• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২০, ২৪ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: মে ৩, ২০২০, ০৫:৫৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ৩, ২০২০, ০৬:৫৮ পিএম

চেতনার ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখি

কামাল পাশা চৌধুরী
চেতনার ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখি
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম  • কামাল পাশা চৌধুরী

ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই জেগে ওঠে ফিনিক্স পাখি। ধ্বংসযজ্ঞের নিষ্প্রাণতাকে পরিহাস করে দীপ্তকণ্ঠে গেয়ে ওঠে জীবনের বিজয় সঙ্গীত। না, কোনও পৌরাণিক কাহিনীর কথা নয়। আমি আমার জীবন, জীবন সংগ্রাম, আমার সমকাল, আমার প্রিয় মাতৃভূমি ও মায়ের কথা বলছি। ১৯৭১ থেকে ১৯৯২ একটা জাতির হাজার বছরের শ্রম-সাধনা ও নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বপ্নের পর্যায়ক্রমিক ধ্বংসের এক দুঃসহ সময়। আদর্শের বিচ্যুতি, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা-খুন, অবৈধ ক্ষমতা দখল ও ইতিহাস বিকৃতকরণের ঘৃণ্য প্রক্রিয়ায় যখন বিভ্রান্ত নতুন প্রজন্ম; বিস্মৃতপ্রায় তার স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাস, আত্মকেন্দ্রিকতা ও হতাশার অবগুণ্ঠণে সুপ্ত সব সচেতন বিবেক। এমনি এক অশুভ সময়ের মোক্ষম লগ্নে তার বিবর ছেড়ে বাইরে এসে নতুন করে মুখব্যাদান করল পুরনো শ্বাপদ। একাত্তরের হিংস্র ঘাতক গোলাম আযম। বাঙালি জাতির শেষ সত্তাটুকু ধ্বংস করার এটাই ছিল শেষ থাবা।

আর তখনি সেই ধ্বংস প্রক্রিয়ার সব বৈরিতাকে চ্যালেঞ্জ করে ফিনিক্স পাখির মতই আত্মপ্রকাশ করলেন জাহানারা ইমাম। গোটা জাতি মুগ্ধ বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখল সেই শুভ্রবসনা শাশ্বত জননীরূপ। যার দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাট নেত্র আগুনবরন।

পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী আমির ঘোষণা করে ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর। গোলাম আযমকে আমির ঘোষণার পর এর প্রথম প্রতিবাদ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। রাজনৈতিক দলগুলো তখন শুধু বিবৃতি দানেই সীমাবদ্ধ রাখে তাদের কার্যক্রম। এর প্রতিবাদে এ সময়ে সবচেয়ে বড় কার্যক্রম হিসেবে ২০ জানুয়ারি ৯২ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ শেষে জিরো পয়েন্টে একটা গোলাম আযমের বৃহৎ কুশপুত্তলিকা দাহ ছাড়া আর কারও তেমন কোনও প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। তবে এর মাঝেই ১৯ জানুয়ারি’ ৯২ জাহানারা ইমামকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ১০১ সদস্যের ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি।’

পাশাপাশি ‘মুক্তিদ্ধের চেতনাবিরোধী চক্র প্রতিরোধ মঞ্চ’ নামে আরও একটা কমিটি গঠিত হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনকে নিয়ে। ঘটনাচক্রে দু’টো কমিটিতেই সদস্য রাখা হয় আমাকে। আর ছাত্রসংগঠনগুলোকেও সদস্য রাখার প্রস্তাব দেয়া হয় দুই কমিটি থেকেই। তখন ছাত্র সংগঠনগুলো একসাথে হয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেই এই দু’টো কমিটিকে একটি কমিটিতে রূপ দেয়ার। এবং এই একত্রীকরণের কার্যক্রম হিসাবেই দুই কমিটির সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলতে থাকে আর তখনই জাহানারা ইমামের সঙ্গে আমি ভালভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাই।

