাইলেই নিশ্চিত করতে পারবেন না। আর এসব সুবিধা না পাওয়া গেলে সেখানে শিল্পায়ন লাভজনক হবে কিনা তাও প্রশ্ন সাপেক্ষ ব্যাপার। শ্রমিকরা সেখানে গিয়ে থাকতে চাইবে কিনা সেটাও দেখতে হবে। মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে যেতে চায় কিন্তু থাকতে চাইবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। 

দৈনিক জাগরণ : অনেকেই বলেন,দেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে গেছে। এই অবস্থায় আরো ব্যাংক স্থাপনের অনুমতিপ্রদান কতটা যৌক্তিক হবে বলে মনে করেন। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে মার্জার করার বিষয়ে আপনার অভিমতজানাবেন কি?

ড. জাহিদ হোসেন: নতুন ব্যাংক আসবে এবং যারা আছে তারা বেরিয়ে যাবে এটা যে কোনো খাতের গতিশীলতার অংশ। যে আছে সে সবসময় ব্যবসায় করে যাবে নতুন কেউ আসতে পারবে না এটা কোনো সিস্টেম হতে পারে না। ওপেন সিস্টেম থাকতে হবে। কিন্তু প্রশ্নহলো,নতুন যারা বাজারে আসছে তারা কিভাবে আসছে? যে সেবা দেবার কথা তারা কি সেই সেবাদানের যোগ্যতা নিয়ে আসছে? তারা কিনতুন কোনো সেবা প্রদান করার জন্য আসছে? 

নাকি বিশেষ কোনো কানেকশনের কারণে তাদের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে? এসব বিষয় মনেরেখেই নতুন ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দিতে হবে। আমরা বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে যে সেবা এবং যে মূল্যে পাচ্ছি যারা নতুন আসছেতারা কি তার চেয়ে কম মূল্যে অধিকতর ভালো সেবা দিতে পারবে? শুধু ব্যাংকের সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। দুর্বল ব্যাংকগুলো
যদি বাজারে টিকতে না পারে তাহলে তাদের বেরিয়ে যাবার একটি রাস্তা তো করে দিতে হবে। তাদের হয় একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে, নাহয় অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে মার্জার করে দিতে হবে।      

Islami Bank