• ঢাকা
  • রবিবার, ০৭ জুন, ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২০, ০৪:০৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৬, ২০২০, ০৯:৩৪ এএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি-২৭

হিংস্র সমরনায়কের তাণ্ডব ( পাঁচ)

আবেদ খান
হিংস্র সমরনায়কের তাণ্ডব ( পাঁচ)

দৃশ্যপট— এক

সমরনায়ক তখন মধ্যপ্রাচ্যে সফর করছেন। উদ্দেশ্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের পছন্দের এক প্রার্থীকে জেতানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে লবিং করা। সাতাত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষাংশ। জনক এবং তার পরিবারের রক্তে রঞ্জিত হাত নিয়ে জিয়া পৌঁছালেন কায়রো, সেপ্টেম্বর মাসের ২৫ তারিখ। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতের সঙ্গে দেখা হলো তার। জাতিসংঘের নির্বাচনের প্রসঙ্গটিও উঠলো। আনোয়ার সাদত অন্যমনস্ক যেন। কথা উঠতেই তিনি জিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, নির্বাচনের বিষয়টি আপাতত থাক। এজন্য আরও বছরখানেক সময় আছে। আগে নিজের প্রাণের কথা বরং ভাবুন।

জিয়া হতভম্ব হয়ে গেলেন। আনোয়ার সাদতকে তিনি চেনেন, তাকে তুচ্ছ করার কোনও কারণই নেই। বিভিন্ন সময়ে তার প্রদত্ত তথ্যের যথার্থতাও পেয়েছেন তিনি। আনোয়ার সাদত তাকে হতভম্ব হয়ে যেতে দেখে বললেন, ‘‘এই তথ্য পেয়ে আমিও বেশ অবাকই হয়েছিলাম। পরে আমার নিজস্ব গোয়েন্দাদের লাগিয়ে জানলাম ব্যাপারটি ভয়ঙ্কর রকমের সত্যি।’’

জিয়াউর রহমান

দৃশ্যপট— দুই

সাতাত্তর সালের ২৭ তারিখ ছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দিবস। ঠিক করা হয়েছিল ওইদিন ফার্মগেট এলাকায় অফিসারদের জন্য একটি নতুন মেসবাড়ি উদ্বোধন করা হবে। জিয়াউর রহমান ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরবেন এবং ২৮ তারিখে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দিবস উপলক্ষে ওই অফিসার মেসের উদ্বোধন করবেন। অতি সতর্ক এবং চতুর জিয়াউর রহমান তখন অন্য অঙ্ক কষছেন। তিনি তার সফরসূচি অপরিবর্তিত রেখে কাউকে কিছু না জানিয়ে নির্ধারিত তারিখেই দেশে ফিরলেন। তবে একটা ছোট্ট চিরকুট তিনি পাঠিয়ে দিলেন বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল এজি মাহমুদের কাছে। তাতে লিখে দিলেন মাত্র ছোট্ট দু’টি বাক্য— ‘দুঃখিত। আগামীকালের অনুষ্ঠানে আমি অংশ নিতে পারছি না।’ 