তার সাথে প্রথমবার আলাপ করেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তিনি শুধু একজন সাধারণ লেখিকা বা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা নন। তার ভেতরে সুপ্ত আছে এক অমিত শক্তিধর আগ্নেয়গিরি আর তার উদগীরণের ক্ষণও বুঝি আগত প্রায়। তার চোয়াল ও জিহ্বার অসুস্থতাজনিত সমস্যা সত্বেও সুবিন্যস্ত শব্দ প্রয়োগে সহজ ও সরাসরি কথা বলা। সব বিষয় সম্পর্কে আধুনিক ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু তিনি যে একজন সহজাত সংগঠক ও নিরলস কর্মী, নেতৃত্ব দানের দুর্দমনীয় ক্ষমতার অধিকারী আজন্ম স্বাধীনচেতা এক অনন্য ব্যক্তিত্ব তা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে। আর আরও পরে বুঝতে পেরেছিলাম  এসব কিছুর ঊর্ধ্বে তিনি একজন শাশ্বত জননী।

শাহে আলম, নাজমুল হক প্রধান, শফী আহমেদ, অসীম কুমার উকীল, কামাল হোসেন, নাসিরুদ্দোজা, নূর হোসেন বকুল প্রমুখ ছাত্রনেতাদের মধ্যস্থতায় ১ ফেব্রুয়ারি’৯২ উল্লিখিত দুই কমিটিসহ রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক জোটসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব মহলের প্রতিনিধিতে গঠিত হল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি।’ আর সর্বসম্মতিক্রমে তার আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হল জাহানারা ইমামকে। (এই দিনই ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী আমাকে জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।)

নতুন করে ঘোষণা দেয়া হল ২৬ মার্চ ৯২ ঘাতক গোলাম আযমের বিচার করা হবে প্রকাশ্যে গণআদালতের মাধ্যমে। এ সময় সরকার ছাড়াও সমন্বয় কমিটির ভেতর থেকে অনেক প্রভাবশালী নেতা ও সংগঠন গণআদালতের বিরোধিতা শুরু করেন। কিন্তু জাহানারা ইমামকে দেখেছি তাদের সব রকম প্রচেষ্টা ও কূট-কৌশলের বিরুদ্ধেই তিনি ছিলেন সক্রিয় এবং অবিচল। সমন্বয় কমিটি প্রথম কর্মসূচি নিয়ে জনসমক্ষে আসে ২১ ফেব্রুয়ারি’ ৯২। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসে তাদের মাঝে গণআদালতের প্রচারণা চালানোর জন্য একটা মঞ্চ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বক্তৃতা করা হবে। এস এম হল এবং জগন্নাথ হলের মাঝের যে সড়ক দ্বীপটি তার ওপরেই মঞ্চ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এই স্থানটি শহীদ মিনারে যাওয়ার রাস্তার পাশে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ওপর দায়িতৃ দেয়া হয় মঞ্চ নির্মাণ এবং অনুষ্ঠানের। সহযোগিতায় থাকার কথা ছাত্র সংগঠনগুলোর। তার আগের দিন ২০ ফেব্রুয়ারি আমি প্রতি বছরের মত শহীদ মিনারে আলপনা আঁকছি। মূল বেদীতে আলপনা শেষ করে সামনের রাস্তায় মাত্র আঁকা শুরু করেছি, এ সময় একটা রিক্সা এসে আমাদের আলপনার জন্য ঘের দেয়া স্থানের পাশে থামল, মনে হল রিক্সায় একজন মহিলা। এই দিন আলপনা আঁকা দেখার জন্য অনেক মহিলাই শহীদ মিনারে আসেন। আমি তাই ভালভাবে লক্ষ্য করিনি। হঠাৎ দেখি রিক্সা থেকে আমাকে ডাকছেন জাহানারা ইমাম। আমি কিছুটা অবাক হয়েই তার রিক্সার কাছে গেলাম। তিনি আমার হাতে কতগুলো পোস্টার ধরিয়ে দিলেন। পোস্টারগুলো গণআদালতের প্রচার পোস্টার। আমাকে বললেন, “কাল শহীদ মিনারে অনেক মানুষ আসবে তাই পোস্টারগুলো শহীদ মিনারের আশপাশে লাগিয়ে দে। আর আলপনা শেষ করে বাসায় এসে খেয়ে যাবি। খেজুরগুড়ের সন্দেশ এনে রেখেছি।” আমি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। এবার সত্যি অভিভূত হয়ে গেলাম। এত বড় আন্দোলনের নেত্রী, তিনি নিজে রিক্সায় চড়ে এসেছেন পোস্টার লাগানোর জন্য!...

