• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০১৯, ১০:৫৫ এএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৫, ২০১৯, ০৪:৫৫ পিএম

জেলা জজদের যেভাবে ১০০ নম্বরে মূল্যায়ন করেন প্রধান বিচারপতি

মাহমুদুল আলম 
জেলা জজদের যেভাবে ১০০ নম্বরে মূল্যায়ন করেন প্রধান বিচারপতি
ছবি: প্রতীকী

এসিআর বা বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে জেলা ও দায়রা জজদের সুনির্দ্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মূল্যায়ন করে থাকেন প্রধান বিচারপতি। তাছাড়া সাতটি বিষয়ের ওপর মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন করেন তিনি। যার ওপর ভিত্তি করে সুপারিশ করা হয় বিচারকদের এসিআরে।

বিষয়গুলো হচ্ছে- নিষ্পন্ন কাজের পরিমাপ, পেশাগত জ্ঞান, বিচার সংক্রান্ত কাজের মান, সাক্ষ্য পর্যালোচনায় দক্ষতা, রায় লিখন, প্রকাশ ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা। এসব বিষয়ে যথাক্রমে ২০, ১০, ২০, ১০, ২০, ১০ ও ১০ নম্বরের (মোট ১০০) মূল্যায়ন করা হয় বিচারকদের। এসব নম্বরও বিন্যাস করা হয় সুনির্দ্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। তাছাড়া আলাদাভাবে আরও ১০০ নম্বরের ‘সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ণ’ও করা হয় বিচারকদের বিষয়ে। 

এসিআরের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অংশে বিচারকদের স্বাক্ষর করেন প্রধান বিচারপতি। এর চতুর্থ অংশে (লেখচিত্র) বিচারকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পেশাগত দক্ষতা, সততা এবং নির্ভরযোগ্যতা, অন্য কোন বিষয় ও কর্মকর্তার প্রতি উপদেশ দিয়ে এতে স্বাক্ষর করবেন প্রধান বিচারপতি বা অনুবেদনকারী বিচারপতি।

পঞ্চম অংশের নাম ‘কর্মসম্পাদন’। এই পর্বের শুরুতে আছে ‘নিষ্পন্ন কাজের পরিমাপ’। এখানে ‘কাজের পরিমাপ অসাধারণ’ হলে পুরো ২০ নম্বর পাবেন বিচারক। ‘অতি উত্তম’ হলে পাবেন ১৬। ‘উত্তম’ হলে পাবেন ১২। ‘পর্যাপ্ত’ হলে পাবেন ৮ এবং ‘অপর্যাপ্ত’ হলে পাবেন ৪।

এতে ‘পেশাগত জ্ঞান’র ওপর ১০ নম্বর দেয়া হয় বিচারকদের। এতে ‘উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন’ বিচারক পাবেন পুরো ১০ নম্বর। ‘খুব ভাল’ বিচারক পাবেন ৮ নম্বর। ‘ভাল’ বিচারক পাবেন ৬। ‘মোটামুটি ভাল’ বিচারক পাবেন ৪ এবং ‘নিম্নমানের’ হলে পাবেন ২ নম্বর।

‘বিচার সংক্রান্ত কাজের মান’ মূল্যায়ণ করা হয় ২০ নম্বর দিয়ে। এতে ‘অসাধরণ’ বিচারক হলে পাবেন সর্বোচ্চ ২০ নম্বর। ‘অতি উত্তম’ বিচারক পাবেন ১৬। ‘উত্তম’ বিচারক পাবেন ১২। ‘সুষ্ঠ নয়’ এমন মূল্যায়ণের মান নির্ধারণ করা আছে ৮ এবং ‘নিম্ন মানের’ হলে পাবেন ৪ নম্বর।

‘সাক্ষ্য পর্যালোচনায় দক্ষতা’র মূল্যায়ণ করা হয় ১০ নম্বর দিয়ে। এত ‘অসাধারণ’ বিচারক পাবেন ১০ নম্বর। ‘অতি উত্তম’ বিচারক পাবেন ৮ নম্বর। ‘উত্তম’ বিচারক পাবেন ৬। ‘সন্তোষজনক’ বিচারক পাবেন ৪ এবং ‘যথাযথ নয়’ হলে পাবেন ২।

