• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০১৯, ০৮:৪৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৩, ২০১৯, ০৮:৩৬ পিএম

বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা

শাহীন সুলতানার কবিতা

জাগরণ ডেস্ক
শাহীন সুলতানার কবিতা

সম্পর্ক
আমাদের সাথে আমাদের দূরত্ব এক পৃথিবীর 
দূরত্বে কোন পার্থক্য নেই;
দু-মাইল কিংবা যোজন যোজন ।
আমরা পরজীবী উদ্ভিদের মতো
একে অপরকে জড়িয়ে থাকিনা,
কোন সংবেদনশীলতায় আদ্র হই না
আমরা কর্ষিত হই নিষ্ঠূর উন্মাদনায়,
তখন আমরা অনন্ত কালের থেকেও দূরে থাকি ।
আমরা মুখোমুখি বসি, পাশাপাশি ভাষাহীন হাত 
তখনও আমরা বেশ দূরে--
আমরা ভুলে যেতে থাকি আমাদের, 
কোন সৌন্দর্য থাকেনা আমাদের ভিতর । 
এক নিঃসঙ্গ অন্ধকারকে ধারণ করি 
এক আকাশ নক্ষত্র বুকে নিয়ে,
তার সৌন্দর্য দেখি অপলকে । 
একবার এক ধুলোমাখা পথ শিশুর মধ্যে 
দেখেছিলাম শেষ বেলার সৌম্য দ্যুতি,
সৌন্দর্য দেখেছিলাম টোকাই লখার মুখে ।
আমরা সেদিন তিনজনে একলা আনমনে 
মাঠের দুর্বাঘাসের উপর দাঁড়িয়ে 
নির্নিমেষে গোধূলির দিকে তাকিয়ে ছিলাম,
পথশিশু, লখা, গোধূলি আর আমি
আমাদের মধ্যে কোন দূরত্ব ছিলনা সেদিন । 
সম্পর্ক এক বিস্ময়কর আবিষ্কার,
প্রাচীন মহাদ্রুমের শিকড়ের মত অবিকল ।
কৈশিক বিন্যাসে ছড়িয়ে গেলেও বহুদুর
প্রাণের টান রয়ে যায় অগোচরে ।
আমাদের ভালোবাসা তেপান্তরের মহাদ্রুম 
আমাদের সম্পর্ক শিকড়ের মত
তাই হয়ত দূরত্বে কাতর হই না কখনো ।

ইকারাসের ডানা

একদিন হঠাৎ সমস্ত দেয়ালটা রঙিন হয়ে যায়
খসে পড়া পলেস্তরা গুলো আর দেখা গেলো না,
নিস্তরঙ্গ জলে সেদিন প্রথম নৌকা ভাসল, প্রথম ঢেউয়ে।
অনিকেত ভালোবাসার অপ্রতিরোধ্য হাতছানি
চৈত্রের বিষণ্ণ দুপুর শরতের আকাশে ছেয়ে গেলো,
সেই কবোষ্ণ দুপুর আর নৌকায় নিমগ্ন আরোহী 
বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে নীল স্বপ্নময়ী আদ্যোপান্ত ভ্রম্যচারী ।
ক্ষুদ্র জীবনের অলঙ্ঘনীয় অমোঘ যাত্রায় 
এই চোখ দিয়ে দেখেছিল জীবনের বিশুদ্ধ সত্য,
সমুদ্র উত্থিত পারিজাত প্রেমে ডুবে
জীবনের প্রাত্যহিকতা ভুলেছিল যেদিন
দেখতে পায়নি অপ্রতিরোধ্য সর্বনাশ ।
পরিযায়ী জীবন চেয়ে অবিন্যস্ত খসে পড়ে পালক
সে ভুলেছিল তার ডানা ছিল ইকারাসের ডানা ।

একটা জানালা

সামনে সামন্ত ঘোষের বাগান
বাগান পেরিয়ে দুচোখ বিস্তৃত মাঠ ভোরের বৃষ্টিতে মাখামাখি । 
লকলকিয়ে বেড়ে উঠা ঘাসগুলো
নরম রোদ আর ছোট ছোট ঘাস ফড়িং, প্রজাপতিতে চঞ্চল ।
কুসুমের ছড়ানো মন তার চেয়েও চঞ্চল
ফড়িং আর প্রজাপতির মত উড়ে ঘাস ফুল থেকে ঘাস ফুলে,
চোখ ভরে দেখে এই আগুন্তুক বেলা ।
যতদিন এ জীবন ---
সামন্ত ঘোষের সীমানা পেরিয়ে এই মাঠ, ভোরের আকাশ 
জলে ভেজা ঘাস ছাড়িয়ে কোথাও ফেরার তাড়া ।
মাঠের ওপারে উচু রাস্তার ‘পরে সকাল – বিকাল
ট্রেনের গতির সাথে কুসুমের মনও ছুটে যায় নিমতলী গাঁয়ে, 
বুকের উঠোনে বন্দী তেজ শিকল ভেঙ্গে স্ফুলিঙ্গ বেগে
সামন্ত বাবুর দালান ছেড়ে নিমতলীর মাটি লেপা ঘরের
এধার ওধার পালকের মত খসে খসে পড়ে ।
একদিন আঁধারে
অভাবের বুকে রূঢ় পরিহাস, বেঁচে থাকার কঠোর ব্যাঙ্গ 
সেই সুযোগে সামন্ত বাড়ায় কঠিন নিষ্ঠুর রাক্ষস হাত
মুক্তি ভেবে নিমতলীর কাদামাটি ঠিকানা দেয় অভিশপ্ত দালান ।
কুসুমের রুদ্ধ স্বর বুক ঠেলে ডাক ছাড়ে—
ভালোবাসি ভালোবাসি ভিটে মাটি, জলাভূমি, ঘাস, প্রচন্ড আকাশ । 
তার আজন্ম বোধ নিষ্ঠুর বিদ্রূপকে দলিত করে খোলা জানালা গলে 
নরম সোনা রোদ আর জংলা ঘাসের ঘোলা জলে ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়ায় ।