আকস্মিক প্রাপ্ত এই চিরকুট বিমানবাহিনী প্রধানকে ভয়ানকভাবে বিচলিত করে দিল। কেন তিনি আসতে পারবেন না, কি এমন বিপর্যয় ঘটলো হঠাৎ করে, আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা পরে শুরু হয়ে যাবে মূল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। এ সময় কাকে প্রধান অতিথি করা হবে। আবার যদি কাউকে দিয়ে অনুষ্ঠান চালিয়েও নেয়া হয় তাহলে জিয়াউর রহমান সাহেব ক্ষুব্ধ হয়ে যান কিনা এমনই নানাবিধ ভাবনায় বিপর্যস্ত বিমানবাহিনী প্রধান। তার ওপর পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধাজনক নয় বলে নানাবিধ গুঞ্জনও তার কানে আসছিল। সেনাবাহিনীর ভেতরকার উত্তাপ তখনও প্রশমিত হয়নি ঠিকমতো। সর্বোপরি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকখানি তরল— এই অবস্থায় কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আবদুল গাফফার মাহমুদ। ঠিক এই সময় ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী ঘটনা। এই ঘটনারই আভাস দিয়েছিলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদত।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে— কী বলেছিলেন আনোয়ার সাদাত? ২৫ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমানকে একান্ত বৈঠকের এক পর্যায়ে পরিষ্কার বলেছিলেন, আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর বিমানবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানের সুযোগে বিমানবাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর সৈনিকরা তথাকথিত বাম এবং জাসদের সাহায্যপুষ্ট হয়ে অকস্মাৎ বিদ্রোহ করে প্রেসিডেন্টকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবে। তারিখটা একেবারে নির্ধারিত- ২৮ সেপ্টেম্বর।

অভ্যুত্থানের সমাপ্তি, সরিয়ে নেয়া হচ্ছে বিমানবন্দরে পড়ে থাকা মররদহগুলো

দৃশ্যপট—৩

অকস্মাৎ একটি সংবাদ বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে গেলো সর্বত্র। শোনা গেল জাপানি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৪৭২ ডিসি-৮ বোয়িং বিমান ১৫৬ জন যাত্রী নিয়ে বোম্বাই থেকে ব্যাংকক যাত্রা শুরু করে মাঝপথে হাইজ্যাকারদের কবলে পড়েছে। হাইজ্যাকাররা অস্ত্রের মুখে পাইলট-ক্রুদের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার জন্য। হুমকি দিয়েছে- যদি তাদের কথা মতো কাজ না করা হয় তাহলে তারা যাত্রী-পাইলট-ক্রু সমেত পুরো বিমানটিকেই বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে। হাইজ্যাকাররা সংখ্যায় পাঁচজন, জাপানের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লাল ফৌজ-এর সদস্য। ওদের দাবি জাপানের কারাগারে তাদের যে ৯ জন সঙ্গী আটক আছে তাদের তাৎক্ষণিক মুক্তি দিতে হবে, দিতে হবে ছয় মিলিয়ন ডলার এবং বিমানটিকে ফুয়েল ভর্তি করে তাদের নির্দেশিত গন্তব্যে নির্বিঘ্নে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই দাবি না মিটিয়ে দিলে তারা যাত্রীদের একে একে হত্যা করবে এবং সবশেষে বাকী যাত্রী পাইলট ক্রু সমেত পুরো বিমানটিকে গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেবে।

দৃশ্যপট— চার

আমি তখন ইত্তেফাকের চীফ রিপোর্টার। একটি জাপানি বিমান ছিনতাই করে তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে একটু দূরে রাখা আছে আর বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে বসে হাইজ্যাকারদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন স্বয়ং বিমানবাহিনী প্রধান— এই খবর পেলাম আমার কলেজ জীবনের বন্ধু এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরত সাঈদের কাছ থেকে। তারই কল্যাণে আমি বিমানবন্দরে অবাধ চলাফেরার সুযোগ পেয়ে গেলাম। এজি মাহমুদ সাহেবের সঙ্গে তেজগাঁও বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারেই পরিচয় এবং বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল। তার কাছ থেকেই পেতাম আলোচনার অগ্রগতি। তখন জিয়াউর রহমান সংবাদজগত থেকে সাময়িকভাবে স্বেচ্ছা নির্বাসিত। জাপানি বিমান নিয়ে সবাই এতো বেশি নিমগ্ন যে বিমানবাহিনী দিবস যে হতে পারেনি সেটা নিয়ে কারও ভাবনা চিন্তার কোনও অবকাশ ছিল না।

