• ঢাকা
  • শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২০, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: মে ১, ২০২০, ০৪:৩২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ৯, ২০২০, ০১:০৫ পিএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি-২৯

মেজর মঞ্জুর ও জিয়া হত্যার পূর্বাপর— এক

আবেদ খান
মেজর মঞ্জুর ও জিয়া হত্যার পূর্বাপর— এক

জেনারেল জিয়া হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কিছু তথ্য আছে প্রকাশ্য, আবার কিছু ঘটনা এখনও গোপনই রয়ে গেছে। যে ঘটনাগুলো সবাই জানেন এবং যে বিষয়গুলো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তাহলো— ১৯৮১ সালের ২০ মে বেলজিয়ামের রাজা বাওদোইন ও রানি ফ্যাবিওলা বাংলাদেশ সফরে এলেন। জেনারেল জিয়া এবং তার স্ত্রী খালেদা জিয়া তাদের স্বাগত জানালেন। এর আগেও বিদেশি অনেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। কিন্তু একটি দেশের রাজা ও রানির বাংলাদেশ সফরে আসার ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। তাই বেলজিয়ামের রাজা ও রানির ৪ দিনের সফর উপলক্ষে জেনারেল জিয়া রাজকীয় সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সফর শেষে বেলজিয়ামের রাজা-রানি ঢাকা ছাড়েন মে মাসের ২৩ তারিখে। পরের দিন (২৪ মে) জিয়ার সৌদি আরবের জেদ্দা যাওয়ার কথা। ইসলামী সম্মেলন সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত ইরান-ইরাক যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে। বৈঠক ঠিকমতো অনুষ্ঠিত হলে জিয়ার অন্ততপক্ষে ৭ দিন দেশের বাইরে থাকতে হতো। কিন্তু কোনও এক অদৃশ্য কারণে ওই বৈঠক স্থগিত হয়। ফলে জিয়াকে বাধ্য হয়েই তার বিদেশ সফর বাতিল করতে হয়। সেই সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন রাজশাহীতে যাবেন এবং তার ব্যক্তিগত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজকে ২৯ মে রাজশাহীর সফরসূচি তৈরির নির্দেশ দেন। কিন্তু এই সফরের পরিকল্পনাও তিনি বাতিল করলেন। তিনি কেন জানি চট্টগ্রামে যাওয়াটাকেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করলেন। 

মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর ( বীর উত্তম)

যে ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল এবং সেই আবদ্ধ সময়ে যে তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়নি তাহলো— ওই সময় চট্টগ্রামে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধিতা চরমে উঠেছিল। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী জামাল উদ্দিন আহমদ এবং অন্য গ্রুপের নেতা ছিলেন ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমদ চৌধুরী। এই দুই গ্রুপের বিরোধ মেটানোর জন্য জেনারেল জিয়ার উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। মে মাসের ২৫ তারিখে তিনি তার সামরিক সচিবকে রাজশাহী সফর বাতিল করে চট্টগ্রামের সফরসূচি তৈরি করার নির্দেশ দেন। জেনারেল জিয়ার এই সিদ্ধান্ত তার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োজিতদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করলো। কারণ যেদিন তিনি চট্টগ্রামের সফরসূচি তৈরি করতে নির্দেশ দেন সেই দিনই তিনি চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলির আদেশে সই করেছেন। জেনারেল মঞ্জুর এই বদলির আদেশ মেনে নিতে পারেননি এবং তা সহজভাবে নেননি। যদিও তিনি চট্টগ্রামের জিওসি পদে ইতিমধ্যেই তিন বছরের অতিরিক্ত ছয় মাস কাটিয়েছেন। মঞ্জুর আরও ক্ষেপে যান যখন শুনলেন ২৯ মে জিয়ার চট্টগ্রাম আগমন উপলক্ষে তাকে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। যদিও প্রটোকল অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের আগমন উপলক্ষে পতেঙ্গা বিমানবন্দরে তার উপস্থিত থাকার কথা। এক্ষেত্রে কারণ দর্শানো হলো যে, যেহেতু প্রেসিডেন্টের এই সফরটি রাজনৈতিক কারণে, সেহেতু জিওসি’র বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন নাই। কিন্তু মঞ্জুর ধরে নিলেন যে, তাকে অপমান করার জন্যই এই সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে। এর একটি কারণও ছিল। কেননা নৌবাহিনীপ্রধান রিয়াল অ্যাডমিরাল এম এ খান জিয়ার সঙ্গে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দিনের উপস্থিত থাকার কথা। এসব কিছু জানার পর মঞ্জুর খুব রাগান্বিত হলেন এবং তিনি তার এই মনের অবস্থা গোপনও রাখলেন না। জেনারেল মঞ্জুর ও তার সহযোগীরা বারবার ঢাকায় প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিবকে ফোন করে জানতে চাইলেন কেন চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্টের অভ্যর্থনা কমিটিতে মঞ্জুরকে রাখা হয়নি। বারবার টেলিফোনে বিরক্তি চেপে সামরিক সচিব মঞ্জুরকে বলেন, স্যার প্রেসিডেন্ট চান না আপনি সেখানে উপস্থিত থাকেন। ফলে মঞ্জুর আর কথা বাড়াননি।  

‘জিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে বদলি করে ঢাকায় স্টাফ কলেজে কমান্ড পদে নিয়োগ করবেন। এ ধরনের বদলির আদেশ সচরাচর ঘোষণার আগে গোপন রাখা হয়, কিন্তু মাহফুজ মতিউরকে মঞ্জুরের বদলির খবর জানিয়ে দেন। খবরটি শুনে মতিউর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। মতিউর মনে করেন, এটি হচ্ছে জিয়া ও সামরিক বাহিনীর সদর দফতরের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কার্যকলাপের বহির্প্রকাশ’

........‘’........

সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান (ডিজিএফআই) মেজর জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরী জেনারেল জিয়াকে পরামর্শ দিলেন তিনি যেন পহেলা জুনের আগে চট্টগ্রাম না জান। এনএসআইও জিয়াকে একই পরামর্শ দেয়। কারণ এই সময় ঢাকার নতুন কর্মস্থলে জেনারেল মঞ্জুরের যোগ দেয়ার কথা। কিন্তু জিয়া কারও কথায় কান দিলেন না, সবার পরামর্শ উপেক্ষা করলেন। চট্টগ্রামের রওনা হওয়ার আগে ডিজিএফআই জিয়াকে আবারও অনুরোধ জানায় তাদের পরামর্শ শোনার জন্য। কিন্তু জিয়া তাতেও রাজি হলেন না। ফলে তারা জিয়াকে রাতে চট্টগ্রামে না থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু জিয়া এই পরামর্শও গ্রাহ্য করলেন না। জিয়া কাউকে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু চট্টগ্রামের যাওয়ার ক্ষেত্রে তার আচরণ ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি ধারণা করেছিলেন মঞ্জুরকে বশ করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এর আগে ১৯৮১ সালের ২০ মে লে. কর্নেল মতিউর ঢাকা আসেন একটি ইন্টারভিউতে উপস্থিত থাকার জন্য। বিদেশে একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। দুই বছর ধরে মতিউর অন্যদের সঙ্গে চট্টগ্রামের জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। পরপর কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন এবং বিদেশ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার বিদেশ যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে আবার জিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। ঢাকায় মতিউর তার পুরনো বন্ধু লে. কর্নেল মাহফুজের সঙ্গে দেখা করেন। মাহফুজ ছিলেন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সচিব। আলোচনার এক পর্যায়ে মাহফুজ মতিউরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তিনি জানান, জিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে বদলি করে ঢাকায় স্টাফ কলেজে কমান্ড পদে নিয়োগ করবেন। এ ধরনের বদলির আদেশ সচরাচর ঘোষণার আগে গোপন রাখা হয়, কিন্তু মাহফুজ মতিউরকে মঞ্জুরের বদলির খবর জানিয়ে দেন। খবরটি শুনে মতিউর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। মতিউর মনে করেন, এটি হচ্ছে জিয়া ও সামরিক বাহিনীর সদর দফতরের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কার্যকলাপের বহির্প্রকাশ। তাই একটা কিছু করা দরকার। মাহফুজ জানালেন, ২৯ মে তারিখে জিয়া চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন। আর ঠিক তখনই মতিউরের মাথায় জিয়া হত্যার পরিকল্পনা আসে। ওইদিনই মতিউর ও মাহফুজ জিয়া হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে। মাহফুজের সহযোগিতায় মতিউর বঙ্গভবনে গিয়ে স্বয়ং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং হেলিপ্যাড পর্যবেক্ষণ করে। পরের দিন চট্টগ্রামে ফিরে গিয়ে মতিউর কর্নেল দিলওয়ার ও মেজর খালিদের সঙ্গে আলোচনা করে। মতিউর তাদের জানান যে, মঞ্জুরকে বদলি করা হয়েছে এবং জিয়া চট্টগ্রাম সফরে আসছেন। মতিউর তাদের জানান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হামলা করে জিয়াকে বন্দী করতে হবে। তাকে বন্দী করে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল এরশাদ, জেনারেল মীর শওকত আলী, নবম ডিভিশনের কমান্ডার এবং অন্যান্য প্রিন্সিপাল অফিসারদের ডাকা হবে। তাদের সবাইকে পদত্যাগ করতে বলা হবে অথবা তাদের হত্যা করা হবে। মতিউর খালিদকে বললেন, “এই কাজের জন্য আমাদের ৩০ জন অফিসার দরকার। আমি খুব ভালো করে বঙ্গভবন দেখে এসেছি। আমি বলছি এটা করা সম্ভব।” খালিদ সঙ্গে সঙ্গে আঙুলে ৩০ জন অফিসারের নাম গুনতে শুরু করলেন যারা এই কাজে সহযোগী হতে পারেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি গোনা বন্ধ করে বললেন, “এটা খুব রিস্কি হয়ে যায়, এভাবে সম্ভব নয়।”

