• ঢাকা
  • সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০১৯, ০৩:৪৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৩, ২০১৯, ০৮:৩৭ পিএম

‘মঙ্গল শোভাযাত্রায় আনুষ্ঠানিকতা বেড়েছে’

রিকু আমির
‘মঙ্গল শোভাযাত্রায় আনুষ্ঠানিকতা বেড়েছে’
কামাল পাশা চৌধুরী

পহেলা বৈশাখের সময় করা এই মঙ্গল শোভাযাত্রাই উপমহাদেশে বৃহত্তম উৎসব, যেটাতে সব ধর্ম-মত, শ্রেণি-পেশার মানুষের মহামিলন ঘটে বলে মন্তব্য করেছেন মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রথম প্রচলনকালীন অন্যতম উদ্যোক্তাদের একজন কামাল পাশা চৌধুরী।

দৈনিক জাগরণ-এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘‘এই উপমহাদেশে অনেক বড় বড় উৎসব হয়। সে সব ধর্মীয়। কিন্তু সব ধর্ম-বর্ণ-পেশা-বয়সের বাঙালির আত্মার সম্মিলন ঘটাতেই আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রচলন করি। আজ দেখি এর আঙিনা অনেক উন্নত ও বড় হয়েছে। এতে গর্ব ও আনন্দবোধ হয়। আমরা তো তখন প্রয়োজনীয় অর্থ, সরঞ্জামই পেতাম না, চা পান করার পয়সাও পকেটে থাকত না। আমরা মাত্র ২০-২৫জন শিক্ষার্থী এটা নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করি। বৈঠক করতাম। যখন কাজ শুরু করে দিলাম, তখন ৪০-৫০জন হয়ে গেল।’’

তবে তিনি কামাল পাশা চৌধুরী মনে করেন বর্তমানকালের মঙ্গল শোভাযাত্রায় আনুষ্ঠানিকতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা বেড়েছে। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য যেটা, ‘সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি’ তা ব্যহত হচ্ছে।

কামাল পাশা চৌধুরী বলেন, ‘‘আমরা যখন করেছি, তখন চেয়েছিলাম, এই অনুষ্ঠানে যোগদানকারীদের কেউ যেন নিজেকে দর্শক না ভেবে একজন অংশগ্রহণকারী ভাবেন। কিন্তু এখন এটা মনে হচ্ছে না। এই শোভাযাত্রার সঠিক উদ্দেশের গভীরে কেউ যেতে চান না বলেই প্রজন্ম জানে না, কেন এই মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হচ্ছে।’’

১৯৮৯ সালে দেশে যখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চলমান, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা মঙ্গল শোভাযাত্রা বাস্তবায়নের কথা ভাবেন। কামাল পাশা চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী। অবশ্য প্রথম শোভাযাত্রাটির নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরের বছর নামকরণ করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা- ১৩৯৬ বাংলা সন- সংগৃহীত

স্মৃতিচারণ করে কামাল পাশা চৌধুরী বলেন, ‘‘খুব সাধারণভাবে বাঙালি লোক-ঐতিহ্যের প্রতীক হাতি, ঘোড়া, ঢাক ও মুখোশ নিয়ে আমরা সেদিন শোভাযাত্রা বের করি। দেড়’দুশোজনের শোভাযাত্রা নিয়ে চারুকলা থেকে যখন শিশু পার্কের কাছে যাই, তখন কমপক্ষে এক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। মৎস্য ভবন হয়ে যখন হাইকোর্টের দিকে যাই, তখন কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। তখন আমরা বুঝতে পারি- আমাদের সাজ-সজ্জা বাঙালির হৃদয়ে দাগ কাটে। কাউকে দাওয়াত দেইনি, ডাকিনি, তবুও সবাই এসেছেন, নেচেছেন, গেয়েছেন। এ জিনিসই আমরা চেয়েছিলাম যে, কাউকে ডাকা হবে না, দাওয়াত দিতে হবে না, কোনো অতিথি থাকবে না, সবাই নিজের তাগিদে আসবে, দর্শক নয়, অংশগ্রহণকারী হয়ে নাচবে-গাইবে, সম্প্রীতির বন্ধন গড়বে।’’

‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করেছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির দুই দিকপাল ভাষা সংগ্রামী শিল্পী ইমদাদ হোসেন এবং প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক। শোভাযাত্রার স্বপ্নবীজ প্রোথিত হয় মূলত ১৯৮৮ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মোৎসব পালনের একটি ক্ষুদ্র শোভাযাত্রার আয়োজন থেকে। রাজনৈতিক সামাজিক দিক থেকে খুবই অস্থির সময় ছিল তখন। স্বৈরাচার সামরিক সরকার তখন ক্ষমতায়। বাঙালি সংস্কৃতি তথা স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তির উত্থান, সরকারি দমন-পীড়ন, অন্যদিকে উত্তাল ছাত্র আন্দোলন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় চরম নৈরাজ্য।

........................

‘‘মঙ্গল শোভাযাত্রার নামকরণ করেছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির দুই দিকপাল ভাষা সংগ্রামী শিল্পী ইমদাদ হোসেন এবং প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক’’
........................

এ সময় চারুকলার ১৯৮৬-৮৭ সালের ব্যাচের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী সংঘবদ্ধভাবে অংশ নিতে থাকে চারুকলাসহ গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার প্রায় সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, চারুশিল্পী সংসদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ- এ রকম যে কোনও সংগঠন যে কর্মসূচি গ্রহণ করে তাদের দেখা যেত, কাজের অগ্রভাগে। মিছিল-মিটিং থেকে বন্যা ত্রাণ, বিজয় দিবসে ইয়াহিয়ার কুশ-পুত্তলিকা তৈরি, জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চ তৈরিসহ সব ইতিবাচক কাজেই তারা ছিলেন অগ্রগামী। তারাই এক সময় চিন্তা করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মদিনে একটি শোভাযাত্রা বের করার। সেখানে তারা বাঁশ, কাগজ, বোর্ড, শোলা দিয়ে তৈরি করে কিছু পেন্সিল, তুলি, কালার প্লেটের বৃহৎ আকারের প্রতিকৃতি আর কিছু বিচিত্র মুখোশ। এগুলো বহন করে ঢাক-ঢোল, খোল করতাল বাজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রদক্ষিণ করে একটি ছোট্ট র‌্যালি। এই কাজে তাদের সাথে বেশকিছু ছাত্রছাত্রী অংশ নেয়। এই শোভাযাত্রা ব্যাপক সাড়া ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। এখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই সবাই ভাবতে থাকে আরও বড় আকারে কিছু একটা করা যায় কি-না। শুরু হয় ছোট ছোট বৈঠক। কিছু সিনিয়র-জুনিয়রও যোগ দেন সেই আলোচনায়। পরিকল্পনা রূপ নিতে থাকে বাস্তবে। সিদ্ধান্ত হয় পহেলা বৈশাখে বড় আকারের একটি শোভাযাত্রা আয়োজনের। শুরু হয় গবেষণা। বয়োঃজেষ্ঠ্যদের কাছ থেকেও গ্রহণ করা হয় নানা পরামর্শ। অনুসন্ধান শুরু হয় অতীত ও বর্তমানের বৈশাখসহ বাঙালির লোকজ অনুষ্ঠানগুলোর ও এসবের প্রকৃতির। ধামরাই মানিকগঞ্জের রথযাত্রা, যশোরের পহেলা বৈশাখের মিছিল, পুরান ঢাকার ঈদ ও মহররমের তাজিয়া মিছিল, টাঙ্গাইলের সংযাত্রা, নেত্রকোণার লাম্বাগীত, উত্তরবঙ্গের শিবের গাজন— সব কিছু থেকেই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। স্টাডি করা হয় বিশ্বের বড় কার্নিভ্যালগুলোর। তার মধ্যে ডোমিনিকা কার্নিভ্যাল, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান গ্যালি, ক্যারাবিয়ান টোবাগোসহ ব্রাজিল, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়ার কার্নিভ্যালগুলোকেও পর্যবেক্ষণ করা হয় গভীরভাবে। তবে মূল ভিত্তি করা হয় আবহমান বাংলার লোকজ-ঐতিহ্যকে।