নিহত বিদ্রোহীদের মরদেহ এভাবেই পড়ে ছিল বেশ অনেকটা সময়

সেপ্টেম্বরের শেষ তারিখটিও অতিবাহিত। হাইজ্যাকাররা ক্রমান্বয়ে অধীর ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। বিমানবাহিনী প্রধান কন্ট্রোল টাওয়ারে বসে ক্রমাগত দর কষাকষি করে যাচ্ছেন আর নানা প্রক্রিয়ায় হাইজ্যাকারদের শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন যৎসামান্য জাপানি ভাষা আয়ত্তে থাকার সুযোগে। অক্টোবরের প্রথম দিনেই পরিস্থিতিটা অনেক ঘোলাটে হয়ে উঠলো। যে বিশাল অভ্যুত্থান পরিকল্পনা ছিল সেটা ২৮ সেপ্টেম্বর হতে পারলো না সমন্বয়ের অভাবে। জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটা পুরো পরিকল্পনাই এলোমেলো করে দিলো। ফলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তুত থাকা বিমানবাহিনীর এবং সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কোরের একাংশ সেই পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের মতোই বেপরোয়া হয়ে উঠলো।

কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক ঘটনাক্রমে তেজগাঁও বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালে উপস্থিত ছিলেন। নির্মল সেন, এ জেড এনায়েতুল্লাহ খান, হেদায়েত হোসেন মোরশেদ এই ক’জনের কথা মনে আছে। যেহেতু আমার সঙ্গে কয়েকজনের যোগাযোগ ছিল তাই সংবাদ সংগ্রহের প্রয়োজনে আমিও উপস্থিত ছিলাম সেখানে। আমার মূল আগ্রহ ছিল হাইজ্যাকারদের সঙ্গে কথোপকথন, যা থেকে উদ্ধার করা যেতে পারে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। ভোরের দিকে আমার কলেজ জীবনের পরিচিত স্কোয়াড্রন লিডার মতিনের সঙ্গে কথা এবং কুশল বিনিময় হলো। তার পরামর্শ ছিল যাতে আমরা বেশিক্ষণ ওখানে না থাকি। এর বেশ কিছুক্ষণ পরে আমরা তখন ক্লান্তিতে সোফার ওপর শরীরটা এলিয়ে ছেড়ে দিয়েছি, তখন কানে এলো কোলাহল এবং বিক্ষিপ্ত গুলির শব্দ। নির্মল দা, মিন্টু ভাই, মোরশেদ ভাইরা হামাগুড়ি দিয়ে সোফা থেকে নেমে পড়লেন এবং আমি বিষয়টি বুঝবার জন্য জানালার বাইরে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম শরীর হিম হওয়া দৃশ্য। বিমানবাহিনীর কয়েকজন সিনিয়র অফিসারকে হ্যাঙ্গারের কাছে নিয়ে লাইনে দাঁড় করানো হলো। তারপর ব্রাশফায়ার। ওরা ওখানেই লুটিয়ে পড়লেন। ওই লাইনের মধ্যেই দেখতে পেলাম মতিনকে, যে অল্পক্ষণ আগেও আমার সঙ্গে কথা বলেছিলো। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দেখলাম ওই উন্মত্ত সিপাইরা অস্ত্র উঁচিয়ে ছুটে আসছে টার্মিনাল ভবনের দিকে। আমরা অতিদ্রুত নিষ্ক্রান্ত হই। অনেকে প্রাণভয়ে বাইরে বেরিয়ে যান এবং আমি সোজা চলে যাই মূল টার্মিনাল ভবনে। সেখানে দেখি রক্তস্রোত এবং কিছু মৃতদেহ। এজি মাহমুদ লুঙ্গি গেঞ্জি পরে আত্মগোপন করেছেন আর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার একটা বাথরুমের মধ্যে ঢুকে কাঁপছেন। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না ওই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে আমি কিভাবে প্রাণরক্ষা করবো। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তখন খোঁজ নিয়ে জানলাম, মতিন ছাড়াও বিমানবন্দরে যাদের হত্যা করা হয়েছে তারা হলেন— গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার আহমেদ চৌধুরী, উইং কমান্ডার আনোয়ার শেখ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শওকত জান চৌধুরী, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সালাউদ্দিন, ফ্লাইট অফিসার মাহবুবুল আলম ও আখতারুজ্জামান, পাইলট অফিসার এম এইচ আনসার, নজরুল ইসলাম এবং শরিফুল ইসলাম। এছাড়াও বিদ্রোহীরা স্কোয়াড্রেন লিডার সিরাজুল ইসলামের ১৬ বছরের ছেলে এনামকেও হত্যা করেছে। বিদ্রোহীদের এই আক্রমণে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর শক্তি কয়েক মূহুর্তেই অর্ধেক হয়ে যায়।