তিনজন অফিসার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা করলেন। কিন্তু তারা একমত হতে পারলেন না। শুধু একটা ব্যাপারে তারা একমত হলেন যে, অবিলম্বে একটা কিছু করা দরকার। মঞ্জুর চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে গেলে আর এই সুযোগ পাওয়া যাবে না। জিয়াকে হত্যা করতে হবে এবং এটা ২৯ তারিখেই করতে হবে। এ সময় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে নৈশকালীন প্রশিক্ষণ চলছিল। ফলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল সার্কিট হাউসে গেলে তা কারও নজরে পড়বে না। তখন ২১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চারটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন এই অঞ্চলে অবস্থান করছিল। এছাড়াও ৬ ইস্টবেঙ্গলকে “এক্সারসাইজ আইরন শিল্ডে” অংশগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম আনা হয়েছিল। ২৪ পদাতিক ডিভিশনের দুইজন ছাড়া বাকি সব অফিসার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। পদাতিক ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার এবং সেকেন্ড-ইন-কমান্ডারও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের এই পরিকল্পনায় জড়িত করার উদ্দেশে মতিউর বলেন, ঢাকায় গিয়ে তিনি জানতে পেরেছেন যে, চট্টগ্রামের সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যা করার একটি ষড়যন্ত্র চলছে। তার এই বক্তব্যকে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য তিনি তখন একটি তালিকা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দেখান। এই তালিকায় বেশ কিছু নামের পাশে তারকা চিহ্ন দেয়া। মতিউর জানান, চিহ্নিত অফিসারদেরই খুন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তালিকা দেখে ৬৫ পদাতিক ডিভিশনের ব্রিগেড মেজর আবদুল কাইয়ুম খান এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে তিনি সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধ অফিসারদের এই খবর সম্পর্কে অবহিত করেন। ২৮ মে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে যে, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই খবর আরও বিশ্বাসযোগ্য হয় যখন সবাই জানতে পারে যে মঞ্জুরকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। এরপর মঞ্জুর সমর্থকদের এগিয়ে যাওয়ার পথে আর তেমন কোনও বাধা থাকে না। সেই দিনই তাদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লো যখন তারা জানতে পারলো পতেঙ্গা বিমানবন্দরে জিয়ার আগমন উপলক্ষে মঞ্জুরকে সেখানে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। মতিউর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিবকে টেলিফোন করলেন। ঘটনার সত্যতা জানতে পেরে মতিউর এবং তার সহযোগীরা খুব ভয় পেয়ে গেলেন। তারা মনে করলেন, নিশ্চয় তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে। কাজেই তারা স্থির করলেন তাদের বিরুদ্ধে জিয়া ব্যবস্থা নেয়ার আগেই তারা আঘাত হানবেন।

