• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১, ৯ বৈশাখ ১৪২৮
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২১, ১০:৩৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ৯, ২০২১, ১০:৩৩ পিএম

সংবিধান তো সংবিধানেই আছে, এর বাস্তবায়ন নেই : রানা দাশগুপ্ত

সংবিধান তো সংবিধানেই আছে, এর বাস্তবায়ন নেই : রানা দাশগুপ্ত

সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তি যাত্রামোহন সেনগুপ্ত। তাঁর পুত্র দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। যতীন্দ্রমোহন ছিলেন ব্যারিস্টার। কলকাতার মেয়রও ছিলেন তিনি। মহাত্মা গান্ধী, মৌলানা শওকত আলী, ড. আনসারী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা তাঁদের চট্টগ্রামের বাড়িতে এসেছেন। এটি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ভবন। আন্দোলনের বিপ্লবীরা বাড়িটিতে আসতেন। সূর্য সেন, অনন্ত সিংহ, অম্বিকা চক্রবর্তীর হয়ে মামলা লড়েছিলেন যতীন্দ্রমোহন। তার ইংরেজ স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ওই বাড়িতে ছিলেন। গত ৪ জানুয়ারি এম ফরিদ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি যাত্রামোহনের বাড়িটির মালিকানা দাবি করে এর দখল নিতে যান। দলবল নিয়ে তিনি বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু করেন। খবর পেয়ে বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্তসহ বিশিষ্টজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে এর প্রতিবাদ করেন। তাদের প্রতিবাদের মুখে বাড়ি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক জাগরণ-এর মুখোমুখি হন রানা দাশগুপ্ত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহাদাত হোসেন তৌহিদ


জাগরণ : যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের বাড়িটি রক্ষার জন্য আপনারা আন্দোলন করে যাচ্ছেন।  আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কী?

রানা দাশগুপ্ত : প্রথমত এটি একটি ঐতিহাসিক বাড়ি। ব্রিটিশ ভারতে এবং পাকিস্তান আমলেও স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলন এ বাড়ি থেকেই হয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে যাত্রামোহন সেনগুপ্ত চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অনেক স্কুল-কলেজ ও জনহিতকর প্রতিষ্ঠান। তিনি ছিলেন তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চট্টগ্রামের সভাপতি। তাঁর ছেলে দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। ব্যারিস্টারি পাশ করে যতীন্দ্রমোহন চট্টগ্রামের আদালতেও আইনপেশায় যুক্ত ছিলেন। তবে বেশিরভাগ সময় ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টে। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জুনিয়র ল-ইয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা করপোরেশনের পাঁচ পাঁচবার মেয়র হয়েছিলেন তিনি। এই বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা শওকত আলীসহ ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী যারা চট্টগ্রামে এসেছেন তাঁরা এ বাড়িতেই আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। এই বাসা থেকেই চা-শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের আন্দোলন এখান থেকেই হয়েছে। এখান থেকে শ্রমিক কর্মচারী ধর্মঘট হয়েছে। অতএব তৎকালীন ব্রিটিশে-বিরোধী যে জাতীয়তা সংগ্রাম, সাম্রাজবাদ-বিরোধী সংগ্রাম, সেটি পরিচালিত হয়েছে এ বাড়ি থেকে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর অনেক সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করেছেন। কিন্তু দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহনের স্ত্রী শ্রীমতি নেলী সেনগুপ্তা দেশত্যাগ করেননি। শ্বশুরবাড়িটিকে আঁকড়ে ধরে পড়েছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং আইয়ুব-ইয়াহিয়া-বিরোধী আন্দোলনে তিনিও ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭১-এর কিছুদিন আগে বাধ্যক্যজনিত কারণে বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরা তখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি। একসময় শ্রীমতি নেলী সেনগুপ্তাও মাত্র চার দিনের জন্য অভিভক্ত ভারতের কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর তত্ত্বাবধানেই শ্রীমতি নেলীকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়, চিকিৎসা করানো হয়।

জাগরণ : বঙ্গবন্ধু সেসময় অসুস্থ নেলী সেনগুপ্তাকে দেখতে গিয়েছিলেন

রানা দাশগুপ্ত : হ্যাঁ। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু কলকাতা সফরে গেলেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হলো। বঙ্গবন্ধু কলকাতায় গিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘নেলী সেনগুপ্তা কোথায়?’ বঙ্গবন্ধুকে জানানো হলো, অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি। নেলী সেনগুপ্তা কলকাতায় যে বাসায় ছিলেন, ওখানে বঙ্গবন্ধু তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। ৭৩-এর প্রথম দিকে নেলী সেনগুপ্তা জানতে পারলেন তাঁর সমস্ত সম্পদ এনিমি পোপার্টি করে লিজ দেয়া হয়েছে। তিনি তাঁর ভবনে আর ঢুকতে পারেননি। চোখের জল ফেলে তিনি দেশত্যাগ করেছিলেন। এই হচ্ছে এই বাড়ির ইতিহাস।

জাগরণ : এই ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই কি তবে এই আন্দোলন?

