• ঢাকা
  • শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০২০, ০৬:৪০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১৫, ২০২০, ০৬:৫৯ পিএম

শেকড়ের টানে বাঙালির পাশে-১০

মুক্তিযুদ্ধে সুনীলের অস্ত্র ছিল লেখনি

সবিশেষ
মুক্তিযুদ্ধে সুনীলের অস্ত্র ছিল লেখনি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ( জন্ম- ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ : মৃত্যু- ২৩ অক্টোবর ২০১২)

মু ক্তি যু দ্ধে র সু হৃ দ

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। গোটা ভারতের লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সোচ্চার ছিলেন মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ ‘মানবিক বোধ’ এর টানে। আবার অনেকের মনে এই বোধের সঙ্গে ছিল মাটি ও শেকড়ের টান। এবারের অগ্নিঝরা মার্চে তাদের নিয়েই দৈনিক জাগরণ’র বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হলো দশম কিস্তি। লিখেছেন জাকির হোসেন

........

সবেমাত্র আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। খবরের কাগজে বাংলাদেশের গণহত্যার খবর দেখে তিনি বিস্মিত হন। আর তখন তার মনে পড়ে জন্মভূমি কথা। প্রিয় জন্মভূমি তখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। তাই তিনি কিছুতেই বসে থাকতে পারেননি। সেদিনই তিনিও দাঁড়ান মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে। নেমে পড়েন যুদ্ধে। লেখনি ছিল তার অস্ত্র।  ওই সময় তার লেখা ‘১৯৭১’ কবিতাটি ব্যাপক সারা ফেলে। ওই সময়েই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘অর্জুন’ নামে একটা উপন্যাস লেখেন এবং উপন্যাসটি তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসর্গ করেন।

যুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রায়শই বনগাঁ আর সাতক্ষীরা সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে যেতেন। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়ে যেতেন ওষুধপত্র ও খাবার-দাবার। কয়েকজন শরণার্থীকে তিনি নিজের বাড়িতে আশ্রয়ও দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ার জন্য তিনি দিনের পর দিন সভা-সমাবেশে করেছেন। ওই সময়ে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব হয়।তাদের মধ্যে ছিলেন— শহীদ কাদরী, বেলাল চৌধুরী, দাউদ হায়দার প্রমুখ।

অ্যালেন গিনসবার্গ ও যশোর রোড

মার্কিন কবি, গীতিকার, আলোকচিত্রী এবং মঞ্চ অভিনেতা অ্যালেন গিন্সবার্গের সাথে গভীর বন্ধুত্ব ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ভারতের কলকাতায় এসেছিলেন গিন্সবার্গ। উঠেছিলেন সুনীলের বাড়িতেই। ব্রিটিশ রাজের সময় পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের সংযোগ সড়ক ছিল ‘যশোর রোড’। অঝোরধারায় বৃষ্টি হওয়ায় তখন পানিতে ডুবে গিয়েছিল যশোর রোড। এ কারণে সড়কপথে যেতে না পেরে গিন্সবার্গ নৌকাযোগে বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে আসেন। তার সাথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন। তারা যশোর সীমান্ত ও এর আশপাশের শিবিরগুলোতে বসবাসকারী শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই গিন্সবার্গ ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শিরোনামের দীর্ঘ কবিতাটি লেখেন। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি লাইন-

Millions of babies watching the skies

Bellies swollen, with big round eyes

On Jessore Road-long bamboo huts

No place to shit but sand channel ruts

 

Millions of fathers in rain

Millions of mothers in pain

Millions of brothers in woe

Millions of sisters nowhere to go...

এই কবিতার মাধ্যমেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং আমেরিকায় ফিরে গিয়ে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে পণ্ডিত রবি শংকরও জর্জ হ্যারিসন আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এ অংশ নেন। এই কনসার্ট আয়োজন করা হয়েছিল শরণার্থীদের সাহায্যার্থে। এই কনসার্টে জর্জ হ্যরিসন, বব ডিলান, জোয়ান বায়েজসহ আমেরিকার আরও অনেক জনপ্রিয় শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এই কনসার্টের মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখ ডলার সংগৃহীত হয়। অর্থ সংগ্রহের চেয়েও বড় ব্যাপার ছিল কনসার্টটি সারাবিশ্বকে ব্যাপক নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল। সবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথা এবং গৌরবান্বিত স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা।

পরবর্তীকালে অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক ভাবানুবাদ এবং সুরারোপ করেন। মৌসুমী ভৌমিকের গাওয়া গানটির কয়েক লাইন নিম্নরূপ-

শত শত চোখ আকাশটা দেখে

শত শত শত মানুষের দল

যশোর রোডের দু’ধারে বসত

বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল

 

কাদামাটি মাখা মানুষের দল

গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে

আকাশে বসত মরা ঈশ্বর

নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে...