‘রায় লিখন’র মূল্যায়ণ করা হয় ২০ নম্বর দিয়ে। এতে ‘সর্বোচ্চ যুক্তিসংগত’ হিসেবে বিবেচিত হওয়া বিচারক পান সর্বোচ্চ ২০ নম্বর। ‘যথেষ্ট যুক্তিসংগত’ বিচারক পাবেন ১৬, ‘মোটামুটি যুক্তিসংগত’ বিচারক পাবেন ১২, সহনীয়ভাবে যুক্তিসংগত’ বিচারক পাবেন ৮ এবং ‘যুক্তিসংগত নয়’ মূল্যায়ন পাওয়া বিচারক পাবেন সর্বনিম্ন ৪ নম্বর।

‘প্রকাশ ক্ষমতা (লিখন)’র মূল্যায়ন করা হয় ১০ নম্বর দিয়ে। এই পর্বে ‘চমতকার’ বিচারক পাবেন সর্বোচ্চ ১০ নম্বর। ‘সুস্পষ্ট, অকাট্য ও সুবিন্যস্ত’ মূল্যায়ণ পাওয়া বিচারক পাবেন ৮, ‘কাজ চলার মত নয়’ বিবেচিত হওয়া বিচারক পাবেন ৪ এবং ‘ভাব স্পষ্ট নয়’ মূল্যায়িত বিচারক পাবেন সর্বনিম্ন ২ নম্বর।

এসিআরে ‘বুদ্ধিমত্তা’র মূল্যায়ণ করা হয় ১০ নম্বরে। এতে ‘অসাধরণ’ বিচারক পাবেন ১০ নম্বর। ‘উচ্চমানের’ বিচারক পাবেন ৮, ‘বুদ্ধিমান’ বিচারক পাবেন ৬, ‘প্রত্যাশিত মানের নিম্নে’ মূল্যায়িত হওয়া বিচারক পাবেন ৪ এবং ‘নিম্নমানের’ বিচারক পাবেন ২ নম্বর।

এরপর ১০০-এর মধ্যে প্রাপ্ত মোট নম্বর উল্লেখ করে তাতে অনুস্বাক্ষর করবেন প্রধান বিচারপতি বা অনুবেদনকারী বিচারপতি।

এছাড়া বিচারকদের ‘সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ণ’ও করা হয় মূল্যমান ১০০ ধরে। এতে ‘অসাধারণ’ বিবেচিত হলে ‘৯১-১০০’ এর পাশের ঘরে অনুস্বাক্ষর করা হবে। ‘উত্তম’ হলে ‘৮১-৯০’, ‘চলতি মানের ঊর্ধ্বে’ হলে ‘৬৫-৮০’, ‘চলতি মান’ হলে ‘৪৫-৬৪’, ‘চলতি মানের নিম্নে’ হলে ‘৩৯-৪৪’ এবং ‘সন্তোষজনক নয়’ হলে ‘২০-৩০’ এর পাশের ঘরে স্বাক্ষর করবেন প্রধান বিচারপতি বা অনুবেদনকারী বিচারপতি।

এসিআরের ষষ্ঠ অংশে বিচারকের বিষয়ে ‘সুপারিশ’ করা হবে। এতে বিচারকের ‘সততা ও সুনামের ওপর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করা হবে। সুপারিশের এই পর্যায়ে ‘পদোন্নতির যোগ্যতা’র বিষযে মন্তব্য করা হবে। যাতে সুনির্দ্দিষ্ঠ ছয়টি বিষয় আছে। বিষয়গুলো হলো ক. ‘ত্বরান্বিত পদোন্নতির সুপারিশ করা হইল (অফিসারের যদি অসাধরণ মূল্যায়ণ করা হইয়া থাকে)’, খ. ‘পদোন্নতির যোগ্য’, গ. ‘সম্প্রতি পদোন্নতি প্রাপ্ত, পরবর্তী পদোন্নতি বিবেচনার সময় হয় নাই’ ঘ. ‘এখনও পদোন্নতির যোগ্য হন নাই, তবে কালক্রমে যোগ্য হইতে পারে’, ঙ. ‘অধিকতর পদোন্নতির অযোগ্য’ এবং চ. ‘অন্যান্য সুপারিশ’র যে কোনটির পাশে অনুস্বাক্ষর করবেন প্রধান বিচারপতি বা অনুবেদনকারী বিচারপতি।