আন্দোলনের প্রতি এই নিষ্ঠা আর পাশাপাশি স্নেহময়ী মাতৃরূপ দুই বিপরীত ধারার কী অপূর্ব সমন্বয়! পরদিন কিছু অনির্ধারিত জটিলতার কারণে মঞ্চ তৈরি সম্ভব হয়নি। আমরা ভোরবেলা টিএসসিতে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এস এম হলের সামনের অনুষ্ঠানটি করা হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টায় জাহানারা ইমাম স্বয়ং পায়ে হেঁটে গিয়ে টিএসসিতে উপস্থিত। তিনি এসেই প্রশ্ন করলেন অনুষ্ঠান কখন শুরু হবে? তার চেহারা দেখেই আমরা যারা সেখানে উপস্থিত ছিলাম আমি, সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম কুদ্দুছসহ ছাত্রনেতারা কেউই তাকে বলতে পর্যন্ত সাহস পেলাম না যে অনুষ্ঠান করা যাবে না। তখনই একজনকে পাঠিয়ে মাইক এনে টিএসসি থেকে নাটকের সেট নিয়ে এক ঘন্টার মধ্যে মঞ্চ তৈরি করে আমরা অনুষ্ঠান শুরু করলাম এবং সেটা ছিল একটা সত্যিকার অর্থে সফল প্রচার অনুষ্ঠান। যে সব রাজনৈতিক নেতারা মঞ্চের পাশ দিয়ে শহীদ মিনারে যাচ্ছিলেন সেই নেতাগণ প্রায় সবাই সেই মঞ্চ থেকে ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবিতে বক্তৃতা করলেন। আর তখন দেখলাম জাহানারা ইমামের অন্য রকম মুখচ্ছবি। সে মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত।

এভাবেই তিনি তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সবার কাছ থেকে কাজ আদায় করে এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়েছেন।‌ তার সংশপ্তক রূপ আমরা দেখেছি গণআদালতের একদিন আগে ২৫ মার্চ। গণআদালত বানচাল করার জন্য তখন সরকার যেমন হুমকি প্রদান করছিল লাগাতার, তেমনি আগেই বলেছি সমন্বয় কমিটিভুক্ত কিছু সংগঠন ও তার প্রভাবশালী নেতা ভীত হয়ে বা অন্য কারণে যে কোনও মূল্যে গণআদালত বন্ধ করে দেয়ার প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত ছিল। ২৫ মার্চ তাদের তৎপরতা চরমে পৌঁছায়।

আমি আর হাসান আরিফ সেদিন গণআদালতের মঞ্চ তৈরির দায়িত্বে। বার বার চেষ্টা সত্বেও পুলিশের বাধার কারণে মঞ্চ নির্মাণ সম্ভব হচ্ছিল না। আমরা তাই সিদ্ধান্ত নিলাম রাতে মঞ্চ তৈরি করব। আর অগত্যা যদি সম্ভব না হয় চারটা ট্রাকের ওপর একটা বিকল্প মঞ্চের ব্যবস্থা থাকবে। চূড়ান্ত মূহূর্তে ট্রাকগুলো গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে পার্কের দেয়াল ভেঙে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে যাবে। উল্লেখ্য, এই বিকল্প ব্যবস্থাই পরে কার্যকরী হয়। শুধু মাইকের যন্ত্রপাতি বাহক ট্রাকটা পুলিশ আটকে ফেলতে সমর্থ হয়েছিল। ফলে মাইক ছাড়াই গণআদালত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যাক যা বলছিলাম, ২৫ মার্চ গণআদালতের বিষয়ে কমিটির শেষ সভা ডাকা হয় সন্ধ্যে সাতটায় ন্যাপ কার্যালয়ে। সেখানে গণআদালতবিরোধীরা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে উপস্থিত হয়। সেই সভার আগে আমার সাথে স্বল্পক্ষণের জন্য কথা হয় জাহানারা ইমামের। আমি বললাম যারা গণআদালতের বিরোধিতা করছে তারা আমাদের লোক নয়। আপনি বলুন তাদের এই সভা থেকে বের করে দেই। তিনি বললেন তার দরকার নেই। তোরা যদি থাকিস তবে আমিও আছি। তোরা প্রস্তুতি ঠিক রাখ গণআদালত হবেই। এরপর দেখলাম তিনি সভা শুরু করেই অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন, “গণআদালত হবেই। এ বিষয়ে নতুন করে কোনও আলোচনা নেই। যদি প্রস্তুতির ব্যাপারে কোনও আলোচনা থাকে তবে করুন তা না হলে সবাই কাজে যান।” তার এই কথার পর দেখলাম যারা অনেক আটঘাট বেঁধে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন সবাই কেমন নিশ্চুভাবে বসে রইল। আমরা প্রস্তুতি বিষয়ক কিছু কথা বলেই সেদিন সভা শেষ করলাম।