হ্যাঙ্গারের সামনে বিমানবাহিনী কর্মকর্তাদের মরদেহ, পাশে অস্ত্রহাতে বিদ্রোহীরা

দৃশ্যপট—৫

কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় অভ্যুত্থানের পাশাপাশি প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল বিভিন্ন জেলায় ও বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে। কিন্তু  বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার পর এ সম্পর্কে সব জেলাকে সচেতন করা সম্ভব হয়নি। তাই বগুড়া ক্যান্টমেন্টে বিদ্রোহ দেখা দেয় ৩০ সেপ্টেম্বর। সেখানকার ২২নং ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট দু’জন আর্মি লেফটেন্যান্টকে হত্যা করে। ৯৩ বিগ্রেড কমান্ডারসহ ক’জন অফিসারকে গ্রেফতার করে। বিদ্রোহীরা ব্যারাক ছেড়ে বের হয়। কয়েকটি ব্যাংক লুট করে। জেল ভাঙে। বগুড়ায় আগের বিদ্রোহে যারা কারাভোগ করছিলো তাদের বের করে আনে।

পরদিন (১ অক্টোবর) সামরিক গোয়েন্দারা যশোর থেকে খবর পাঠায় সেখানকার অবস্থাও ভালো নেই। এক শ্রেণির সৈনিক বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। তারা কোনও রকম নিয়ম-কানুন মানতে চাইছে না।

২ অক্টোবর মধ্যরাতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গোলমাল শুরু হয়। ব্যাটালিয়নের সিগনালম্যান সঙ্কেত দিতেই শত শত সৈনিক ব্যারাক ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারা প্রথমেই অস্ত্রগার লুট করে। এরপর ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং সেপাই বিপ্লবের জয়ধ্বনি দেয়।

সেই ধ্বনি কানে যেতেই কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটিতেও শুরু হলো প্রচণ্ড গোলমাল। সেখানেও বেরিয়ে আসে কয়েকশ সৈনিক ও বিমান-কর্মী। তারা কেন্দ্রিয় অস্ত্রগার লুট করে। হাত করে বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে দেয়া হয় বহু লাল ইশতেহার। সেসব ইশতেহারে সেপাই বিপ্লবের ডাক। সৈনিকদের দাবি-দাওয়ার কথা।

তেজগাঁও বিমানবন্দরে অস্ত্র হাতে সৈনিকরা

জেনারেল জিয়া আগেই বুঝতে পেরেছিলেন অবস্থা ভালো নয়। যে কোনও মূহুর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তিনি আগের দিন (১ অক্টোবর) কয়েকজন বিশ্বস্ত সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে একটি গোপন আস্তানায় চলে যান। বিদ্রোহীরা তাকে খুঁজে পায়নি। তাই তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

দৃশ্যপট— ৬

২ অক্টোবর। ভোর তখন পাঁচটা।

একদল সশস্ত্র সৈন্য ও বিমানবাহিনীর কর্মী ট্রাকে করে এসে ঢাকা বেতার কেন্দ্র দখল করে। বেতারে তখন জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের ধারাবাহিক বিবরণ দেয়া হচ্ছিল।

