• ঢাকা
  • শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০, ০৪:২৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০, ০৪:৩২ পিএম

যেসব খাদ্যাভ্যাস থেকে হতে পারে ক্যান্সার

আছিয়া পারভীন আলী শম্পা
যেসব খাদ্যাভ্যাস থেকে হতে পারে ক্যান্সার

গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হল ‘ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার ডে’। সারাবিশ্বে ক্যান্সার সচেতনতা বাড়াতে এই দিনটি উদযাপিত হয়। আর এবারের প্রতিপাদ্য ছিল “আমরা পারি এবং আমরা পারবো”। কথায় আছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভাল।তাই,আমাদেরও ক্যান্সার হবার পর সচেতন হওয়া নয়,ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার আগেই প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।

অন্যান্য দেশের মতই বাংলাদেশেও ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে।সারাবিশ্বের মতই বাংলাদেশেও ক্যান্সার রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।বর্তমানে,বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ লক্ষ্য,নতুন করে প্রতি বছর নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে ২.৫ লক্ষ্য মানুষ এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে ১.৫ লক্ষ মানুষ। তাই,ক্যান্সার রোগ সম্পর্কে নিজে সচেতন থাকা এবং সবাইকে সচেতন করতে আমাদের এগিয়ে আসা উচিত।ক্যান্সার এমন এক মরণ ব্যাধি যা আমাদের দেহের যেকোন স্থানে এবং যেকোন সময়ে হতে পারে।আরেকটি উদ্বেগ জনক ব্যাপার হল অধিকাংশ ক্যান্সার রোগীই মারা যায়।কারন,অধিকাংশ ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে,ক্যান্সার রোগটি ঠিক শেষ ধাপে এসে ধরা পড়ে তখন চিকিৎসকদের আর খুব বেশি কিছু করার থাকেনা।

তবে,ক্যান্সার প্রতিরোধে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি।প্রথমত,আমাদেরকে ক্যান্সার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত,পরিবারে কাছের কেউ যদি বিশেষ কোন ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন,এমন ইতিহাস জানা থাকে তবে ঐ পরিবারের সদস্যদের উচিত নিয়মিত ক্যান্সার পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকি মুক্ত থাকা।তৃতীয়ত,আমাদের উচিত সঠিক এবং সুষম পরিমাণে অপ্রক্রিয়াজাত করা পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা।প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন থাকা,পাশাপাশি প্রতিদিন পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে ফিট রাখা।