১৯৮১ সালের ২৯ মে শুক্রবার। সকাল ৯ টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে জিয়া চট্টগ্রাম গেলেন। সঙ্গে গেলেন নৌবাহিনীপ্রধান রিয়াল অ্যাডমিরাল এম এ খান ও বিএনপি’র কয়েকজন নেতা। বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মন্ত্রী সৈয়দ মহিবুল হাসান, আমিনা রহমান, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী। ৫০ মিনিট পর বিমানবন্দরে পৌঁছলে জিয়াকে অভ্যর্থনা জানান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দিন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিএনপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। কিন্তু মেজর জেনারেল মঞ্জুর সেখানে হাজির হননি। কারণ তাকে বিমানবন্দরে উপস্থিত হতে নিষেধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ জুন এর আগেই তাকে ঢাকার কর্মস্থলে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঢাকায় মঞ্জুরের পদমর্যাদা কলেজের একজন সম্মানিত প্রিন্সিপাল ছাড়া আর কিছু নয়। তারমতো একজন সামরিক অফিসারের জন্য এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কিছু নেই।

বঙ্গবন্ধুর সাথে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর ( বীর উত্তম)

‘মতিউর জানান, চিহ্নিত অফিসারদেরই খুন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তালিকা দেখে ৬৫ পদাতিক ডিভিশনের ব্রিগেড মেজর আবদুল কাইয়ুম খান এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে তিনি সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধ অফিসারদের এই খবর সম্পর্কে অবহিত করেন। ২৮ মে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে যে, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই খবর আরও বিশ্বাসযোগ্য হয় যখন সবাই জানতে পারে যে মঞ্জুরকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে’

........‘’........

জিয়া এদিন সকালে বিমানবন্দর থেকে সার্কিট হাউসে পৌঁছানোর পর তাকে হালকা খাবার পরিবেশন করা হয়। নিরাপত্তার নিয়ম অনুযায়ী জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক লে. কর্নেল মাহতাবুল ইসলাম তার জন্য পরিবেশিত চা ও বিস্কুট খেয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। এরপর জিয়া প্রায় দুই ঘণ্টা সার্কিট হাউজের বারান্দায় বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সাড়ে ১২টার দিকে জুমার নামাজের জন্য আলোচনা বন্ধ রাখা হয়। জিয়া পাঞ্জাবি- পায়জামা পড়ে চকবাজারের চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে তিনি উপস্থিত জনগণের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটান। তারপর সার্কিট হাউসে ফিরে দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দুপুরের খাবার খান। এরপর তিনি প্রায় ঘণ্টা দেড়েক বিশ্রাম নিন। বিকেল পাঁচটায় তিনি এক কাপ চা খেয়ে নিচের তলায় সম্মেলন কক্ষে আসেন। এখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় ৪৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তাদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ কয়েকজন অধ্যাপক, বারের সদস্য এবং কয়েকজন সাংবাদিক। তাদের সঙ্গে জিয়া প্রায় আড়াই ঘণ্টা কথা বলেন। এরপর তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের বিরোধ নিরসনের কাজে মনোযোগ দেন। মূলত এজন্যই তার এই চট্টগ্রাম সফর।