জেলা ও দায়রা জজদের এসিআর বা বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের শুরুতে তাদের নাম, পদবী, জ্যেষ্ঠতা তালিকায় ক্রমিক সংখ্যা, পরিচিতি নং উল্লেখ্য থাকে।

এছাড়া বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের প্রথম অংশে তাদের জীবন বৃত্তান্ত  থাকবে। যা অনুবেদনাধীন কর্মকর্তা নিজে পূরণ করে অনুস্বাক্ষর করবেন। দ্বিতীয় অংশে থাকবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিবরণ। কর্তৃত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার তা পূরণ ও অনুস্বাক্ষর করবেন।

তৃতীয় অংশে কর্মকর্তার কাজের বিবরণ থাকবে। যা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার পূরণ ও অনুস্বাক্ষর করবেন।

এসিআরে অনুবেদনাধীন কর্মকর্তার প্রতি নির্দেশাবলীতে বলা আছে, ‘কর্তৃত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার কর্তৃক আপনার স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ফরমটি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের নিকট প্রেরণ করুন, যাহাতে সর্বশেষ ১৫ জানুয়ারির মধ্যে পৌঁছায়।’ এতে আরও বলা আছে, ‘কর্তৃত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসারের অভিমতের সহিত আপনি একমত না হইলে আপনার স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য মেডিকেল বোর্ড আহ্বানের আবেদন করিতে পারেন।’

প্রথম অংশে কর্মকর্তার নাম, পদবী, জন্ম তারিখ, পিতার নাম, ক্যাডারের নাম, ... সালের জ্যেষ্ঠতা তালিকায় ক্রমিক নং, চাকুরীতে প্রবেশের তারিখ (সরকারি চাকরিতে, গেজেটেড পদে, ক্যাডারে), বর্তমান পদে যোগদানের তারিখ, বেতন স্কেল, বর্তমান বেতন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণে (চাকরিকালীন/ দেশে ও বিদেশে), ইংরেজি ব্যতীত অন্য কোন বিদেশি ভাষায় দক্ষতা (কথন, পঠন ও লিখন), পদোন্নতি অতিক্রান্ত হয়ে থাকলে তার কারণ, জ্যেষ্ঠতা পুনরুদ্ধার হয়েছে কিনা বিষয়গুলো উল্লেখ করে অনুবেদনাধীন অফিসার স্বাক্ষর করবেন।

দ্বিতীয় অংশে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিবরণে উচ্চতা, ওজন (ঊর্ধ্বে/নিম্নে), দৃষ্ঠি শক্তি, রক্তের শ্রেণী, রক্তচাপ, এক্স-রে, ইসিজি প্রতিবেদন, স্বাস্থ্যের শ্রেনী বিভাগ, স্বাস্থ্যগত সমস্যা (যদি থাকে) উল্লেখ করে মেডিকেল অফিসার স্বাক্ষর করবেন।

তৃতীয় অংশে অনুবেদনাধীন সময়ে সম্পাদিত কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকবে। এতে বিচারকের আদালতে দায়ের, নিষ্পত্তি ও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখ থাকবে। তাছাড়া মামলাগুলোর সাক্ষীর সংখ্যাও উল্লেখ থাকবে এতে। সাক্ষীরা একতরফা নাকি দোতরফা তাও এতে উল্লেখ থাকবে। এছাড়া মামলাগুলো একতরফা, দোতরফা নাকি অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে তাও উল্লেখ থাকবে। বিবরণে মামলার সংখ্যা শ্রেনী অনুসারে আলাদাভাবেও উল্লেখ করবেন। এতে অনুস্বাক্ষর করবেন রেজিস্ট্রার।

এমএ/বিএস