জেনে নিন ক্যান্সার হতে পারে যে সকল খাবার থেকে

  • বর্তমানে অধিক ওজন,অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস,অলস জীবন যাপন,ধূমপান এবং মদ্যপানের অভ্যাস বৃদ্ধি পাবার কারণে ক্যান্সার রোগীদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
  • সেসাথে,পরিবেশগত প্রভাব,প্রসেসড ফুডের প্রতি অতি মাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং পূর্বের তুলনায় রন্ধন প্রনালীর ব্যাপক পরিবর্তন ও ক্যান্সার সৃষ্টিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।
  • তবে,আমরা যদি সচেতন থাকি তবে ক্যান্সার রোগের হার এবং ক্যান্সার রোগে মৃতের সংখ্যা উভয়ই কমে আসতে পারে।
  • সচেতনতার প্রথম ধাপেই আমাদের নজর দিতে হবে সঠিক,সুষম এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের প্রতি।পাশাপাশি, সঠিক উপায়ে রান্নার পদ্ধতি ও জানতে হবে।সচেতন থাকতে হবে সেসব খাবার সম্পর্কে যে খাবার গুলো ক্যান্সার রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
  • প্রাণীজ খাবার যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু গ্রহণ করে বাকি খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য নজর দিতে হবে প্লান্ট বেসড খাবারের প্রতি। 
  • রেড মিট এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস বিশেষ কিছু ক্যান্সার রোগ সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ত।রেড মিট হল গরু,খাসি, মহিষ এবং ভেড়ার মাংস।অপরদিকে প্রক্রিয়াজাত মাংস বলতে বোঝায় মাংসের স্বাদ এবং গন্ধ বাড়ানোর জন্য যখন মাংসকে নানা প্রসেস যেমনঃফার্মেন্টেড,সল্টেড বা স্মোকড করা হয়।এই,উভয় ধরণের মাংস গ্রহণের সাথে ক্যান্সার হবার সম্পর্ক রয়েছে।
  • যারা নিয়মিত কোমল পানীয় পান করে থাকেন তাদের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।এসব পানীয়তে থাকা চিনি,ফুড কেমিক্যাল এবং কালার আমাদের শরীরে এসিডিক পরিবেশ তৈরি করে যা ক্যান্সার সেলের গ্রোথের জন্য একেবারে উপযুক্ত পরিবেশ।
  • এছাড়া যারা একটু বেশি সচেতন তারা প্রচলিত কোমল পানীয় যেমনঃকোক,স্প্রাইট বা পেপসির বদলে বেঁছে নেন ডায়েট কোক।তাদেরকে বলছি,এই ডায়েট কোক আমাদের শরীরের জন্য আরো বেশি খারাপ।“ইউরোপীয় ফুড সেফটি” অথরিটি দ্বারা প্রকাশিত ২০টির ও বেশি পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে যে সর্বাধিক ব্যবহিত কৃত্রিম মিষ্টি কারক “আস্পারটেম” বিভিন্ন রকম ক্যান্সার,জন্মগত ত্রুটিসহ নানা ধরণের অসুস্থতার জন্য দায়ী।এছাড়া,সুক্রালোজ,স্যাকারিন এবং অন্যান্য আর্টিফিশিয়াল সুইটনার ও বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার রোগের জন্য দায়ী।
  • আজকাল খুব কম ঘরেই লাল চাল,চিনি বা আটার ব্যবহার হয়।অনেক আগেই বদলে গেছে আমাদের রান্না ঘরের চিত্র।অপ্রকিয়াজাত খাবারের স্থানে জায়গা করে নিয়েছে প্রকিয়াজাত কৃত সাদা চাল,চিনি,মূড়ি,চিড়া সহ নানা খাবার।বাদ যাচ্ছেনা তেলও।এসব,খাবার নানা ভাবে প্রকিয়াজাত করতে গিয়ে বাদ পড়ছে জরুরী পুষ্টি উপাদান এবং দেখতে আকর্ষণীয় করতে গিয়ে যোগ হচ্ছে নানা রকম ক্ষতিকর উপাদান।যা ক্যান্সার সেল বা ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী।
  • আজকাল আমরা সব কিছু অতিরিক্ত ফ্রাই বা গ্রিল বা দীর্ঘক্ষণ রান্না করার মাধ্যমে খেয়ে থাকি যা সুস্বাদু হলেও বর্জনীয়।অতিরিক্ত স্বাদের জন্য সবজি,মাছ মাংস বা যেকোন খাবারকে যত বেশিক্ষণ ধরে প্যান ফ্রাই, গ্রীল্ড বা বেকড করা হয় সেই খাবার তত বেশি বিষাক্ত হয়ে যায়।যারা এই ধরণের খাবার যারা নিয়মিত গ্রহণ করে থাকেন তাদের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা বেশি।
  • এছাড়া,আজকাল প্রায় সব ধরণের খাদ্যকেই জেনেটিক্যালি মডিফাই করা হয়।আর এই ধরণের খাবার যারা নিয়মিত গ্রহণ করছেন তাদের ও ক্যান্সার হবার ঝুঁকি রয়েছে।
  • যারা,অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহণ করেন তাদের ক্ষেত্রে ও ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি।তাই,চিনির ব্যবহার সীমিত রাখুন এবং ক্যান্সার থেকে বাঁচুন।
  • আজকাল আমাদের খাদ্যাভ্যাস অনেক খানি পরিবর্তন হয়েছে।পাতলা ঝোলের পরিবর্তে বর্তমানে অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার কিংবা বাইরের ফাস্ট ফুড কালচারে আমরা এমন ভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে এই বিষয়টি ততক্ষণ পর্যন্ত মাথায় আনিনা যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা কোন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত না  হই।স্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের এই উদাসীনতা ক্যান্সার রোগ হবার ক্ষেত্রে অনেক খানি দায়ী।

সুতারং,ক্যান্সার থেকে বাঁচতে চাইলে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করার পাশাপাশি নিজের ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে,প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল এবং শাকসবজি গ্রহণ,ব্যায়াম এবং নিয়মিত ক্যান্সার পরীক্ষার করতে হবে এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং খাদ্য উভয়ই বাদ দিতে হবে।


 লেখক : পুষ্টিবিদ, বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড।