• ঢাকা
  • বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২০, ২৪ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২০, ০৪:২০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১৪, ২০২০, ০৪:২০ পিএম

শেকড়ের টানে বাঙালির পাশে-৯

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ‘নবজাতক’ প্রকাশ করেন মৈত্রেয়ী দেবী

সবিশেষ
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ‘নবজাতক’ প্রকাশ করেন মৈত্রেয়ী দেবী
মৈত্রেয়ী দেবী (জন্ম- ১ সেপ্টেম্বর ১৯১৪ : মৃত্যু- ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০)

মু ক্তি যু দ্ধে র সু হৃ দ

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। গোটা ভারতের লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সোচ্চার ছিলেন মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ ‘মানবিক বোধ’ এর টানে। আবার অনেকের মনে এই বোধের সঙ্গে ছিল মাটি ও শেকড়ের টান। এবারের অগ্নিঝরা মার্চে তাদের নিয়েই দৈনিক জাগরণ’র বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হলো নবম কিস্তি। লিখেছেন জাকির হোসেন

........

একাত্তরে মৈত্রেয়ী দেবী ‘নবজাতক’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন এবং বাংলাদেশের জন্য ভারতকে যুদ্ধ করা উচিত বলে প্রবন্ধ লেখেন। এই পত্রিকায় অন্নদাশঙ্কর রায় ‘বন্দেমাতরম’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এতে তিনি ভারতকে যুদ্ধে না জড়ানোর পক্ষে অভিমত প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ দিতে পারি, অস্ত্র দিতে পারি, কিন্তু সৈন্য পাঠাবো না। সৈন্য পাঠানোটা হবে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।আবার পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাই না।’’

মৈত্রেয়ী দেবী তৎক্ষণাৎ অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই মতের বিরোধিতা করেন এবং তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে যুদ্ধের স্বপক্ষে কলম ধরেন।

শুধু কলম ধরেই তিনি ক্ষান্ত হননি। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দেন। এই সময়ে তিনি কলকাতা থেকে ২৪ মাইল দূরে বাদু নামক গ্রামে একটি ৯ বিঘা জমিজুড়ে কৃষি, মাছচাষ, মধুচাষ, গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনের পাশাপাশি শরণার্থী শিবিরের অনাথ শিশুদের জন্য ‘খেলাঘর’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমৃত্যু তিনি এই সংস্থার দেখাশোনা করেন।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ব্যথ প্রাণের আবর্জনায় পুড়িয়ে ফেলো’ কবিতার মূল পাণ্ডুলিপি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উপহার দেন মৈত্রেয়ী দেবী

একাত্তরে মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে গৌরী আইয়ুব এবং অন্নদাশঙ্কর রায়ের সহধর্মিনী লীলা রায় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়াও প্রয়াত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, নীহাররঞ্জন রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, প্রভাত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, সমরেশ বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

মৈত্রেয়ী দেবীর জন্ম ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে। বাবা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও মা হিমানী মাধুরী রায়। বাবা ছিলেন একজন দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। তার শৈশব কেটেছে বাবার বাড়ি বরিশাল জেলার আগৈলঝারার গৈলা গ্রামে। ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৩৪ সালে তিনি ড. মনোমোহন সেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মনোমোহন সেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। মৈত্রেয়ী দেবী বিয়ের পরেই স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন মংপু। মংপু হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাহাড়ি জেলা দার্জিলিংয়ের একটা পর্যটন কেন্দ্র।

মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। তারা মংপুতে থাকাকালীন কবিগুরু মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণে ৪ বার সেখানে গিয়েছিলেন।

মৈত্রেয়ী দেবীর সাহিত্যজীবন শুরু ১৬ বছর বয়সে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উদিত’। প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে। ওই বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘চিত্তছায়া’।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি বঙ্গভবনে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের অনুষ্ঠানে সপরিবারে মৈত্রেয়ী দেবী

১৯৪২ সালে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি ও তার সাথে আলাপচারিতা নিয়ে লেখেন স্মৃতিকথা ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’। বইটি ‘টেগোর বাই ফায়ারসাইড’ নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। রবীন্দ্র বিষয়ক তার অন্যান্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে-স্বর্গের কাছাকাছি, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, রবীন্দ্রনাথ : দি ম্যান বিহাইন্ড হিজ পোয়েট্রি। তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘ন হন্যতে’ পাঠক মহলে তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে আসে।

১৯৭৫ সালে ভারতীয় লেখিকা সংঘ ‘ন হন্যতে’ ( It Does Not Die : A Romance) উপন্যাসের জন্য তাকে সম্মানসূচক পদক দেয়। ‘ন হন্যতে' মানে ‘যাকে বিনাশ করা যায় না’। এই বইতে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনবোধ, ইংরেজ শাসনামলে ভারতের সমাজ-ব্যবস্থা এবং জীবন-যাপনের চিত্র তুলে ধরেন। বইটির জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য ‘আকাদেমি পুরস্কার’ লাভ করেন।

১৯৯০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের এই সুহৃদ।

জেডএইচ/এসএমএম