আচমকা তা বন্ধ হয়ে গেলো।

উঠলো কতগুলো বিপ্লবী শ্লোগান।

বিমানবাহিনীর জনৈক সার্জেন্ট আফজার রাষ্ট্রপ্রধান বলে নিজের পরিচয় দিয়ে জানালো, ‘‘বিপ্লব ঘটেছে। দেশ পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছে একটি বিপ্লবী পরিষদ। এই পরিষদের প্রধান আমি-সার্জেন্ট আফজার।’’

কিন্তু হঠাৎ করে ওই বেতার সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেল।

কেননা, সাভারের নবম ডিভিশনের কেন্দ্রিয় দফতরের নির্দেশে, সেখানকার রেডিও ট্রান্সমিটারটি, বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তখনই এই ট্রান্সমিটারের মাধ্যমেই ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সব কিছু সম্প্রচার করা হতো।

এই বিদ্রোহ ছিল মূলত বিমানবাহিনী ও সামরিক সিগন্যাল কোরের। সাপ্লাই ও ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়নের বেশকিছু সৈনিকও এই বিদ্রোহে অংশ নেয়। কিন্তু বিদ্রোহী দলের নেতারা পদাতিক বাহিনীর লোকদের তাদের দলে টানতে পারেনি।

ফলে সকাল ৭টার ভেতরই মেজর মোস্তফা পরিচালিত এক কোম্পানি সৈনিক এয়ারপোর্ট টার্মিনাল পুনরায় দখল করে নেয়। এই সংঘর্ষে ২০ জন বিদ্রোহী নিহত ও ৬০জন বন্দি হয়। বেদখল হবার এক ঘণ্টার মধ্যেই ২৯নং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আর একটি কোম্পানি ঢাকার বেতার কেন্দ্রটি বিদ্রোহীদের হাত থেকে কেড়ে নেয়।

২ অক্টোবর সকাল ৮টার ভেতরই এই বিদ্রোহ মূলত শেষ হয়ে যায়। এরপরও দু’চারটি পকেটে বিদ্রোহের যে আগুন জ্বলছিল, জিয়ার অনুগত সৈন্যরা দু’একদিনের ভেতরই তা নিভিয়ে ফেলে।

একমাত্র কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটি থেকেই বিদ্রোহীদের যেসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়, তিনটি ট্রাক বোঝাই করে সেগুলো ক্যান্টমেন্টে নেয়া হয়। এই সময়ই জাপানি বিমান ছিনতাইকারীরা দুই-তৃতীয়াংশ যাত্রীকে মুক্তি দিয়ে ছিনতাই করা বিমানটি নিয়ে পালিয়ে যায়। দুপুরের দিকে জেনারেল জিয়া ঢাকা বেতার কেন্দ্রে যান। জাতির উদ্দেশে তিনি ঘোষণা করেন, অনুগত সৈন্যরা বিদ্রোহ অভ্যুত্থানকে চূর্ণ করে দিয়েছে। ৫ অক্টোবর নাগাদ ঢাকার জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসে। ওই সময়ে বগুড়ার বিদ্রোহও শান্ত হয়ে যায়।

জেনারেল জিয়া কতটা হিংস্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিলেন— এই বিদ্রোহের শেষে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, এই বিদ্রোহের পর ১৯৭৭ সালের  ৯ অক্টোবর থেকে মাত্র দু’মাসের মধ্যে জিয়া ১ হাজ‍ার ১৪৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। কয়েক শ’ ব্যক্তিকে দেয়া হয় দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড।

আইনের প্রতি সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের উপযুক্ত সুযোগ না দিয়ে, এত দ্রুত এ ধরনের বিচার, কারাদণ্ড এবং ফাঁসি কার্যকর বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।

আবেদ খান ● সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

আরও পড়ুন