রানা দাশগুপ্তআমরা মনে করি, চট্টগ্রামের নাগরিক হিসেবে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে, দল-মত নির্বিশেষে মিলে যদি এ ভবনটি সংরক্ষণ করা যায়, যদি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে চট্টগ্রামের মানুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই পুরোনো ঐতিহ্যটি সম্পর্কে জানতে পারবে। পুরোনো ঐতিহ্য সম্পর্কে যদি এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানে, তাহলে বর্তমান ঐতিহ্যকেও তারা সংরক্ষণের চেষ্টা করবে। সেইসঙ্গে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিণির্মাণেও জাদুঘরটি উদ্দীপনা জাগাবে। আমাদের সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদে রয়েছে, জাতীয় স্থাপনা রক্ষা করা, তাকে বিকৃতি বিনাশ বা অপসারণের হাত থেকে রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা এ কথাই মনে করিয়ে দিতে চাই। পাশাপাশি সবিধানে থাকলেই শুধু হবে না। আমরা মনে করি, সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়ন দরকার।

জাগরণ : আড়াইশ বছরের প্রাচীন এই বাড়িটি রক্ষার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আগে এগিয়ে আসা উচিত ছিল, তাই নয় কি?

রানা দাশগুপ্ত : সংবিধান তো হয়েছে ৫০ বছর আগে। সংবিধান তো সংবিধানেই আছে, এর বাস্তবায়ন নেই। দু’বছর আগে দেখলাম, সুচিত্রা সেনের পাবনার পৈত্রিক বাড়িটি এনিমি প্রপার্টি করে লিজ দেয়া হয়েছে। পরে সরকারের উদ্যোগে সেখানে সূর্যসেনের নামে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমরাও মনে করি, একই মডেল নিয়ে চট্টগ্রামেও এই স্থাপনাটিকে সংরক্ষণ করা দরকার।

জাগরণ : দখল করতে আসা বাড়িটি এখন কার দখলে আছে

রানা দাশগুপ্ত : বাড়িটি বর্তমানে সরকার এবং জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আছে। ঐতিহাসিক এ বাড়িটি ভাঙার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন হাইকোর্ট। এছাড়া বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে কেন তালিকাভুক্তির নির্দেশ দেওয়া হবে না, সেটাও জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। যতটুকু জানি, জেলা প্রশাসনেরও পক্ষ থেকে একটি মামলা করার কথা আছে।

জাগরণ : যতদূর জানা যায়, আপনাদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অনেকেই পাশে দাঁড়িয়েছেন

রানা দাশগুপ্ত : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলমের কাছে আমরা স্মারকলিপি দিয়েছি। তিনি জানালেন, তিনিও আমাদের সঙ্গে আছেন। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে সংহতি জানিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনিও আমাকে বলেছেন, এই আন্দোলনের সঙ্গে তিনি আছেন। চট্টগ্রাম জাতীয় পার্টির নেতারা আমার সাথে দেখা করে জানালেন, তারাও আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জ্ঞাপন করেছেন। আমরা আশা করতে চাই, বিএনপিও এ আন্দোলনে এগিয়ে আসবে।

জাগরণ : ধরনের সম্পত্তিকেএনিমি প্রপার্টিহিসেবে দেখানো কতখানি যুক্তিযুক্ত বলে আপনি মনে করেন?

রানা দাশগুপ্ত : আমি স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাই। যদি বলেন, এ দেশ সূর্যসেনের বাংলাদেশ, তাঁর প্রপার্টিও তো এনিমি করা হয়েছিল। তাহলে বলবো, যেখান থেকে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের শুরু, স্বাধীনতা আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়েছে, সেটা কি এনিমি প্রপার্টি হতে পারে? এরা কি দেশ ও জাতির শত্রু? আমাদের কথা হলো, লিজ-টিজ যা দেয়া হয়েছে— সবটাই অন্যায়।

জাগরণ : একবাক্যে যদি আপনাদের দাবিটি বলেতেন

রানা দাশগুপ্ত : আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, যাত্রামোহন-যতীন্দ্রমোহন-নেলীরা জনগণের নেতা ছিলেন। জনগণের জন্যই এই সম্পত্তি সংরক্ষণ করা হোক। আমরা মনে করি, সরকার এ দায়িত্বটি গ্রহণ করবে।