• ঢাকা
  • রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০১৯, ০৮:২৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৪, ২০১৯, ০৯:০৬ এএম

মানবদেহে হৃৎপিণ্ড যেমন, অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তেমন

জাগরণ প্রতিবেদক
মানবদেহে হৃৎপিণ্ড যেমন, অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তেমন
হাইকোর্ট

হৃৎপিণ্ড (হার্ট) যেমন মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) তেমনি অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন করে বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। আর্থিক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে অর্থ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ৯ জনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়ে কিছু পযর্বেক্ষণ দিয়ে এই মন্তব্য করেছে উচ্চ আদালত।

দেশের ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম দুর্ণীতি, ঋণ বিতরণ তদারকি এবং সকল বিষয়ে তদারকি করার জন্য ৯ সদস্যের অর্থ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। যে কমিটির সুপারিশ ও পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে বেশ কিছু পযর্বেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।

রোববার (০৩ নভেম্বর) নির্ধারিত দিনে হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, অর্থ হচ্ছে অর্থনীতির রক্ত। এর সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকা দরকার। মানবদেহে হৃৎপিণ্ড যেমন রক্ত সঞ্চালন করে তেমনি অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যম কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক)। পর্যবেক্ষণে আরও বলা দেশে কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। এর মধ্যে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি উল্লেখযোগ্য। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন আর্থিক অনিয়ম রোধে পদক্ষেপ নিয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা বন্ধে তদন্ত কমিশন গঠন এবং ঋণখেলাপিদের ২ শতাংশ সুবিধার রুলের রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। গত ২৮ অক্টোবর রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৩ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করেছিলেন আদালত।

রায় ঘোষণার সময় রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আজমালুল হোসেন কিউসি ও ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

আদেশের পর মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে যারা বিশেষজ্ঞ আছেন সেই রকম ৯ জন ব্যক্তিকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে, সেই কমিটি সরকারি বেসরকারি সকল ব্যাংকের যে দুর্বলতা, বিশেষ করে ঋণ পরিশোধ, ঋণ অনুমোদন এবং সংগ্রহে অনিয়মসহ সব বিষয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি করবেন। সেখানে তারা এগুলো তৈরি করে কী কী উপায়ে এগুলো দূর করা যায় তা সুপারিশ করবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সুপারিশ করবে।

২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১২ সালের ‘মাস্টার সার্কুলার অন লোন রিশিডিউলিং’ সংক্রান্ত সার্কুলার, যেটাতে বলা আছে কেউ যদি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ গ্রহণ করে পরবর্তীকালে সে যদি ঋণ নিতে যায়, তার কাছে যে ঋণ পাবে তার ১৫ শতাংশ অর্থ দিতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে এবং সিআইবিতে তার নাম পাঠাতে হবে।

আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, আদালত বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি কমিটি করতে বলেছেন। ব্যাংকিং সেক্টরে কমিটির কাজ হচ্ছে- ব্যাংকিং সেক্টরে অনিয়ম কেন হয়েছে সেটি তদন্ত করে দেখে প্রতিবেদন তৈরি করবে।

আইনজীবী মুনিরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়েই বিভিন্ন সময়ে গঠিত কমিটির পরামর্শ নিয়ে কাজ করে থাকে। আমি মনে করি আদালতের আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজে প্রভাব পড়বে না।

দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধে ৯ সদস্যের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন ও দুর্নীতির বিষয়ে এ কমিটি যে সব সুপারিশ করবে তা অনুসরণ করতে বলেছেন আদালত।

রোববার নির্ধারিত দিনে শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

উল্লেখ্য, মানবাধিকার সংগঠন এইচআরপিবির করা এক রিট আবেদনে হাইকোর্ট গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে ঋণখেলাপির তালিকা দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রুল জারি করেন। রুলে আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধে কমিশন গঠনের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না ও এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

এর মধ্যে গত ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট-সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করা হয়। এরপর রিটকারীদের আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২১ মে ওই সার্কুলারের ওপর ২৪ জুন পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজার রাখার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন আদালত।

আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২ জুলাই আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ৮ জুলাই পর্যন্ত হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন। ৮ জুলাই এ স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ান। তবে যারা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুবিধা নেবেন তারা নতুন করে ঋণ নিতে পারবেন না। এছাড়া বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন কোর্টে এ রিট মামলা শুনানি করতে বলেন।

সে আদেশ অনুসারে রিট মামলাটি ওই আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। রুল শুনানি অবস্থায় ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে আদালতের আদেশের কয়েকবার বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে রুলও জারি করেন। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এই রায় ঘোষণা করা হয়।

এমএ/বিএস