• ঢাকা
  • বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২০, ২৪ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২০, ০৫:৪৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১১, ২০২০, ০৫:৪৮ পিএম

শেকড়ের টানে বাঙালির পাশে-৮

শরণার্থীদের জন্য চাঁদা তুলতেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়

সবিশেষ
শরণার্থীদের জন্য চাঁদা তুলতেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়

 

মু ক্তি যু দ্ধে র সু হৃ দ

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। গোটা ভারতের কবি, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা সোচ্চার ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ ‘মানবিক বোধে’র টানে। অনেকের মনে এই বোধের সঙ্গে ছিল মাটি ও শেকড়ের টান। এবারের অগ্নিঝরা মার্চে তাদের নিয়েই দৈনিক ‘জাগরণ’র বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হলো অষ্টম কিস্তি। লিখেছেন জাকির হোসেন

..........

একাত্তরে বাঙালি শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন উপমহাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। তিনি বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে নিয়মিত তাদের খোঁজ নিতেন। পাশাপাশি এসব অসহায় মুক্তিকামী মানুষের মুখে একটু অন্ন তুলে দিতে তিনি সুশীল মজুমদার, তুলসি লাহিড়ী, তৃপ্তিমিত্রকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতার সড়কে চাঁদা তুলতেন। সেই চাঁদা তুলে দিতেন উদ্বাস্তু ত্রাণ তহবিলে।

সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লায় ১৯৩৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। শৈশব কেটেছে ঢাকার কমলাপুরে। বাবা শশধর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন রেলের স্টেশন মাস্টার। তার কর্মস্থল ছিল ফুলবাড়ীয়ায়, যেখানে ছিল ঢাকার পুরানো রেল স্টেশন।

সাবিত্রীরা ছিলেন ১০ বোন। কোনও ভাই ছিল না। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তারা ভারতে চলে যান। এর আগে দুই বোনকে তাদের বাবা কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। উঠেছিলেন দিদির বাড়ি কলকাতার টালিগঞ্জে। বাবা ঠিকমতো টাকা-পয়সা পাঠাতে পারতেন না। তাই খুব কষ্টে কেটেছে ১০ বছর বয়সী এই ছোট্ট মেয়েটার জীবন। স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ক্লাস থ্রিতে। আধপেটা খেয়েই কাটিয়ে দিতে হতো দিন। কখনও কখনও ভালো খাওয়ার লোভে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি চলে যেতেন রাতে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আত্মীয়-স্বজনরা ফন্দিটা টের পেলো। তখন সেখান থেকেও আধপেটা খেয়ে ফিরতে হতো।

অর্থাভাব আর ছোটবেলা থেকে সিনেমার প্রতি আকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে যায় সিনেমাজগতে। উত্তম কুমার থেকে শুরু করে বহু বড় বড় তারকার সঙ্গে অভিনয় করেছেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়ের শুরু নাটক দিয়ে, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে। তিনিই সাবিত্রীকে অভিনয়ে সুযোগ করে দেন। তখন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের একজোড়া স্যান্ডেল পর্যন্ত ছিল না। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে একজোড়া স্যান্ডেল কিনে দেন। তার নাটকের দলের নাম ‘উত্তর সারথী’। ‘নতুন ইহুদি’ নামের একটা নাটকের অভিনয় করেন তিনি। আর নাটক করতে করতেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ডাক। 

রাষ্ট্রপিত প্রণব মুখার্জির কাছ থেকে পদ্মশ্রী গ্রহণ করছেন সাবিত্রী

‘পাশের বাড়ি’ চলচ্চিত্রের জন্য যখন তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছিল, তখন ‘বাঙাল’ উচ্চারণের কারণে তাকে বাদ দেয়া হয়। কিন্তু আর কোনও অভিনেত্রীকে না পেয়ে আবার ফিরে আসতে হয় সাবিত্রীর কাছে। শুটিংয়ের প্রথম দিন বাসে করে গিয়েছিলেন স্টুডিওপাড়ায়। পাশের বাড়ি থেকে একটি শাড়ি নিয়েছিলেন। প্রথম অভিনয়ের পর সবাই হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জান‍ায়।

মাসে ২০০ টাকা মাস বেতনের শিল্পী হিসেবে তিনি চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু ‘পাশের বাড়ি’র শুটিংও বন্ধ ছিল কিছুকাল। সে সময় জীবনটা কেটেছে খুব কষ্টে। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর সাবিত্রীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন অনেকেই। ফলে আর থেমে থাকতে হয়নি তাকে।

বাংলা সিনেমায় বেশ কয়েকটি কমেডি চলচ্চিত্র তৈরি হয় উত্তম-সাবিত্রী জুটিতে। ‘ভ্রান্তিবিলাশ’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘মৌচাক’— ছবিগুলোতে তার অনাড়ম্বর অথচ আশ্চর্য অভিনয় বাঙালিকে হাসিয়েছে, ভালো লাগায় ভরিয়ে রেখেছে আজও।

বাংলা সিনেমার বহু নায়িকারই রূপমুগ্ধ হয়ে থাকতে পারে কিন্তু এমন স্নেহপ্রবণ বড় বউদি-দাদাকে লুকিয়ে যিনি ভাইয়ের জন্য সিগারেট ম্যানেজ করে দেন— তা এর আগে সিনেমার ঘর সংসারে বাঙালির তেমন ছিল না। তার মতো করে শাসন-সোহাগের বাঁধন এমন করে বোধহয় আগে কেউ বাঁধতে পারেননি। এমন বাড়ির বড় বউ— যিনি গোঁসাঘরে খিল দিয়ে অনশনে বসেন, আবার দরকার হলে বাড়ির কর্তার অন্যায্য হুকুমের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারেন— এ রকম স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসা মেশানো গেরস্থ ঋজু বাঙালির ঘরের মেয়েকে একমাত্র তিনিই পর্দায় তুলে আনতে পেরেছিলেন তার অনবদ্য অভিনয়গুণে।

অভিনয়ের গলি থেকে রাজপথ সর্বত্রই তার অনায়াস পথচলা। ‘নিশিপদ্ম’ এর পুষ্প যে শেষমেশ দেবী দুর্গার উপমায় মিশে যেতে পারেন, সে কি তার চরিত্রায়ণ ছাড়া সম্ভব হতো। আবার তার অনবদ্য স্ক্রিন প্রেজেন্সের সামনেই এক হয়ে মিলে যায় বিবাদমান ‘দুই ভাই’। এমনটাই তার অভিনয় জাদু। প্রতিভার দ্যুতি তিনি এমন এক আটপৌরে মোড়কে ঢেকে রাখেন যে, বাঙালি দর্শক তাকে নায়িকার দূরত্বে নয় বরং গ্রহণ করে আপনজনের আদরে।

কাজরী’ ছবির দুস্প্রাপ্য ছবি। সুচিত্রা সাবিত্রীর প্রথম একসঙ্গে অভিনয়। সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

মঞ্চে ‘কাজরী’, ‘শ্যামলী’র মতো নাটকে একদা থিয়েটারপ্রেমিদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন তিনি।

সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় পেয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পদ্মশ্রী’, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’সহ নানা পদক ও সম্মাননা।

চিরকুমারী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের অবসরের সঙ্গী বই। উপন্যাসেই বেশি আনন্দ পান।

এসএমএম

আরও পড়ুন