• ঢাকা
  • রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৫ আশ্বিন ১৪২৭
প্রকাশিত: আগস্ট ২০, ২০২০, ০২:৪৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ২০, ২০২০, ০২:৫৯ পিএম

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী

এক মৃত্যুঞ্জয়ী দুরন্তবাজের কথা

এস এম সাব্বির খান
এক মৃত্যুঞ্জয়ী দুরন্তবাজের কথা

'বাংলার আকাশ রাখিবো মুক্ত', সদম্ভে এই শৌর্য্যমণ্ডিত স্লোগান বুকে ধরে, দেশমাতৃকার অতন্দ্র প্রহরীরূপে আজ স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশ সীমায় দুর্বার গতিতে ছুটে চলে সুসজ্জিত যুদ্ধ বিমান। যারা আজকের এই তরুণ্য উদ্দীপ্ত বাংলাদেশের বুকে মাতৃভূমির তরে নিবেদিত হওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন তাদেরই একজন এক মৃত্যুঞ্জয়ী দুরন্তবাজ, বাংলার সাত শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট মতিউর রহমান।

আজ এই অকুতোভয় বীর বাঙালি বৈমানিকের ৪৯তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে শত্রু ঘাঁটি থেকে জঙ্গি বিমান ছিনিয়ে এনে দেশের তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্তব্যরত থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালের শুরুতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর সপরিবারে দুই মাসের ছুটিতে আসেন ঢাকা। ২৫ মার্চের কালরাতের ঘটনায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। পরে তিনি দৌলতকান্দিতে জনসভা করেন এবং বিরাট মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজারে যান। পাক-সৈন্যরা ভৈরব আক্রমণ করলে বেঙ্গল রেজিমেন্টে ই,পি,আর-এর সঙ্গে থেকে প্রতিরোধ বুহ্য তৈরি করেন। এভাবেই শুরু হয় তাঁর দেশের তরে নিবেদিত সংগ্রামের পথচলা।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবের সেই ট্রেনিং ক্যাম্প খোলেন মতিউর ৷যুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন ৷ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধ বাহিনী ৷ ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকি বিমান বাহিনী 'স্যাভর জেট ' বিমান থেকে তাঁদের ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে ৷ মতিউর রহমান পূর্বেই এটি আশঙ্কা করেছিলেন ৷ তাই ঘাঁটি পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান তিনি ও তাঁর বাহিনী। এর পরই কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে জঙ্গি বিমান দখল এবং সেটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন তিনি। 

২০ আগস্ট সকালে করাচির মৌরিপুর বিমান ঘাঁটিতে তারই এক ছাত্র রশীদ মিনহাজের কাছ থেকে একটি জঙ্গি বিমান ছিনতাই করেন মতিউর রহমান। লক্ষ্য, একটি অন্তত জঙ্গি বিমানও যদি দখলে নেয়া যায় তবে তিনি তৎকালীন ঢাকার পুরাতন এয়ারপোর্টের পাকিস্তানী বিমান ঘাঁটিতে হানা দেবেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাবেন, তার আগে বাংলার মাটি থেকে যে কয়জন সম্ভব শত্রু সেনাকে নিকেষ করে দেবেন।  কিন্তু রাশেদ এ ঘটনা কন্ট্রোল টাওয়ারে জানিয়ে দিলে, অপর চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। এ সময় রশিদের সাথে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রশিদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পরেন এবং বিমান উড্ডয়নের উচ্চতা কম থাকায় রাশেদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। মতিউরের সাথে প্যারাসুট না থাকাতে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃতদেহ ঘটনাস্থল হতে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়। রশিদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক খেতাব দান করে এবং মতিউরকে করাচির মাসর"র বেসের চতুর্থ শ্রেনীর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, ফ্লাইট ল্যাফটেনেন্ট মতিউর রহমান শহীদ হবার সময় পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। পাকিস্তানিরা তাঁকে এক অন্ধকার কক্ষে তাঁর শিশু বাচ্চা ও কাজের পরিচারিকাসহ দীর্ঘদিন বন্দী করে রাখে ও অত্যাচার করে। মুক্তি পাবার পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

তাঁর এই অদম্য সাহসিকতা ও দেশমাতৃকার তরে নিবেদিত হওয়ার প্রয়াসে চালানো দুঃসাহসি অভিযানে সর্বোচ্চ বলিদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে- শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা মৃত্যুঞ্জয়ী 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। 

২০০৬ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের মাটিতে 'গাদ্দার' আখ্যায়িত এই বাঙালী বীর সেনানি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান হতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁকে পূর্ণ মর্যাদায় ২৫শে জুন শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়।

দেশের হয়ে দুর্নিবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সেই স্বপ্ন হয়তো পূরণ হয়নি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কিন্তু তাঁর সর্বোচ্চ প্রত্যাশার পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেরশের বুকে উড্ডীয়মান গর্বিত এই লাল-সবুজের পতাকায়। সার্বভৌম বাংলার বীর সেনানি, তোমাদের ভুলবে না বাংলাদেশ।