এ আন্দোলনের শুরু থেকে বাইরে এবং ভেতরে জাহানারা ইমামকে সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু কোনও সংগঠন বা ব্যক্তির চাপেই তিনি কখনও তার লক্ষ্য থেকে পিছপা হননি। তিনি সব সময় বলতেন, “যে মানুষ লোভ আর ভয়কে জয় করতে পারে তার শক্তি অপরিসীম।’’

তিনি ছিলেন এরকমই একজন শক্তিধর মানুষ।

তার শেষ জীবনের কার্যক্রম ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে মূল্যায়ন করা খুবই দুরূহ। নেত্রী হিসেবে তিনি শুধু সফলই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অদ্ধিতীয়া। কিন্তু নেতৃত্বের প্রতি কোনও রকম লোভ তার ছিল না। তিনি এই সমাজের কাছ থেকে নিজের জন্য কিছুই আশা করেননি। তিনি শুধু দিতে চেয়েছেন এবং আমৃত্যু তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে গেছেন এই দেশের জন্য, এই জাতির জন্য। তাকে সরকার রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। কিন্তু জাহানারা ইমামের তাতে অপমান হয়নি। বীরযোদ্ধার শরীরে শক্রর অস্ত্রাঘাতের ক্ষতচিহ্ন বীরের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে। এটা তার অলংকার এবং অহংকার।

শঙ্কা, বিপদ, আনন্দ, উত্তেজনাময় চলমান আন্দোলনের অনেক ঘটনার মাঝেও আরেকটি দিনের কথা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে। এ বছর অর্থাৎ ১৯৯৪ সনের ২৫ মার্চ রাত। জাতীয় সমন্বয় কমিটি এই দিন কালোরাত পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

সারাদেশের শহীদ মিনারে রাত ১১ টা ১০ মিনিটে মোমবাতি জ্বালিয়ে সেই কর্মসূচি পালিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে শহীদ মিনারে একটি বিশাল মোমবাতি জ্বালিয়ে জাহানারা ইমাম এই কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন। তারপর সবাই জগন্নাথ হলের গণকবরে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবে।

সেই বিশাল মোমবাতিটি তৈরির দায়িত্ব অর্পিত হয় আমার ওপর।মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ডের কর্মীরা যারা প্রথম থেকে এই আন্দোলনে মরণপণ কাজ করে আসছে অথচ যাদের কথা কেউ জানে না সেই পরাগ, দীপ, মামুন, তুহীন, আলম, মনু, বারি, নয়ন, মৃদুল, ভুটুসহ অন্যান্যদের নিয়ে বিশাল মোমবাতিটি তৈরিসহ কয়েক হাজার মোমবাতি আমরা সংগ্রহ করি এবং সেই অনুষ্ঠানে জনতার মাঝে বিলিয়ে দেই। অনেকে অবশ্য মোমবাতি নিজেরাই নিয়ে আসেন।

ঠিক ১১টা ১০ মিনিটে জাহানারা ইমাম প্রথম প্রজ্জ্বলিত করেন বিরাটকায় মোমবাতিটি। সাথে সাথে কালোরাত আলো করে জ্বলে ওঠে হাজার হাজার মোমবাতি। আর সেই সাথে অজিত রায়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় জাতীয় সঙ্গীত। জাতীয় সঙ্গীত শেষে সবাই বাতি হাতে রওনা দেন জগন্নাথ হলের গণকবরের দিকে। জাহানারা ইমামও অসুস্থ শরীরে সবটুকু রাস্তা পায়ে হেঁটে সেখানে যান। সেই অপরূপ দৃশ্য বাতি হাতে জাহানারা ইমাম আর তার আগে-পিছে অসংখ্য জ্বলন্ত মোমবাতি— এটাই যেন শাশ্বত রূপ। অনির্বাণ আলোকবর্তিকা হাতে তিনি যুগ যুগ ধরে পথ দেখাচ্ছেন সম জাতিকে। এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের ভুলে যাওয়া ইতিহাসের দিকে।

লেখক ● ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

সম্পাদনা : এস এম সাব্বির খান, সহ-সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