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন লেখক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। দু’জনের বাড়িই ফরিদপুর। একথা জানার পর বঙ্গবন্ধু তাদের দু’জনকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেদিনের স্মৃতি জীবনের কোনস্তরেই ভুলতে পারেননি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

নীরদ মজুমদারের বাড়িতে আড্ডায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বহুবার বাংলাদেশে এসেছেন। সদালাপী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বড় গুণ ছিল সবার সঙ্গে মিশতে পারা। তাই যেখানে গেছেন সবাইকে আপন করে নিয়েছেন। শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দেয়ার ছলে ভাগাভাগি করেছেন জীবনের নানা জানা-অজানা অভিজ্ঞতা।

তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। আমাকে তিনি একুশের সঙ্কলন-এর জন্য ‘পায়রাদের ওড়াউড়ি’ শিরোনামের একটি কবিতা দিয়েছিলেন। একবার তার সঙ্গে আমার কথা হয় রাজধানী ঢাকার নয়া পল্টনে গাজীভবনের ৯তলায় জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বাড়িতে। তখন রাত প্রায় ৯টা। দু’জন ড্রইংরুমে বসা, দুজনেরই পরনে লুঙ্গি এবং সেন্ডো গেঞ্জি। কথা প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চাইলাম, ‘‘আচ্ছা দাদা ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি তো ৩৩ বছর পার করলো। এখন কবিতাটি বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?’’ 

তিনি বললেন, কেউ কেউ কথা রাখে রে ছোকড়া।

বললাম, আপনার ‘নীরা’ নাকি ‘নবনীতা দেবসেন’?

মৃদু হেসে সুনীল বললেন, নিজের গোপন কথা তোকে বলবো কেন?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে। জন্ম বাংলাদেশে হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

২০১২ সালে মৃত্যুর পূর্ববর্তী চার দশক তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা-ব্যক্তিত্ব হিসাবে বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষা-ভাষী সাহিত্যপ্রেমিদের কাছে পরিচিত ছিলেন।

তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসাবে অজস্র স্মরণীয় রচনা উপহার দিয়েছেন।

আধুনিক বাংলা কবিতার জীবনানন্দ-পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কবি তিনি। একই সঙ্গে তিনি আধুনিক ও রোমান্টিক। তার কবিতার বহু পঙ্ক্তি সাহিত্যপ্রেমিদের মুখস্থ।

‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীল উপাধ্যায়’সহ একাধিক ছদ্মনামে অজস্য লেখা উপহার দিয়েছেন পাঠকমহলকে।  

সহকর্মী সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

পড়াশোনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। ব্যাংকের পিয়নের চেয়েও স্কুল মাস্টারের বেতন ছিল কম।  তাই সুনীলের মা কখনই চাননি তার ছেলে শিক্ষকতা করুক। পড়াশোনা শেষে কিছুদিন চাকুরি করেন। এরপর যোগ দেন সাংবাদিকতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান পলেন কলকাতায় আসলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্টতা হয়। সেই সূত্রে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে মার্কিন মুলুকে যান। ডিগ্রি শেষে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-গ্রন্থাগারিক হিসাবে কিছুদিন কাজ করার পর দেশে ফেরেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৫৩ সাল থেকে ‘কৃত্তিবাস’ নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ এবং ১৯৬৬ সালে প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ প্রকাশিত হয়।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি, যুগলবন্দী (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে), হঠাৎ নীরার জন্য, রাত্রির রঁদেভূ, শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা, অর্ধেক জীবন, অরণ্যের দিনরাত্রি, অর্জুন, প্রথম আলো, সেই সময়, পূর্ব পশ্চিম, ভানু ও রাণু, মনের মানুষ ইত্যাদি।

শিশুসাহিত্যে তিনি ‘কাকাবাবু-সন্তু’ নামে এক জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজের রচয়িতা।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসের কাহিনি চলচিত্রে রূপায়ণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ এবং ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ উল্লেখযোগ্য।

শিশির মঞ্চের সামনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কাকাবাবু চরিত্রের দু’টি কাহিনি ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ এবং ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন’ চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে।

‘হঠাৎ নীরা’র ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে একটি চলচ্চিত্র। 

সাহিত্যের বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭২ ও ১৯৮৯ সালে আনন্দ পুরস্কার আর ১৯৮৫ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান।

২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর হৃদযন্ত্রজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

২০০৩ সালের ৪ এপ্রিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার ‘গণদর্পণ’কে সস্ত্রীক মরণোত্তর দেহ দান করে যান। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একমাত্র পুত্রসন্তান সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ইচ্ছেতে দাহ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ব্যবস্থাপনায় ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।

জেডএইচ/এসএমএম