 রাত ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে জিয়া দলীয় ৯ জন নেতার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। কিন্তু তাতেও বিরোধ মিটলো না। দলের দুই গ্রুপই তাদের অবস্থানে ‍অটল রইলো। তারা কেউই তাদের অবস্থান থেকে সরতে রাজি নয়। কিন্তু জিয়া এতে খুব একটা চিন্তিত নন। কেননা নিজেদের মধ্যে যত কোন্দলই হোক না কেন দু’টি গ্রুপই তাকে বেশ মান্য করে। তিনি ভাবলেন, দলে থাকতে হলে ধীরে ধীরে তাদের কোন্দল মিটে যাবে। জোর করে কোনও সমাধান চাপিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত তা টিকবে না। তাই তিনি সেই পথে গেলেন না। দলীয় কোন্দলের অবস্থা যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেল।

দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনার এক ফাঁকে জিয়া বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন আহমেদ এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবিএম বদিউজ্জামানের সঙ্গে কিছু সময় কাটান। সাইফুদ্দিন পরে জানান, সে সময় তারা সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। প্রায় ৪০ জন ব্যক্তির বিভিন্ন কার্যকলাপ তিনি জিয়াকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, এইসব ব্যক্তি জমি দখল, বেআইনি অস্ত্র বহন করা ছাড়াও শহরের সন্ত্রাস সৃষ্টি করছিল। পুলিশ এদের ধরতে চাইছে। কিন্তু এরা সবাই বিএনপির সদস্য।

রাত ১১টার কিছুক্ষণ পর জিয়াকে রাতের খাবার পরিবেশন করা হয়। রাত ক্রমেই গভীর হচ্ছে। সার্কিট হাউসের ঘড়ির কাটা মধ্যে রাতের দিকে এগুচ্ছে। বাইরে বাইরে তুমুল ঝড়, মাঝে-মধ্যে  বিজলি চমকাচ্ছে, সঙ্গে বজ্রপাতের আওয়াজ। সার্কিট হাউসের ৪ নম্বর ঘরে জেনারেল জিয়া একা। সারাদিনের ক্লান্তির পর এইতো তার বিশ্রাম নেবার সময়। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। জিয়া তার স্ত্রীর খালেদার সঙ্গে ১৫ মিনিট ফোনে কথা বললেন। এটাই ছিল তাদের শেষ ফোনালাপ। ফোনে জিয়া তার স্ত্রীকে জানান, এখানে বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঝড়। সকালে ঢাকায় ফিরে তিনি তার সঙ্গে নাশতা করবেন। ফোনালাপ শেষে জিয়া নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে গেলেন।

সপরিবারে মঞ্জুর

অন্যদিকে এদিন দুপুরের পর মঞ্জুর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বাসায় ডেকে পাঠান। এ বৈঠকে উপস্থিত হন লে. কর্নেল মাহবুবুর রহমান, লে. কর্নেল দিলওয়ার এবং মেজর খালিদ। ইনার গ্রুপের চতুর্থ সদস্য লে. কর্নেল মতিউর আসেননি। তিনি হঠাৎ রাঙামাটি গেছেন। কিন্তু কেন? মঞ্জুর বারবার মতিউরের অনুপস্থিতির ব্যাপারে জানতে চাইছিলেন। তাকে জানানো হলো মতিউর খুব শিগগিরই ফিরে আসবেন। উপস্থিত সহযোগীদের মঞ্জুর বললেন, “আঘাত করার সময় এসে গেছে। তোমরা কিভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে আমি জানি না। সৈন্যদের সঙ্গে নেয়া চলবে না। তোমরা নির্দিষ্ট কয়েকজন সার্কিট হাউসে যাবে জিয়াকে তুলে আনতে। সকালে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো এবং দুর্বল পয়েন্টগুলো পাহারা দেয়া হবে।” একথা শেষ হতেই মঞ্জুরের বিশ্বস্তরা সেখান থেকে চলে যান।

চলবে...

আবেদ খান ● সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

আরও পড়ুন