বাংলার কারুশিল্পীদের তৈরি কাঠের হাতি, লাম্বাগীতের ঘোড়া, সরার পট থেকে নেয়া মোটিফের আলপনায় মুকুট, মুখোশসহ সব উপাত্তই গ্রহণ করা হয় লোকায়ত শিল্প থেকে। শুরু হল কাজ। অনেক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার পথ চলা।

স্মৃতিচারণ করে কামাল পাশা চৌধুরী আরও বলেন, ‘‘আমাদের সময়ে পহেলা বৈশাখ বলতে শুধু ছায়ানটের অনুষ্ঠানই ছিল। এতে একদল পরিবেশন করতেন, আরেকদল আসতে দর্শক হয়ে। তারা উপভোগ করে বাসায় চলে যেতেন। কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রায় দর্শক নেই, সবাই-ই পরিবেশক, অংশগ্রহণকারী।’’

২০১৭ সালে জাতিসংঘের সহযোগি সংস্থা ইউনেস্ক  পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এ প্রসঙ্গে কামাল পাশা চৌধুরী বলেন, ‘‘এটা আমাদের জন্য খুব গর্বের ও আনন্দের।’’

সার্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়ে উঠেছে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা -ফাইল ছবি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে বাঙালি আছেন, সেখানেও মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয়। নিউইয়র্ক, কানাডা, প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের কলকাতাতেও মঙ্গল শোভাযাত্রা  বের করা হয় বাংলাদেশের অনুকরণে।

কামাল পাশা চৌধুরী বলেন, ‘‘ইউনেস্কোর ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অফ ইনট্যাযনজিয়েবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউমিনিটি’র তালিকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন মিডিয়ায় এর ইতিহাস নিয়ে নানা রকম বিশ্লেষণ হয়েছে। এটাও খুবই স্বভাবিক। কিন্তু খুব উদ্বেগের সাথে লক্ষ্যণীয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন রকমের ইতিহাস উপস্থাপন করছে। এর মধ্যে বড় ধরনের তথ্য-বিকৃতি ঘটছে। এই আত্মঘাতী প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া জরুরি। কিছু ভুল তথ্যসম্বলিত প্রবন্ধ দু’একটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দু’একজন বরেণ্য ব্যক্তিও তাদের লেখায় কিছু স্মৃতিবিভ্রাট ঘটিয়েছেন। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র সূচনার পর থেকে প্রতি বছরই এর সাথে ক্রমান্বয়ে যুক্ত হয়েছেন চারুকলার নতুন ছাত্র শিক্ষকসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রায় সব বরেণ্য ব্যক্তি ও সংস্কৃতিকর্মী। তারাও অবশ্যই এই মহৎ উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার। কিন্ত তাদের অনেকেই নিজের অংশগ্রহণের সময়টাকেই শোভাযাত্রার সূচনাকাল হিসেবে গুলিয়ে ফেলেন। ফলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির লেখা বা সাক্ষাৎকারে বক্তব্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র খণ্ডিত বা ভুল ইতিহাস তুলে ধরেন। তার মধ্যে কেউ কেউ নিজের ভূমিকাকে বা তার পছন্দের কাউকে অধিক প্রধান্য দিতে গিয়ে সত্য থেকে কিছুটা বিচ্যুতও হয়ে যান।

আরএম/এসএমএম

Space for Advertisement