• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২০, ০৬:৪০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ৮, ২০২০, ০৬:৪৫ পিএম

শেকড়ের টানে বাঙালির পাশে-৫

মসিকে অসি করে যুদ্ধে শামিল হন অরুণ মিত্র

সবিশেষ
মসিকে অসি করে যুদ্ধে শামিল হন অরুণ মিত্র
অরুণ মিত্র

মু ক্তি যু দ্ধে র  সু হৃ দ

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। গোটা ভারতের লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর‍া সোচ্চার আমাদের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ ‘মানবিক বোধ’ এর টানে। আবার অনেকের হৃদয়ে এই বোধের সঙ্গে ছিল মাটি ও শেকড়ের টান। এবারের অগ্নিঝরা মার্চে তাদের নিয়েই দৈনিক জাগরণ এর বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হলো পঞ্চম কিস্তি। লিখেছেন জাকির হোসেন

......

একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, মায়ের সামনে পুত্রকে হত্যা, মা-বাবার সামনের মেয়েকে ধর্ষণ, ছেলে-মেয়ের সামনে মাকে ধর্ষণ, ঘর-বাড়িতে আগুন দিয়ে সর্বস্ব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়— তখন চোখের সামনে মানবতার এই নিষ্ঠুর পরাজয়কে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি কলকাতার বিশিষ্ট কবি অরুণ মিত্র। তখন তার বয়স ৬২ বছর। বৃদ্ধ বয়সে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে পারেননি। কিন্তু মসিকে অসি বানিয়ে যুদ্ধে শামিল হন অরুণ মিত্র। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার মনে হয়েছিল, তিনি নিজেই স্বাধীন হলেন। একথা জীবদ্দশায় বহুবার বলেছেন অরুণ মিত্র।

অরুণ মিত্র ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথিতযশা কবি ও ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক ও অনুবাদক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার মনে হয়েছিল, তিনি নিজেই স্বাধীন হলেন। একথা জীবদ্দশায় বহুবার বলেছেন অরুণ মিত্র।

.........‘’.........

অরুণ মিত্রের জন্ম ১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর বাংলাদেশের যশোর শহরে। বাবা হীরালাল মিত্র ও মা যামিনীবালা দেবী। অল্পবয়সেই অরুণ মিত্র কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতার বঙ্গবাসী স্কুলে তার শিক্ষাজীবনের শুরু। ১৯২৬ সালে এই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। ১৯২৮ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইসিএস ও ১৯৩০ সালে রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে বিএ পাস করেন। এই সময়ে সাহিত্যের চেয়ে সঙ্গীতের প্রতি অধিক আগ্রহী হন। আবার এই সময়েই ভিক্টর হুগোর উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদে পড়ে ফরাসি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ফরাসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। বিএ পাস করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পড়া শুরু করেন। কিন্তু মা-বাবার জ্যেষ্ঠপুত্র হওয়ায় সাংসারিক দায়-দায়িত্বের চাপে এমএ পড়া অসমাপ্ত রেখেই ১৯৩১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করতে বাধ্য হন। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এই সময়ে বিভিন্ন সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, কবি ও লেখক গোষ্ঠীর সঙ্গে তার পরিচিতি ঘটে। বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ব্যক্তিগত সম্পর্কসূত্রে ছিলেন তার নিকটাত্মীয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করার সময়ে তিনি মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই সূত্রে ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ ও ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’র সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আনন্দবাজার ছাড়ার পর তিনি যোগ দেন সতেন্দ্রনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘অরণি’ পত্রিকায়। ফরাসি সরকারের আহ্বানে ১৮৪৮ সালে বৃত্তি নিয়ে গবেষণার জন্য ফ্রান্স যান। গবেষণা কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট লাভ করেন। ফরাসি সাহিত্য অধ্যয়নের পর ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হন। এরপর দীর্ঘ কুড়ি বছর সপরিবারে এলাহাবাদে বসবাস করেন। ১৯৭২ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন।

১৯৯০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানিক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে নিরন্তর গবেষণার জন্য ১৯৯২ সালে ফরাসি সরকার তাকে ‘লিজিয়ন অব অনার’ সম্মানে ভূষিত করে।

২০০০ সালের ২২ আগস্ট কলকাতায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদ অরুণ মিত্র।

জেডএইচ/এসএমএম

আরও পড়ুন