• ঢাকা
  • সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ৭, ২০২০, ০৪:১৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ৮, ২০২০, ০৩:০২ পিএম

শেকড়ের টানে বাঙালির পাশে-৪

কলকাতার পথে পথে সভা-সমাবেশ করেছেন গোলাম কুদ্দুস

সবিশেষ
কলকাতার পথে পথে সভা-সমাবেশ করেছেন গোলাম কুদ্দুস
গোলাম কুদ্দুস

মু ক্তি যু দ্ধে র  সু হৃ দ

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। গোটা ভারতের লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর‍া সোচ্চার আমাদের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ ‘মানবিক বোধ’ এর টানে। আবার অনেকের হৃদয়ে এই বোধের সঙ্গে ছিল মাটি ও শেকড়ের টান। এবারের অগ্নিঝরা মার্চে তাদের নিয়েই দৈনিক জাগরণ এর বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হলো চতুর্থ কিস্তি। লিখেছেন জাকির হোসেন

......

কবি, সাংবাদিক ও রাজনীতিক গোলাম কুদ্দুস ছিলেন বিপ্লবী চেতনার মানুষ। তাই বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সময় তিনি ঘরে বসে থাকেননি। পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি কলকাতা শহরের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে করেছেন। লিখেছেন কবিতা। জন্মভূমির মুক্তির লড়াইয়ে দিয়েছিলেন নৈতিক সমর্থন।

গোলাম কুদ্দুস মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাড়িতে কুষ্টিয়া এলাকার একটি পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সুরুজ ছিল ওই পরিবারের কর্তাব্যক্তি। একদিন সুরুজের ৩ বছরের শিশুপুত্র অপহৃত হয়। বহু খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া যায় একটি বস্তিতে। পরে ঘটনা জানাজানি হয়। যারা অপহরণ করেছিলেন তারা উর্দুভাষী অবাঙালি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি স্থানীয় বিধায়ক ডা. এমএ গনির হস্তক্ষেপে। ডা. গনিও ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।

একাত্তরে ভারতের বিখ্যাত উর্দুকবি পারভেজ শাহেদি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে লিখেছেন। অবাঙালি মুসলমানদের বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আদায়ের জন্য এসব কবিতা কলকাতার উর্দুভাষী এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হতো। পাকিস্তান আমলে এই বিখ্যাত কবি ঢাকার এক কবিতা সন্ধ্যায় এসেছিলেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে কবি পারভেজ শাহেদি উর্দুতে কবিতা পাঠ করেন। কবিতাটির মর্ম ছিল ‘আমরা তোমাদের রাজত্বকে স্বীকার করি না। তোমরা রবাহুত’।

কবিতা শুনে আইয়ুব খান অবাক হন কিন্তু কিছু বলতে পারেননি।

..........‘’..........

‘কবি গোলাম কুদ্দস কলকাতার বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি রুমে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন ২৪ নং রুমে আর তিনি ছিলেন ২৩ নং রুমে। বন্ধুত্বও ছিল দু’জনের মধ্যে, যদিও দু’জনে দুই কলেজের ছাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজে) আর গোলাম কুদ্দুস ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের’

..........‘’..........

কবি গোলাম কুদ্দুস তার জীবদ্দশায় আমাদের মুক্তিসংগ্রামে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ডা. এমএ গনি, কবি পারভেজ শাহেদি, বিচারপতি মাসুদ এবং মওলানা আকরম খাঁর বড় জামাতা আবদুর রাজ্জাক খানের কথা প্রায়শই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতেন।

তিনি স্মরণ করতেন সৈয়দ আলতাফ হোসেন, সৈয়দ ওয়াজিউল্লাহ, শওকত ওসমান ও সরদার ফজলুল করিমের কথাও।

গোলাম কুদ্দুসের ফুফাতো ভাই ছিলেন বাংলাদেশের ন্যাপ নেতা সৈয়দ আলতাফ হোসেন। এই সৈয়দ আলতাফ হোসেন এক সময় ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজে কাজ করতেন। গোলাম কুদ্দুস তাকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

কবি গোলাম কুদ্দস কলকাতার বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি রুমে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন ২৪ নং রুমে আর তিনি ছিলেন ২৩ নং রুমে। বন্ধুত্বও ছিল দু’জনের মধ্যে, যদিও দু’জনে দুই কলেজের ছাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজে) আর গোলাম কুদ্দুস ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের।

গোলাম কুদ্দুসের জন্ম ১৯২০ সালে ফরিদপুরের গোট্টিগ্রামে মামাবাড়িতে। নিজেদের বাড়ি ছিল কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার ধলনগর গ্রামে। বাবা বিখ্যাত উকিল গোলাম দরবেশ জোয়ারদার আর মা সৈয়দুন্নেসা খাতুন। বাল্যশিক্ষা নিজ গ্রামের সোলেমান পণ্ডিতের পাঠশালায়। তারপরে হরিনারায়ণপুরে হাই স্কুলে। ম্যাট্রিক পাশ করেন কুষ্টিয়া হাই স্কুল থেকে। এর পরের শিক্ষা কলকাতাতে। ইতিহাসে এম এ পাস করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

গোলাম কুদ্দুস ২২ বছর বয়সেই ‘অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস’-এর যুগ্ম সম্পাদক হন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের সঙ্গে। সাংবাদিকতা শুরু ১৯৪৬ সালে দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায়। এটি ছিল কমিউনিস্ট আন্দোলনের মুখপত্র। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গোপনে পাঠানে হতো এই পত্রিকা। চল্লিশের দশকে ফ্যাসিবিরোধী কবিদের সঙ্কলন ‘একসূত্র’ যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। নাচে মনময়ূর, নবরামায়ণ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও উপন্যাস, গদ্য, প্রবন্ধ, রিপোর্টাজ লিখেছেন গোলাম কুদ্দুস। পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার।

২০০৬ সালে কলকাতায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদ কবি গোলাম কুদ্দুস।

জেডএইচ/এসএমএম

আরও পড়ুন