অসঙ্গতি

কোন কিছুই আগের অবস্থানে থাকেনা। 
কখনো চরম উষ্ণতায় বাস্তবতা, 
কখনো নিষ্প্রভ স্বপ্নময়তা, 
আবার কখনো নিবিড় অন্ধকারে 
ঝরে পরে এক একটি সোনালি পাতা, 
মিলেনা হিসেব, শুধু অকারণ কিছু উচ্চারণ।
এপারে ধাতব অনুভূতি ওপাশে অপার দিগন্ত,
এপারে অন্ধ দীর্ঘশ্বাস, ওপাশে তোলপাড় হাতছানি
অনন্ত আকাশ, মেলেনা হিসাব।
অনুচ্চারিত শব্দকে আস্কারা দিয়ে বলি –- 
লীন হও মর্ত্যে- শূন্যে 
ধবনি-প্রতিধ্বনিতে সব উলট-পালট হোক, 
বদলে যাক বহুরূপী রঙ, 
নির্মোক ছেড়ে বেরিয়ে আসুক বিশুদ্ধ স্বত্বা।
উরুক্কু শব্দেরা বেগহীন, গতিস্রোত স্তব্ধ অনড়, 
মেলেনা হিসেব—
কাসালং এর ওপারে জংলা ঝোপের ভিড়ে ধুপ ছায়া চাঁদ 
জলে তার রূপালি আঁচড় ,
এখানে নির্জন তীরে স্থবির জলে পাণ্ডুর চাঁদ , 
মেলেনা হিসেব। 
বঙ্কিম পরিহাসে ক্ষমাহীন নিরুদ্দেশে সময় উঠেছে ভরে
ক্লেদাক্ত আস্বাদে ছেয়েছে বিকীর্ণ জীবন, 
তবু মেলেনি হিসেব ।
৫।স্টেশন
ঢুলু ঢুলু ঘোলাটে চোখে ৮০ বছরের কীর্তন ভাবালু 
ঠিক দেখছে না, আবার দেখছেও এমন অবয়ব 
স্টেশনের পাশে চায়ের দোকানে তার একলা জীবন । 
জগতি স্টেশন । 
স্টেশন মানুষকে জীবন দেখায়, অনেক দেখেছে কীর্তন । 
জন্মের পর থেকে দেখেছে সেখানে জীবন কাকে বলে, 
ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে জীবন এখানে ধাবমান । 
স্টেশনের দোকান থেকে শুরু করে প্লাটফর্মের
কুলি সর্দার কালুর মধ্যে দেখেছে জীবন যুদ্ধ, 
দেখেছে বগীর ভিতর বাইরে হরেক পেশার 
অগুনতি মানুষ গুলোর ভিতর ।
লোহার ঘন্টা আর গার্ডের হুইসেল বাজতো নিয়মিত 
ট্রেন আসলে দিন আর রাতের জগতি স্টেশন কেমন 
জীবন্ত হয়ে উঠতো তার চোখে দেখা । 
পিঁপড়ের সারির মত অসংখ্য মানুষের স্রোত, 
প্লাটফর্মের ফেরিওয়ালাদের তৎপর হয়ে উঠা --- 
বাদামওয়ালা, ডিমওয়ালা, চানাচুরওয়ালা স্ব স্ব সুরে
তাদের মুনশিয়ানা দেখিয়ে যাত্রীদের প্রলুব্ধ করত । 
চা-গরম , চাই চা-গরম একটা ছন্দময় আবেশ
মধ্যরাতের স্টেশনে ছড়িয়ে পড়ে ।
এক বাঁশিওয়ালা তার বাঁশির সুরে ততোটাই সম্মোহনী ছিল 
যতটা থাকলে বাঁশি বিক্রি হয় ।
হাঁক ডাক শোরগোল টুং টাং শব্দ 
নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতাকে এখানে চুর চুর করে দিত । 
তারপর একসময় ট্রেন বিসর্পিল গতিতে স্টেশন হতে
বের হয়ে যেতো সব কোলাহল পিছু ফেলে । 
হকারদের হাক ডাক শিথিল হলে 
হ্যামিলনের বাঁশিওয়া্লাও মোহনবাঁশিতে সুর তুলে 
অপসৃয়মান হতো কোন ভোরের গন্তব্যে । 
দিনের কোলাহলের সাথে সাথে রাতের স্টেশনের 
রহস্যময় সৌন্দর্য কেমন বদলে যেতো ।
স্টেশনের সামনে বাঁধানো বটগাছটার তলায় বসে 
কীর্তন রোজ এ দৃশ্য দেখেছে ।
আজ সে সব সোনালি অতীত, ঘোলাটে চোখ দিয়ে
লোহার বাতি গুলোর উপর ধুলোর আস্তর দেখে
এখন এখানে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলে
হুলুস্থুল বাধিয়ে আর যাত্রী বোঝাই ট্রেন আসেনা 
রাত নামলে বাশির সুরের বদলে মাদকের আড্ডা বসে
কীর্তনের চোখের মত জাগতিও আজ বিবর্ণ শ্রীহীন ।